01 July 2009

অতিরঞ্জিত উইন্ডজর ভ্রমনাংশ

কফির কেচ্ছা
প্রথমদিন আমি খুব স্নেহ নিয়ে বললাম, "বলতো ভাইয়া, এখন কে আমার জন্য কফি বানাবে?"
কিংকং ও বিপ্র একসাথে হাত তুলে বেশ উত্তেজনা নিয়ে, "এই যে ভাইয়া। আমি... আমি!!"
দ্বিতীয়দিন, "বলতো ভাইয়া, এখন কে কফি বানাবে?"
বিপ্র খুব অনিচ্ছা নিয়ে, "আচ্ছা আমিই বানাই!"
তৃতীয়দিন আবার, "বলতো ভাইয়া, এখন কে আমার জন্য কফি বানাবে?"
কিংকং ও বিপ্র একসাথে, "আপনিই বানান। আর আমাদের জন্যও দুই কাপ আইনেন।"

ঘুম ঘুম কেনো আজ আমার?
দ্বিতীয়দিনেও কিংকং এর ঘুম ভাঙানো যাচ্ছে না। সবাই গিয়ে চেষ্টা করে এসেছে। আমাদের ব্যর্থতা দেখে শিমুল খুব কষ্ট করে অনেক সময় নিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। আড়মোড়া ভেঙে বলে, "এসব কাজ হলো আসল বড় ভাইয়ের বুঝলা? এক্ষণি ওকে নিয়ে আসতেছি। দেখে শেখো এইসব।" পাশের কামরা থেকে হঠাৎ শিমুলের জলদ কন্ঠ শুনে আমরা সবাই চমকে যাই, "কিংকং! আরে এই কিংকং। আরে দুপুর হয়ে গেছে তো। সবাই তৈয়ার হয়ে বসে আছে। ওঠো ওঠো..." একটু পরে শিমুল এসে মন খারাপ গলায় বলে, "কিংকং মনে হয় মাইন্ড করে বসলো বুঝলা। ঘুমের মাঝে হঠাৎ আমি গিয়ে চিৎকার দিয়েছি। সে গেছে চমকে..."

হালিম আর হালুম
প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই সকালে নাস্তা দিচ্ছেন। আমি শিমুল আর বিপ্র বসেছি। কিংকংকে তখনো ঘুম থেকে ওঠানো যায়নি। আমরা নাস্তা করছি। এর ফাঁকে দেখি প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই কি খুটখাট করছেন। শিমুল জিগায়, "পিপি'দা কী করেন?"
"এই হালিম করেছিলাম তো তোমাদের জন্য, সেটা গরম করছি।"
শিমুল উত্তেজিত হয়ে, "আরে না না। রাখেন তো। এখন লাগবে না। কেনো এতো ঝামেলা করেন? এমনিতেই তো অনেক নাস্তা করেছি।"
বিপ্র, "ঠিকই ভাইয়া। আমরা বরং পরে হালিম খাই। রাত্রে ফিরে।"
আমি, "ওস্তাদ, আপনি গরম করেন তো। গরম করেন। ওদের দরকার নাই। আমি খাবো।"
আমার কথায় শিমুল ও বিপ্র খুব আপত্তি জানায়।

পাঁচ মিনিট পরে দেখা যায় বিপ্র খুব আগ্রহ নিয়ে হালিমের জন্য পেয়াজ ভাঁজছে। আর শিমুল একাই তিন বাটি হালিম সাঁটাচ্ছে।

শিখবা নাকি ক্যামেরাবাজী?
প্রথম দিন একসাথে সবাই বসে আছি। প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই দুম করে বের করেন তাঁর ক্যামেরা। নীল তিমির মতো আকার। অ্যানাকোন্ডার মতো লেন্স। নানান রকমের তার-সূতা। তাঁকে দেখে কিংকংও আর দেরি করে না। বের করে ওর হাঙর সদৃশ ক্যামেরা। হাতির শুঁড়ের মতো লেন্স। শিমুল-বিপ্রও বসে থাকে না। ওয়েস্টার্ন সিনেমার মতো নায়কদের মতো এখন ওখান থেকে হুট-হাট দামী ডিজিটাল ক্যামেরা বের হয়ে যায়। অপটিকাল লেন্স ওঠানামার হিশহিশে আওয়াজ শোনা যায়। এবার সবাই আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি শুকনা গলায় বলি, "আমি বুঝলেন আগে একটু হাত পাকিয়ে তারপরে কেনায় বিশ্বাস করি। মানে অনেক দাম তো... আর ধরেন..."

বিপ্র, ভাইয়া...
ফেরির ছাদে বসে আড্ডা মারছি সবাই। শিমুল পাড়ার মাস্তান বড় ভাইয়ের মতো লোহার বেঞ্চে পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে আছে। বিপ্র কথা বলে কম। চুপচাপ বসে শোনে শুধু। তো হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে শিমুল খুব পাটে জিজ্ঞেস করে, "কী বিপ্র ভাইয়া? সব ভালো তো?"

ভিনাস ফ্লাইট্র্যাপ
দ্বীপে গিয়েই আমি আর কিংকং সাইকেল ভাড়া করে নিলাম। এরপরে সারা দ্বীপে, জঙ্গলে চরকিবাজী। এর মাঝে একটা জংলা ফুল দেখে আমি সাইকেল থামাই। উত্তেজনা নিয়ে বলি, "কিংকং, এটা ভিনাস ফ্ল্যাইট্রাপ না? দেখছো?"
কিংকং খুব উত্তেজনা নিয়ে ওর ক্যামেরা বের করে, "কই ভাইয়া? কই?"
আমি আঙুল তুলে একটা জংলা গাছ ভর্তি ফুল দেখাই। ফুল ধরতে গেলে কিংকং সতর্ক গলায় বলে, "দেইখেন আঙুল খায়া ফেলবে আবার!" আমি ভয়ার্ত ভাবে হাত সরিয়ে নেই। অসংখ্য ছবি তোলা হয়।
কিংকং মুগ্ধ গলায় বলে, "চিনলেন ক্যামনে?"
আমি খুব পাট নিয়ে বলি, "শুধু সাইকেল চালাইলে হবে? চোখ-কানও খোলা রাখতে হয় বুঝলা!"

পরে প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই মারফত জানা যাই উহা ভিনাস ফ্ল্যাইট্র্যাপের ধারে কাছের কোনো বংশ না।

সিকিউরিটি
প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই আমাদের আগেই ইমেইল করে তাঁর রাউটারের সিকিউরিটি কী দিয়ে দিয়েছিলেন যাতে তাঁর বাসায় গিয়েই আমরা পুরোদমে ব্লগিং করতে পারি। কিন্তু বাসায় পৌঁছে দেখা গেলো সেটা কেউই সেভ করে নাই। আমি সবাইকে খুব ঝাড়ি দেই, "এসব কী? এটা কোনো কথা? প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই ইমেইল তো একটা কারণে করেছিলেন নাকি?" সবাই মন খারাপ করে। কিংকং-এর লিখে দেয়া একটা কাগজের টুকরো দেখে বিমর্ষ মুখে ল্যাপটপে কী টোকে। ওদের শেষ হলে আমি আমার ল্যাপটপ চালু করে মিহি গলায় ডাকি, "হেই শিমুল। কাগজটা একটু এদিকে পাস করো তো!"

মেনেছি গো, হার মেনেছি
দ্বিতীয় দিনে ধুম আড্ডা হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে শিমুলের ঘুম পেয়েছে। আবার আড্ডাও ছাড়তে পারছে না। তাই সে খুব মমতা দেখিয়ে বলে, "বিপ্র ভাইয়া, ঘুম পেয়েছে? না?" বিপ্র সেই কথায় কানই দেয় না। শিমুল আবার বলে, “কিংকং, যাও ভাই। ঘুমিয়ে পড়ো। কালকে সকালে উঠে শহর ঘুরতে বেরুবো না?” কিংকং মনে হয় খেয়ালও করে না। শিমুল আমাকে বলে, “বুঝলা অমিত, সারাদিন দ্বীপে ঘুরে সবাই খুব ক্লান্ত। ঘুম দিলে কালকের জন্য একদম ফ্রেশ হয়ে যাবো সবাই।” আমি শিমুলের কথায় কান না দিয়ে কিংকং এর বলা কোনো কৌতুকে খ্যাখ্যা করে হাসি। একটু পরে দেখা যায় ব্যর্থ চেষ্টা ভঙ্গ দিয়ে শিমুল আড্ডার মাঝেই উলটো হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

আমি বাংলায় কথা
বাসে উঠে আমি আর কিংকং বাসের সবাইকে নিয়ে গবেষণা শুরু করি। ব্লগ ব্যক্তিগত জীবন চিন্তা চেতনা নিয়েও কথা হয়। কেউ যেনো বুঝতে না পারে এজন্য আমরা খুব সতর্ক ভাবে বাছাই বাংলা শব্দেই কেবল আলাপ সারি। তিন ঘন্টা পরে লন্ডনে বাস থামলে পেছনের সিটের ভদ্রলোক, যাকে আমরা "টাকলা" বলে সম্বোধন করে এসেছি, শুদ্ধ বাংলায় বলেন, "ভাই আপনাদের আলোচনা শুনে খুব আনন্দ পেয়েছি।"

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ১ জুলাই ২০০৯

18 June 2009

চতুর্থ ষড়ব্লগ

এক

ক'মাস আগে পুরানো পোস্টগুলো নেড়ে-চেড়ে দেখছিলাম। অনেক বানান ভুল। তখন নতুন বাংলা টাইপ শিখেছি, বাংলা লিখতে পারছি সেই আনন্দেই আত্মহারা ছিলাম। বানানে আর সেভাবে নজর দেয়া হয়নি। আর সত্যি কথা বলতে কী, অনেকদিনের অনভ্যাসে সব বানান ঠিক মতো মনেও পড়তো না। অজুহাত বলতে এই। এখনো হয়তো সব বানান শুদ্ধ ভাবে লিখতে পারি না, তবে এখন ভুলগুলো অনিচ্ছাকৃতই বেশি। টাইপো।

মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে একদম প্রথম পোস্ট থেকে শুরু করে একে একে সব পোস্টের বানান ঠিক করি। আগ্রহ আছে। সময় নেই!

দুই

ক'দিন আগে গুগলে "গোপাল ভাঁড়" খোঁজ করে দেখলাম এখানে প্রকাশ করা গোপালের কৌতুকগুলো দাড়ি-কমা সহ অন্য ব্লগে ফোরামে আর সাইটে তুলে দেয়া হয়েছে। এতে আমার আপত্তির কোনো কারণ নেই। লেখাগুলো মৌলিক কিছু নয়। আমি ব্লগেও লিখে রেখেছি যে প্রকাশিত কৌতুকগুলো যে কেউ ব্যবহার করতে পারবেন কেবল সূত্র হিসেবে আমার ব্লগের একটা লিংক দিয়ে দিতে হবে। নানান জায়গা থেকে খুঁজে-পেতে সেরা গোপাল ভাঁড় প্রোজেক্টের জন্য নিজের মতো করে কৌতুকগুলো লিখেছি। সেই কষ্টের প্রতি সম্মান দেখিয়ে একটা লিংক তো রাখাই যেতো!

তিন

সেদিন ক্যাম্পাসে বিশ ডলারের একটা নোট কুড়িয়ে পেলাম। টরন্টোর রাস্তায় পেনি কিংবা ডাইম অহরহ নির্লিপ্ত ভাবে পড়ে থাকে। পূর্ব ইউরোপের মানুষ ছাড়া আর কেউ তুলে নেবার প্রয়োজনও বোধ করে না। ওদের একটা ব্যাপার আছে, রাস্তায় পয়সা কুড়িয়ে পাওয়াটা ওদের সৌভাগ্যের প্রতীক। কিন্তু এভাবে বড় ডলারের বিল কুড়িয়ে পেলে কেমন যেনো হতভম্ব হয়ে যেতে হয়। অনেকে বলবে দান করে দিতে, শেষে তাই হয়তো করবো, কিন্তু অন্যের টাকায় মহামানব সাজাতে কেমন জানি লাগে। হয়তো কোনো শিক্ষার্থীর দুই বেলার খাবার ছিলো এই টাকাটা। কিংবা কাজের ফাঁকে ফাঁকে কফিতে চুমুক দেবার সম্বল। কিংবা পাঠ্যপুস্তক কেনার জন্য সদ্য এটিএম থেকে তুলে নেয়া। এসব ভাবনার মাঝে টাকাটা ওয়ালেটে কাঁটার মতো বিঁধে থাকে।

চার

প্রবাসে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালি সংগঠন দেখলাম। এসব সংগঠন উদ্যোক্তাদের প্রধান উদ্দেশ্য কী তা কোনো মতেই ধরতে পারি না। আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি আমার স্বল্পবুদ্ধিতে চারটি প্রধান উদ্দেশ্য লিখে দেবো -

১) বাংলাদেশ থেকে আগত নতুন শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা।
২) প্রবাসে বাঙালি ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতির প্রচার করা।
৩) বাংলাদেশ/বাঙালির যে কোনো সংকটে প্রবাসে জনসংযোগ রক্ষা করা ও বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করা।
৪) প্রবাসী বাঙালিদের পারস্পরিক সংযোগ বৃদ্ধি করা।

আমার দেখা (নিচে দাগ দিয়ে দিলাম কারণ অনেকেই মন খারাপ করে বলবেন তাদের সংগঠন মোটেই এমন নয়) কোনো বাঙালি সংগঠনই প্রথম তিনটা উদ্দেশ্য তেমন পাত্তা দেয় না। "প্রবাসী বাঙালিদের পারস্পরিক সংযোগ" তাও কিছুটা রক্ষা হয়, তবু সেটা নিজেদের কয়েকটা দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে বলে আমার ধারণা। একদম মোটা দাগে বলতে হলে বলা যায় - বাঙালি সংগঠনগুলোর মূল কাজ হলো ফুর্তি করা। পার্টি হবে, বল হবে, ফর্মাল হবে... ফুর্তি করা যায় এমন সব হবে, কিন্তু কাজের কাজ হবে না। ফুর্তি মন্দ কিছু না, কিন্তু এই ফুর্তি করতে গিয়েও প্রথম তিনটা উদ্দেশ্যের শ্রাদ্ধ করা হয়। "বাংলাদেশ কালচারাল শো"-র নামে হিন্দি গান বাজিয়ে বলিউড নৃত্য আর পাশ্চাত্য জামায় ফ্যাশন শো তো একটা সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে।

দেশ ও বাঙালির সংকটে কোনো সংগঠনকেই কখনো কাছে পাইনি। একলাই চলতে হয়েছে। সিডরের পর অনেক বলেও বাঙালি সংগঠনকে দিয়ে তাৎক্ষণিক ভাবে কিছু করাতে পারিনি। সবাই বলেছে আগামী মাসে কনসার্ট হবে, সেই কনসার্টের টাকা দেশে পাঠানো হবে। এতো বড় দুর্যোগের একমাস পরে টাকা পাঠালে সেটা কতটা কার্যকরী? কনসার্ট ঠিক আছে, কিন্তু তার আগেও আমরা অর্থ সংগ্রহ করতে পারতাম। ৫০০ শিক্ষার্থী ৫ ডলার করে দিলেও ২৫০০ ডলার হয়ে যাচ্ছে, মানে ১৫১৮০০ টাকা। স্কুলে দানবাক্স খুলেও অর্থ সংগ্রহ করা যেতো। কেউ কথা কানে নেয়নি। (সিডরের সময় আমাকে বরং সাহায্য করেছিলো ইউনিয়ন কিউপি - বাংলাদেশের সাথে যাদের কোনো সংযোগ নেই।) ক'মাস আগে মুক্তিযোদ্ধা এস এম খালেদকে বাঁচাতে বাঙালি সংগঠনের সাথে একটা চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের কথা বলেছিলাম। ৫ ডলার করে টিকেট, ২ ডলারে সিঙারা-সামোসার ব্যবস্থা। টাকা যা উঠবে সব তহবিলে জমা হবে। ওরা প্রথমে করবে বলে আশা দিয়েও পরে নানান সমস্যার কথা বলে পাশ কাটিয়ে গেলো। অথচ তার কিছুদিন বাদে আরো বেশি ঝামেলা সহ্য করে বিশাল এক উৎসবানুষ্ঠান ঠিকই আয়োজন করে ফেললো। এই যে এখন সাইক্লোন আইলার তান্ডব শেষে দেশের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। কোনো সংগঠনেরই কোনো মাথা ব্যাথা দেখি না এই নিয়ে। মন্দের ভালো যা তা হলো শখ হলে (বড় কোনো অনুষ্ঠানে, উপস্থিত সব মানুষের সামনে ঘোষণা দিয়ে) সংগঠনগুলো মাঝে মাঝে কিছু টাকা কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করে। থাকুক, না হয় কানামামাই সই।

পাঁচ

দিনকাল ইদানিং খুব ভালো যাচ্ছে না। মানুষের সাথে ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। গোয়ার্তুমির কারণে এসব সমস্যা সমস্যা হিসেবেই থেকে যাচ্ছে, সমাধান আসছে না। আমি যে এসব খুব পরোয়া করি তাও না। তবু একাধারে একই ধরণের ঘটনা দেখলে একটু দমে যাই। এদিকে আমার দোস্ত শিবলীর বিয়ে হচ্ছে। সেই বিয়েতে থাকার ইচ্ছে ছিলো। সেই সুযোগও হলো না। ঝামেলার মাঝে আমার সব সময় বাবা-মা-ভাই পরিজনদের কথা মনে পড়ে। তাই দেশে যাবো। বন্ধুর বিয়ে শেষে, না হয় একটু দেরি করেই যাবো। তবু তো সকালে উঠে মার বানানো পরোটা খাবো। দুপুরে একা একা দেশের মাটি দাবড়িয়ে বেড়াবো। রাত্তিরে আবার ভালো ছেলের মতো বাসায় ফিরে বাবার সাথে ভাত খাবো। এরচেয়ে চিন্তাহীন জীবন আর হয় না!

ছয়

গান নিয়ে আমার কোনো শুচিবাই নেই। রক, পপ, টেকনো, মেলো, মেটাল, রিমিক্স, র‌্যাপ, রেগে... বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, আরবি, স্প্যানিশ, ফারসি... যা পাই তাই শুনি। কোনোটা ভালো লাগলে সেটা বার বার শুনি। অনেকে ফুয়াদ-হাবিব-বালাম জেনারেশনকে নিয়ে কটু কথা বলেন। আমি মন্দ কিছু দেখি না।

প্রবাসে আসার আগে, সেই ১৯৯৯ এর দিকে, যখন কলেজ সবে শেষ করেছি, আমাদের সবার গাড়িতে গান মানেই ছিলো মেটালিকা-স্করপিওনস-বনজোভি, মডার্ন টকিং-এয়ার সাপ্লাই-ডায়ার স্ট্রেইটস, কিংবা খুব কাছাকাছি হলে বোম্বে ভাইকিংস-শান-জুনুন। বাংলা গানের সিন ছিলো কেবল আমাদের বাবা-মা'দের গাড়িতে। তাও সেটা রবীন্দ্র-নজরুল-লালন আর ভারতীয় আধুনিক বাংলার বাইরে যেতো না। আর দূরপাল্লার বাস মানেই তো ছিলো হিন্দি গান।

সেই অবস্থা কিন্তু আর নেই। এখন দেশে দেখি সব দোস্তের গাড়িতেই বাংলা সিডি বাজছে। সদ্য ওড়না পরা মেয়ে শুনছে ফুয়াদ-বালাম, আর সদ্য গোঁফ ওঠা ছেলেরা শুনছে আর্বোভাইরাস-আর্টসেল। বয়স্কদেরও দেখি বাংলা আধুনিক গান আর ন্যান্সি-হাবিবের গান শুনতে। বেশিরভাগ সিডির দোকানে নয়া বাংলা সিডি বাজে। মনটা ভরে যায় দেখলে!

আমি বাংলাদেশের আন্ডারগ্রাউন্ড রক ব্যান্ডগুলোর দারুন ভক্ত। দেশে গেলেই এক-দু'টো কনসার্ট দেখে ফেলি। ছেলেগুলোর দুর্দান্ত মিউজিক সেন্স। আমার প্রিয় ব্যান্ড যে আর্বোভাইরাস সেটা আমার আগের ব্লগ আর বই পড়েই বুঝে ফেলার কথা। আরো শুনি স্টেনটোরিয়ান, আইকনস, ক্রিপটিক ফেট, ফুলবানুস রিভেঞ্জ, কপরোফিলিয়া, পাওয়ারসার্জ, রিবর্ন, দূরে, ইত্যাদি। শুনে দেখতে পারেন। অর্থহীন, ওয়ারফেজ, আর আর্টসেল এখন আর আন্ডারগ্রাউন্ড নেই, মেইনস্ট্রিমে ঢুকে গেছে। আর ব্ল্যাকের গান আমার কখনোই তেমন ভালো লাগেনি।

একটা কথা - সঙ্গীত শিল্পীদের পোশাক আর চলন-বলন নিয়ে অনেককেই অনেক কথা বলতে শুনি। কথা চলতেই পারে, কিন্তু তা দিয়ে তাদের সঙ্গীত কেনো যাচাই করা হবে?

© অমিত আহমেদ