কফির কেচ্ছা
প্রথমদিন আমি খুব স্নেহ নিয়ে বললাম, "বলতো ভাইয়া, এখন কে আমার জন্য কফি বানাবে?"
কিংকং ও বিপ্র একসাথে হাত তুলে বেশ উত্তেজনা নিয়ে, "এই যে ভাইয়া। আমি... আমি!!"
দ্বিতীয়দিন, "বলতো ভাইয়া, এখন কে কফি বানাবে?"
বিপ্র খুব অনিচ্ছা নিয়ে, "আচ্ছা আমিই বানাই!"
তৃতীয়দিন আবার, "বলতো ভাইয়া, এখন কে আমার জন্য কফি বানাবে?"
কিংকং ও বিপ্র একসাথে, "আপনিই বানান। আর আমাদের জন্যও দুই কাপ আইনেন।"
ঘুম ঘুম কেনো আজ আমার?
দ্বিতীয়দিনেও কিংকং এর ঘুম ভাঙানো যাচ্ছে না। সবাই গিয়ে চেষ্টা করে এসেছে। আমাদের ব্যর্থতা দেখে শিমুল খুব কষ্ট করে অনেক সময় নিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। আড়মোড়া ভেঙে বলে, "এসব কাজ হলো আসল বড় ভাইয়ের বুঝলা? এক্ষণি ওকে নিয়ে আসতেছি। দেখে শেখো এইসব।" পাশের কামরা থেকে হঠাৎ শিমুলের জলদ কন্ঠ শুনে আমরা সবাই চমকে যাই, "কিংকং! আরে এই কিংকং। আরে দুপুর হয়ে গেছে তো। সবাই তৈয়ার হয়ে বসে আছে। ওঠো ওঠো..." একটু পরে শিমুল এসে মন খারাপ গলায় বলে, "কিংকং মনে হয় মাইন্ড করে বসলো বুঝলা। ঘুমের মাঝে হঠাৎ আমি গিয়ে চিৎকার দিয়েছি। সে গেছে চমকে..."
হালিম আর হালুম
প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই সকালে নাস্তা দিচ্ছেন। আমি শিমুল আর বিপ্র বসেছি। কিংকংকে তখনো ঘুম থেকে ওঠানো যায়নি। আমরা নাস্তা করছি। এর ফাঁকে দেখি প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই কি খুটখাট করছেন। শিমুল জিগায়, "পিপি'দা কী করেন?"
"এই হালিম করেছিলাম তো তোমাদের জন্য, সেটা গরম করছি।"
শিমুল উত্তেজিত হয়ে, "আরে না না। রাখেন তো। এখন লাগবে না। কেনো এতো ঝামেলা করেন? এমনিতেই তো অনেক নাস্তা করেছি।"
বিপ্র, "ঠিকই ভাইয়া। আমরা বরং পরে হালিম খাই। রাত্রে ফিরে।"
আমি, "ওস্তাদ, আপনি গরম করেন তো। গরম করেন। ওদের দরকার নাই। আমি খাবো।"
আমার কথায় শিমুল ও বিপ্র খুব আপত্তি জানায়।
পাঁচ মিনিট পরে দেখা যায় বিপ্র খুব আগ্রহ নিয়ে হালিমের জন্য পেয়াজ ভাঁজছে। আর শিমুল একাই তিন বাটি হালিম সাঁটাচ্ছে।
শিখবা নাকি ক্যামেরাবাজী?
প্রথম দিন একসাথে সবাই বসে আছি। প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই দুম করে বের করেন তাঁর ক্যামেরা। নীল তিমির মতো আকার। অ্যানাকোন্ডার মতো লেন্স। নানান রকমের তার-সূতা। তাঁকে দেখে কিংকংও আর দেরি করে না। বের করে ওর হাঙর সদৃশ ক্যামেরা। হাতির শুঁড়ের মতো লেন্স। শিমুল-বিপ্রও বসে থাকে না। ওয়েস্টার্ন সিনেমার মতো নায়কদের মতো এখন ওখান থেকে হুট-হাট দামী ডিজিটাল ক্যামেরা বের হয়ে যায়। অপটিকাল লেন্স ওঠানামার হিশহিশে আওয়াজ শোনা যায়। এবার সবাই আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি শুকনা গলায় বলি, "আমি বুঝলেন আগে একটু হাত পাকিয়ে তারপরে কেনায় বিশ্বাস করি। মানে অনেক দাম তো... আর ধরেন..."
বিপ্র, ভাইয়া...
ফেরির ছাদে বসে আড্ডা মারছি সবাই। শিমুল পাড়ার মাস্তান বড় ভাইয়ের মতো লোহার বেঞ্চে পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে আছে। বিপ্র কথা বলে কম। চুপচাপ বসে শোনে শুধু। তো হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে শিমুল খুব পাটে জিজ্ঞেস করে, "কী বিপ্র ভাইয়া? সব ভালো তো?"
ভিনাস ফ্লাইট্র্যাপ
দ্বীপে গিয়েই আমি আর কিংকং সাইকেল ভাড়া করে নিলাম। এরপরে সারা দ্বীপে, জঙ্গলে চরকিবাজী। এর মাঝে একটা জংলা ফুল দেখে আমি সাইকেল থামাই। উত্তেজনা নিয়ে বলি, "কিংকং, এটা ভিনাস ফ্ল্যাইট্রাপ না? দেখছো?"
কিংকং খুব উত্তেজনা নিয়ে ওর ক্যামেরা বের করে, "কই ভাইয়া? কই?"
আমি আঙুল তুলে একটা জংলা গাছ ভর্তি ফুল দেখাই। ফুল ধরতে গেলে কিংকং সতর্ক গলায় বলে, "দেইখেন আঙুল খায়া ফেলবে আবার!" আমি ভয়ার্ত ভাবে হাত সরিয়ে নেই। অসংখ্য ছবি তোলা হয়।
কিংকং মুগ্ধ গলায় বলে, "চিনলেন ক্যামনে?"
আমি খুব পাট নিয়ে বলি, "শুধু সাইকেল চালাইলে হবে? চোখ-কানও খোলা রাখতে হয় বুঝলা!"
পরে প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই মারফত জানা যাই উহা ভিনাস ফ্ল্যাইট্র্যাপের ধারে কাছের কোনো বংশ না।
সিকিউরিটি
প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই আমাদের আগেই ইমেইল করে তাঁর রাউটারের সিকিউরিটি কী দিয়ে দিয়েছিলেন যাতে তাঁর বাসায় গিয়েই আমরা পুরোদমে ব্লগিং করতে পারি। কিন্তু বাসায় পৌঁছে দেখা গেলো সেটা কেউই সেভ করে নাই। আমি সবাইকে খুব ঝাড়ি দেই, "এসব কী? এটা কোনো কথা? প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই ইমেইল তো একটা কারণে করেছিলেন নাকি?" সবাই মন খারাপ করে। কিংকং-এর লিখে দেয়া একটা কাগজের টুকরো দেখে বিমর্ষ মুখে ল্যাপটপে কী টোকে। ওদের শেষ হলে আমি আমার ল্যাপটপ চালু করে মিহি গলায় ডাকি, "হেই শিমুল। কাগজটা একটু এদিকে পাস করো তো!"
মেনেছি গো, হার মেনেছি
দ্বিতীয় দিনে ধুম আড্ডা হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে শিমুলের ঘুম পেয়েছে। আবার আড্ডাও ছাড়তে পারছে না। তাই সে খুব মমতা দেখিয়ে বলে, "বিপ্র ভাইয়া, ঘুম পেয়েছে? না?" বিপ্র সেই কথায় কানই দেয় না। শিমুল আবার বলে, “কিংকং, যাও ভাই। ঘুমিয়ে পড়ো। কালকে সকালে উঠে শহর ঘুরতে বেরুবো না?” কিংকং মনে হয় খেয়ালও করে না। শিমুল আমাকে বলে, “বুঝলা অমিত, সারাদিন দ্বীপে ঘুরে সবাই খুব ক্লান্ত। ঘুম দিলে কালকের জন্য একদম ফ্রেশ হয়ে যাবো সবাই।” আমি শিমুলের কথায় কান না দিয়ে কিংকং এর বলা কোনো কৌতুকে খ্যাখ্যা করে হাসি। একটু পরে দেখা যায় ব্যর্থ চেষ্টা ভঙ্গ দিয়ে শিমুল আড্ডার মাঝেই উলটো হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
আমি বাংলায় কথা
বাসে উঠে আমি আর কিংকং বাসের সবাইকে নিয়ে গবেষণা শুরু করি। ব্লগ ব্যক্তিগত জীবন চিন্তা চেতনা নিয়েও কথা হয়। কেউ যেনো বুঝতে না পারে এজন্য আমরা খুব সতর্ক ভাবে বাছাই বাংলা শব্দেই কেবল আলাপ সারি। তিন ঘন্টা পরে লন্ডনে বাস থামলে পেছনের সিটের ভদ্রলোক, যাকে আমরা "টাকলা" বলে সম্বোধন করে এসেছি, শুদ্ধ বাংলায় বলেন, "ভাই আপনাদের আলোচনা শুনে খুব আনন্দ পেয়েছি।"
© অমিত আহমেদ
প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ১ জুলাই ২০০৯
আমি কোথাও যেতে চাই না
-
ছেড়ে যাওয়া ট্রেন দেখলে আমার কেবলি মনে হয়, কোথাও যেন আমার যাওয়ার ছিল। বুকের ভেতর অন্য রকম, অজানা একটা চাপা কষ্ট হয়। কিন্তু ট্রেনে চেপে বসলে আমার কোখাও যাওয়ার ...
13 hours ago



