Saturday, February 06, 2010

যে বইগুলোর অপেক্ষায় ৫: লুহার তালা

লুহার তালা
আবু মুস্তাফিজ

প্রকাশক: আহমেদুর রশীদ, শুদ্ধস্বর
প্রচ্ছদশিল্পী: আহমেদ অরূপ কামাল
গল্পগ্রন্থ, ৪৮ পৃষ্ঠা
মূল্য ৯০ টাকা

কবি আবু মুস্তাফিজের ব্লগপরিমন্ডলে অভ্যাগমন নিয়ে আরেক প্রিয় কবি সুমন চৌধুরী লিখেছিলেন, "সাড়া পড়ে গেলো। যারা বুঝলো তাঁরা ছাড়াও যারা বুঝলো না তাঁদের মধ্যেও।"

এই কথাটি যে কতোটা সত্য তা বোঝা যায় কবি আবু মুস্তাফিজ ওরফে শাপলু, যিনি ব্লগপরিমন্ডলে সবুজ বাঘ নামেই বেশি পরিচিত, তাঁর কবিতা নিয়ে আমার মতো কাব্যাপোগন্ডের অনুরক্তি দিয়ে। যদিও শাপলু'দার ব্লগে হাতেখড়ি বাঁধ ভাঙার আওয়াজ ব্লগে, আমার সাথে তাঁর মোলাকাত সচলায়তনেই।

সচলায়তনে প্রথম যখন পড়লাম, "একটা অবিবাহিত ফন্টেমা", "ধৈর্য ধরে আছি সুনা", "একটা সমন্বিত বাঘ এবং অপরিণত ঘুড়া", এবং "তাহিতি দ্বীপের বাঁহাতি ছোকরা", আটকা পড়ে গেলাম। ব্লগে কবিতার মতো গল্প সেভাবে লিখেননি সবুজ বাঘ। "লুহার তালা" কিংবা "সুভদ্র বাঘ এবং বেলেহাজ বিড়াল"-এর মতো অল্প যে কয়টি লিখেছেন, সেগুলোও তাঁর কবিতার মতোই প্রচন্ড স্বকীয়তায় বিনির্গত।

তাঁর লেখার নিরব পাঠক আমি। কারণ, তাঁর গদ্য ও পদ্যপাঠ পরবর্তী ইন্দ্রজালিক আবহে এক শব্দের বিশেষণ ছাড়া আমার মাথায় আর কিছুই আসে না। আর "দারুন", "দুর্দান্ত", বিশেষণগুলো শাপলুদা'র লেখার প্রেক্ষিতে আমার বরাবরই কেমন যেনো হালকা বলে মনে হয়েছে।

প্রথম মন্তব্য করেছিলাম সম্ভবত "একটা ঘাসখাইকা বাঘ এবং ভুদাই ঘুড়া" লেখাটিতে। যখন দেখলাম জনৈক ব্লগার লেখাটিতে অশ্লীলতার অভিযোগ তুলে আপত্তি জানিয়েছেন তখন বলতেই হলো, "সবুজ বাঘ তাঁর রসস্য শব্দ নির্বাচন ও চটুল বাক্যগঠনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভাবাত্মক গদ্যরচনার একটি নিজস্ব ধরণ সৃষ্টি করেছেন। আমার কাছে তাঁর লেখা ভাল লাগে এ কারণেই। সহব্লগার আমার ভালো লাগার এ বিষয়গুলো নিয়েই আপত্তি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে বদ্দার (সুমন চৌধুরী) মন্তব্যের সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত - সৃষ্টিশীল সাহিত্যকে ছাড় দিতেই হয়। না হলে যাদের কাছে সংশ্লিষ্ট উচ্চারণের গ্রহণযোগ্যতা আছে তাদের প্রতি অবিচার করা হয়।" মন্তব্যটি তুলে দিলাম কারণ তাঁর লেখা কেনো ভালো লাগে তা ছোট পরিসরে এখানেই প্রকাশ পেয়েছে।

আবু মুস্তাফিজের লেখা, শেষাবধি, আমার মনে হয় স্বগতভাষণ। প্রখর কোনো হাতিয়ার। দিব্যাস্ত্র। যেসব কথা সব সময় বলা যায় না, যেসব কথা সবাই সব সময় শুনতে চায় না, সেসব কথা চিৎকার করে বলার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় তাঁর গল্প ও কবিতা। সাহিত্যচর্চার পোশাকি ভাষা ও মেজাজ ছুঁড়ে ফেলে তিনি তুলে নেন তাঁর নিজস্ব শব্দাবলী। তৈরি করেন নিজস্ব বাস্তবতা। বাস্তবতার রূপকথা। নিজস্ব পাঠকগোষ্ঠী।

আবু মুস্তাফিজের লেখা তাই যেনো আমার কাছে দম দেয়া কোনো অ্যালার্ম ঘড়ি। তাঁর লেখা তো পড়লেই পড়া হয়ে যায় না। বরং অ্যালার্মের তীক্ষ্ণতায় গা ঝাড়া দিয়ে লৌকিকতার মোড়ক খুলে উঠে দাঁড়ায় পৃথিবী। খসে খসে পড়ে সামাজিকতার পলেস্তারা। আর আমরা ধন্দ লাগা চোখে সেই নিরাভরণ পৃথিবীর রঙ দেখি। এ এক প্রচন্ড লোভ। আর সেই লোভেই অপেক্ষায় থাকি লেখক আবু মুস্তাফিজের প্রথম গল্পগ্রন্থ "লুহার তালা"র।

শত হলেও এ পিথিবি তো নিদান্তই একটা ভ্রান্ত ধারমা!

© অমিত আহমেদ