Tuesday, June 07, 2011

গুরু, তোমায় সালাম

নটরডেমে যারা পড়েছেন, বিশেষ করে যারা নিয়মিত ক্লাস ফাঁকি দিয়েছেন, তাদের অনেকেরই হয়তো গুরুর সাথে সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয়েছে। আমার সাথে একাধিকবার হয়েছে।

একদম প্রথমদিনের কথা বলি, আমি এ. সি. দাস স্যারের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে রফিক মামুর টংয়ে বসে আছি। বাতেনী আলাপ হচ্ছে। দেখি গুরু একটা বোয়াম থেকে চকলেট বের করে নিচ্ছেন। পরনে রঙচটা ট্র্যাকস্যুট, টিশার্ট। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। মুখে "হারিয়ে গেছি" টাইপ হাসি। আমি অত্যধিক উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। সে বয়সে কিছু মানুষের জন্য তীব্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসা বহন করে ফিরতাম। তিনি শ্রদ্ধার সেই মানুষগুলোর তালিকায় ছিলেন একদম শুরুর দিকে।

আমি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, "গুরু, আমার নাম সাব্বির!" এতো কিছু বাদ দিয়ে নিজের নাম জানান দেবার আগ্রহ কেনো প্রবল হয়ে উঠলো তা জানি না, তাও সেই নাম যে নামে শিক্ষকরা ছাড়া আমাকে খুব বেশি কেউ ডাকেন না। উনি হাসি হাসি মুখে বললেন, "আচ্ছা!" আমি থড়বড় করে বললাম, "গুরু কি এ'দিকেই থাকেন?" উনি আঙুল তুলে সামনের রাস্তা দেখিয়ে জবাব দিলেন, "হ্যাঁ, ওইতো, সামনেই থাকি। কমলাপুর।" তখন দু'একটা মিশ্র অ্যালবাম বাদে তাঁর গান পাওয়া যেতো না। সেই নিয়ে অভিযোগ জানালাম। উনি খুব অকপট ভাবেই কেনো গানের অ্যালবাম করতে পারেন না সেটা বলে দিলেন। অচেনা মানুষের সাথে কথা হচ্ছে, সেই নিয়ে কোনো দ্বিধা তাঁর মধ্যে দেখিনি। যা বলার তা সরাসরি এবং আত্মবিশ্বাস নিয়েই বলেছেন। এমন সারল্য আমি অন্য কোনো তারকার মাঝে দেখিনি।

Sunday, May 15, 2011

পলাতক আত্মবিশ্বাসের পুনরুত্থান

নানান ভুল ধারণা পুষে রাখা আমার স্বভাব। এর একটি বড় অংশই নিজেকে নিয়ে। যেমন, ধারণা ছিলো কাজের চাপ সে যতোই হোক না কেনো, আমি সামলাতে পারি।

আমার ব্যক্তিগত রেকর্ড তিনদিন টানা কাজ করা। তিনদিন বলতে শুধু দিন বোঝাচ্ছি না, রাতও, মোট ৭২ ঘন্টা। মাঝে অবশ্য কফি ও নিকোটিন বিরতিগুলো বাদ যাবে।

যারা এভাবে কাজ করেননি তাদের বলি, ব্যাপারটি শুনতে যতোটা কঠিন মনে হচ্ছে আসলে ততোটা না। ৩৬ ঘন্টা কাজ করার পর শরীরে "তোর মায়রে বাপ" টাইপ একটি ভাব আসে। ঘুম থাকে না ধারে কাছে। ৬০ ঘন্টা পর কাজের গতি ঝুলে যায়। এক ঘন্টার কাজ করতে দুই ঘন্টা লাগে। ক্ষুধা একদমই থাকে না। মাথায় চিনচিনে একটি শব্দ স্থায়ী হয়ে যায়। কেউ জোরে কথা বললে ইচ্ছে করে বাম কানের নিচে কষে একটা থাবড়া লাগাই। এছাড়া কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি নেই।

একদম প্রথমবারের কথা মনে আছে। তখন স্নাতক তৃতীয়বর্ষে পড়ি। এক টার্মে সাতটা কোর্স নিয়ে ছ্যাড়াবেড়া অবস্থা। সাথে আবার প্রোজেক্টও আছে। টানা তিনদিন কাজ করে চতুর্থদিন সকালবেলা গেছি পাঠাগারে। দুপুর বারোটায় পরীক্ষা। ইচ্ছে কিছুক্ষণ কাজ করে সোজা পরীক্ষা হলে চলে যাবো। সেই ভেবে একটি কাউচে বসতে না বসতেই ঘুমিয়ে পড়লাম! ঘুম ভাঙলো পরীক্ষা শুরু হবার এক ঘন্টা পর। ভাগ্য ভালো পরীক্ষা ছিলো তিন ঘন্টার, আর পরীক্ষা হলে দৌড়ে যেতে সময় লাগতো পাঁচ মিনিট।

সেই থেকে না ঘুমিয়ে কাজ করে যাওয়াটা নিত্যনৈমিত্তিকই হচ্ছে। ভুল ধারণার সূত্রপাত সেই থেকেই।

তবে যে জিনিসটি আমার নজর এড়িয়ে গিয়েছিলো সেটি হলো আমার কাজ করার প্রাথমিক গতি আসলে সরলরৈখিক। যখন পড়ছি তখন পড়া নিয়েই ব্যস্ত থেকেছি। যখন অন্য কাজ করেছি তখন সেই কাজই করে গেছি। নানান ধরনের কাজ মিলিয়ে-গুলিয়ে কখনো একাকার হয়ে যায়নি। যখন গেলো তখন বুঝলাম, আমি এর জন্য মোটেও প্রস্তুত নই!

Saturday, March 20, 2010

গল্প: অনাহূত আগন্তুক

পাঠপূর্ব হিতকথা
এটা পূর্ণাঙ্গ গল্প। কিস্তি-টিস্তির বালাই নেই। তাই আকারে প্রকান্ড। আগেই ভাগেই জানিয়ে দেয়া জরুরি মনে করলাম।

এক

এনযো স্কদিত্তি কৌতুহল নিয়ে চেয়ারের সাথে হাত-পা বাঁধা যুবককে দেখে। চেতনা নেই। মাথা বামদিকে নুয়ে আছে। এলোমেলো চুল ভিজে গেছে ঘামে। খুলির বামদিকে কেটে গেছে বেশ অনেকটাই। সেখান থেকে চুল বেয়ে পনেরো সেকেন্ড অন্তর অন্তর রক্তের ফোটা ঝরছে। টপ টপ!

বোঝাই যাচ্ছে ছোকরা ধরা পড়ার সাথেসাথেই তাকে ডাকা হয়নি। আগে একদফা মারধোর করা হয়েছে। এনযো বিরক্ত হয়। হাতে একদমই সময় নেই। এখন প্রতিটা মিনিটের গায়ে আলাদা করে দাম লেখা আছে। এই অবস্থাতেও গর্দভগুলো মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে না! এনযো মুখে কিছু বলে না; বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে একে একে ঘিরে দাঁড়ানো তিনজনের দিকে তাকায়। তিনজনই সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে অটোমেটিক এম-সিক্সটিন ধরে আছে।

আবার ফিরে তাকায় এনযো। কে হতে পারে?

চেহারা দেখেই সব বলে দিতে পারে বলে নাম আছে এনযোর। অভিজ্ঞতা তো আর কম হলো না! বড় হয়েছে আপটাউনের ইটালিয়ান পাড়ায়। ছেলেবেলা থেকেই চালাচালি আর মারদাঙ্গায় গা সয়ে গেছে। সতেরো বছর বয়সে নাম লিখিয়েছিলো ফিলিপ্পো পরিবারের পারিবারিক ব্যবসায়। এই ব্যবসায় গাফলতির ক্ষমা নেই। বিশ্বাসঘাতকের রেহাই নেই।

অনেক আগের কথা। এনযো আর জিয়ান্নির নাম তখন সবে ফিলিপ্পো পরিবারের খাতায় উঠেছে। জিয়ান্নি বয়সে বড় ছিলো। পঁচিশ কী ছাব্বিশ। ওর বন্ধু ছিলো ফিওন। ইটালিয়ান নয়, সোনালী চুলের আইরিশ। দুই দোস্ত মিলে তখন আপটাউন মাতিয়ে রাখে। একসাথে ক্লাবে যায়। মদ খায়। মারামারি করে। গোলাগুলি করে। মেয়ে নিয়ে মোটেলে ওঠে। মনে আছে জিয়ান্নির চাপাচাপিতেই বুড়ো সান্তো ফিলিপ্পো ওদের সাথে সাথে ফিওনকেও দলে নিয়ে নিলো। পরে জানা গেলো ফিওন আসলে পুলিশের সোর্স!

জানা জানি হবার পরে ফিওনের কিচ্ছু হলো না। তবে দু'দিন বাদে জিয়ান্নির লাশ পাওয়া গেলো ব্ল্যাক ক্রিক পার্কে। সেই থেকে কারো সাথে পরিচয় হলেই তাকে যাচাই করে নেবার অভ্যাস এনযোর। শখে নয়, এটা আত্মরক্ষার জন্যই।

তবে এই যুবককে দেখে এনযো কিছুই ধরতে পারে না। নিখুঁত চুলের ছাঁট। পয়সাওয়ালা ধনীর দুলালেরা দু'শো ডলার দিয়ে এভাবে চুল কাটায়। শরীরে দামী স্যুট। কোনো লেবেল নেই। তার মানে এমন কারো শেলাই করা যিনি নির্দিষ্ট কয়েকজন খদ্দের ছাড়া আর কারো কাজ করেন না। বাকি সবও পয়সার কথাই বলে। গুচি জুতো, রোলেক্স ঘড়ি, সাদা সিল্ক শার্ট। অন্য সময় হলে এনযো হয়তো তাই ভাবতো। কিন্তু কিছু ব্যাপার খাপ খাচ্ছে না।

একে ছেলের লম্বা পেটানো শরীর। না শখ করে বানানো শরীর এ নয়। এসব দেখলেই বোঝা যায়। আর, শরীর জুড়ে অসংখ্য ক্ষতচিন্থ। কিছু দাগ চিনতে পারে এনযো। তার নিজেরও আছে। সে পঞ্চাশে পড়লো গত সপ্তাহে। আর এই ছেলের বয়স সাতাশের বেশি হবে না। তবু ছেঁড়া শার্টের ফাঁকে পুরানো চিন্থগুলোর নমুনা দেখে শিউরে ওঠে স্কদিত্তি!

অন্য সময়, অন্য কেউ হলে, এনযো এতো ভাবতো না। সরাসরি কপালে একটা বুলেট ঢুকিয়ে দিতো। পারছে না এই দাগগুলোর জন্যই। যে ছেলে এতো ক্ষতচিন্থের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে, তাকে কিছুতেই অচেতন অবস্থায় গুলি করে মারা যায় না। এতো হারামী এনযো হয়নি এখনো!

"মার্কো, লুসিও, জিরাল্ডো... হা করে মুখের দিকে তাকিয়ে আছিস কেনো হারামজাদারা? যা পানি নিয়ে আয় এক্ষুণি। মুখে ছিটিয়ে দে।" পাশে দাঁড়ানো ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে খেঁকিয়ে ওঠে এনযো স্কদিত্তি।