Saturday, September 29, 2007

গল্প: না বলা কথা

লম্বা পায়ে হেঁটে যত্নহীণ উঠোনটা পেরিয়ে পুরনো বাড়িটার দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় পড়ন্ত ত্রিশের ঝাঁকড়াচুলো মতি।

বড় করে দরজার পাশে বাসার নাম্বার লেখা ৯৬। এটাই তো? আলগোছে কোটের পকেট থেকে একটা কালো নোটবুক বের করে ও, একটা পাতা উলটে মিলিয়ে নেয় নাম্বারটা, এর পর কড়া নাড়ে। কড়া নাড়ার প্রায় সাথে সাথেই মতিকে চমকে দিয়ে দরজাটা খুলে যায়। বেনী করা আঠারো-উনিশের একটা মেয়ে। বড় বড় চশমা পড়া, মায়াকাড়া চেহারা। মতিকে দেখেই সে ঝলমলিয়ে উঠে বলে, “খান সাহেব?”

দরজা খুলেই এমন সম্বোধনে একটু ঘাবড়েই যায় রানা, আমতা আমতা করে বলে, “জ্বী!”

হড়হড় করে বলে “আপনি এসেছেন, আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না! আসুন আসুন... ভেতরে আসুন, দাদাজান অপেক্ষা করছেন তো আপনার জন্য!” দরজার কপাট পুরোটাই খুলে দেয় মেয়েটা।

একটু দ্বিধা নিয়েই ঢুকে পড়ে মতি! বাসার ভেতরটাও বাইরের মতই জীর্ণ, দারিদ্রের ছাপটা ভালমতই চোখে পড়ে।

“আমি ভাবতেই পারিনি আপনি আসবেন! ফোনে আপনার কথা শুনে একটুও মনে হয়নি কিন্তু!”

“ফোনে?”

“জ্বী! আপনি যেভাবে ‘দেখি!’ বলে ফোনটা রেখে দিলেন! আমি মাকেও বলেছি, দাদাজানকেও বলেছি যে আপনি আসবেন না। দাদাজান মোটেও বিশ্বাস করেননি। তিনি বলেন, ‘নাহ, খান আমার কথা ফেলবে না!’”
খিলখিল করে হাসে কিশোরী, বলে, “এটা অবিশ্যি দাদাজান তাঁর সব ছাত্রকে নিয়েই বলেন।”

মেয়েটা হঠাৎই যেন খেয়াল করে তারা এখনো করিডোরেই দাঁড়িয়ে আছে। খপ করে মতির হাতটা ধরে ফেলে সে, টান দিয়ে বলে, “আরে, এখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন যে! আসেন, ভেতরে আসেন!”

যে কামরায় ঢোকা হলো সেটা অনেকটা স্টাডির মত। চারিদিকে ছড়ানো হাজারো বই। তার ফাঁকে একটা ইজিচেয়ারে চোখ বুঁজে শুয়ে আছেন সাদা দাঁড়িগোঁফের জঙ্গলে ঢাকা একজন অতিশয় বৃদ্ধ। দেখেই বোঝা যায়, ভদ্রলোকের শরীরটা ভাল নেই। তাঁর চেয়ারের পাশে একটা টেবিলে দুটো কাপ রাখা। আর তার পাশে একটা ছোট্ট কাঠের টুল।

কিশোরী সটান হেঁটে যায় বৃদ্ধের দিকে, তাঁর একটা হাত তুলে নিয়ে মাথাটা ঝুঁকিয়ে একটু চেঁচিয়েই বলে, “দাদাজান! দাদাজান! তোমার ছাত্র এসেছে তো! দাদাজান, দেখো দেখো!”

বৃদ্ধের শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে, তবে দাঁড়িগোঁফের ফাকেও তাঁর হাসি আর উত্তেজনাটা টের পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “খান? খান এসেছে? আমি বলেছিলাম না তোকে? খান এমন নয়? কই? কোথায়?”

“এই যে, আসছে!” মতির দিকে সরে এসে ফিসফিসিয়ে বলে নাতনি, “দাদাজান চোখে একদমই দেখেন না! কানেও কম শোনেন! একটু জোরে কথা বলতে হবে! আয়-হায়! আপনি বসবেন কোথায়! আমি চেয়ার আনছি দাঁড়ান!”

বিব্রত হয়ে যায় মতি, বাঁধা দিয়ে বলে, “না না! লাগবে না! আমি টুলেই বসছি!” ওর যে টুলে বসতে সমস্যা নেই সেটা প্রমান করতেই সে তড়িঘড়ি করে হেঁটে গিয়ে টুলের উপর বসে পড়ে।

“আচ্ছা আপনি বসুন তাহলে! আমি আসছি!”

মতি বসতেই ওর দিকে ঝুঁকে আসেন বৃদ্ধ, ভরাট গলায় বলেন, “খান! তুমি এসেছো আমি খুব খুশি হয়েছি!”

বিনয়ে মাথা নিচু করে মতি, “স্যার, এটা তো আমার কর্তব্য ছিল!”

মাথা সটান উঁচু করে গর্বের হাসি হাসেন বৃদ্ধ, “সবাই আর এমন ভাবে না খান! তখন নিজের মনেই সন্দেহ জাগে, আসলেই কি সঠিক শিক্ষা দিতে পেরেছি আমার স্কুলের ছাত্রদেরকে? আবার ভাবি শিক্ষা হয়তো ঠিকই ছিল, কিন্তু পৃথিবী তো বদলে গেছে! এ পৃথিবীতে তুমি সৎ পথে, গৌরবের পথে কিভাবে হাঁটবে বলো? আইন বল, ক্ষ্যাতি বল, সম্পদ বল, ক্ষমতা বল, সবই তো জোরের করায়ত্ব! ঠিক বলিনি?”

“জ্বী স্যার!”

“পৌলমীর বাবার কথাই ধর! আমার মতই স্কুলে পড়াতো। একদিন বাস থেকে নেমেছে, নেমে হেঁটে বাসায় আসছে, মোড়ের গলিতে কিছু গুন্ডা মানিব্যাগটার জন্য ছুরি মেরে দিল! কে এমনটা হবে ভেবেছিল বলো? আর সেই গুন্ডাদের কি হলো?” হাত উঠিয়ে বুড়ো আঙ্গুল নাচান তিনি, “কচু-ঘন্টা! কিচ্ছু না! কেউ ধরা পড়েনি!”

কি বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকে মতি।

“আমার পেনশনের ক’টা মাত্র টাকা পাই! সে টাকায় সংসার চলে বলো? বৌমাকে চাকরীতে ঢুকতে হলো। বাচ্চা মেয়েটা একা একা এই বুড়োর সাথে সময় কাটায়!”

হাত বাড়িয়ে মতির হাত খোঁজে অন্ধপ্রায় বৃদ্ধ শিক্ষক, উনার হাতটা ধরে ফেলে মতি।

“ছেলেটা মারা যাবার পরে ভাবলাম, আমার কি একটা ছেলে? হাজার হাজার ছাত্র পড়িয়েছি! ওরা কি কেউ না? ওদের খুঁজে বের করতে লাগলাম। তখনো চোখে ভালই দেখি। ঠিকানা খুঁজে এর বাসায়, ওর অফিসে গিয়েছি! গিয়ে বুঝেছি কোমল মনের ছেলেগুলোকে কিভাবে বদলে দিয়েছে এই সমাজ! কেউ বাসায় ঢুকতে দেয়নি, সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকে চলে এসেছি। কেউ বলেছে স্যার মিটিংয়ে আছেন, দেখা হবে না। ওরা ভেবেছে আমি সাহায্য চাইতে গেছি! বল খান, আমি এতদিন পড়িয়েছি তোমাদেকে, এই মোবারক চৌধুরী কি সাহায্য চাইবার লোক?”

“জ্বী না স্যার!”

“যাদের সাথে দেখা হয়েছে তারাও যেন পালাতে পারলে বাঁচে! অথচ রাস্তায় অনেক ছাত্রের সাথে দেখা হয়ে যেত। ভাল ছাত্র ছিল না। আমার তাদের নামও মনে নেই। জীবনেও সাফল্য পায়নি, ওরা কিন্তু ঠিকই এসে সালাম করেছে! দু’একটা ভাল মন্দ কথা জিজ্ঞেস করেছে। একজন শিক্ষক হিসেবে এটা কি আমার অনেক বড় চাওয়া, বল খান?”

এক হাতে ট্রে ভর্তি খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকে পৌলমী, একটা বইয়ের স্তুপের উপর ট্রেটা রেখে বলে, “দাদাজান, উনাকে একটু ছাড়! উনার জন্য নাশতা এনেছি!”

“হ্যাঁ হ্যাঁ! অবশ্যই, অবশ্যই!” বিড়বিড় করতে করতে হাত ছেড়ে দিলেন বৃদ্ধ।

“এসবের কি দরকার ছিল?” কাঁচুমাঁচু মুখে বলে মতি।

“দরকার ছিল না মানে! দাদা আস্ত রাখবেন আমাদেরকে না খাইয়ে যেতে দিলে!” চোখ মটকে বলে পৌলমী, “আপনি তো বিকালের ফ্লাইটেই চলে যাবেন। তা নাহলে দাদা আপনাকে রাতে না খাইয়ে যেতে দিত না!”

ট্রে থেকে একটা বাটিতে রাখা পায়েস তুলে নেয় মতি। পায়েস ছাড়াও পিঠা, বড়া, চপ আরো হাবিজাবিতে ট্রেটা ভরা। বোঝাই যাচ্ছে পৌলমীর মা স্বসুরের অতিথির আতিথ্যের জন্য আয়োজনটা করে তবেই কাজে গিয়েছেন।

“তুমি কোন ক্লাসে পড় পৌলমী?” কথা চালাবার চেষ্টা করে মতি!

প্রশ্নটা শুনেই গম্ভির হয়ে যায় পৌলমী, “স্কুলে না! কলেজে উঠেছি!”

মনে মনে হাসলো মতি, “আচ্ছা! কোন বিভাগে?”

“সায়েন্স!”

“ওরে বাবা, এতো সেরকম কঠিন বিষয়! আমার একদমই মাথায় ঢোকে না সায়েন্স!”

খিলখিল করে হেসে ওঠে পৌলমী, “আমি জানিনা ভেবেছেন বুঝি? দাদার চোখ খারাপ হবার পর থেকে আমিই উনাকে সংবাদপত্র পড়ে শোনাই। গত পরশু আপনাকে নিয়ে পত্রিকায় একটা লেখা এসেছে না? আপনি সবচেয়ে কম বয়সে ট্যুরিন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন! আর আপনি বলছেন আপনার মাথায় সায়েন্স ঢোকে না!”

“তুমি তাহলে পড়েছো সে লেখা?”

“হুমম! ওখানে আপনার স্কুলের কথা লেখা আছে, আপনার পুরো নাম যে ‘রুবেল মোহাম্মদ আনোয়ার আমিরুল খান’ সে কথাও লেখা আছে। আপনার সে এক মাইল নাম শুনেই তো দাদা আপনাকে চিনে ফেললেন! আপনি এখানে একটা কনফারেন্সে আসছেন শুনে দাদা জোর করে আমাকে দিয়ে সেদিন ডিরেক্টরি খুঁজে ফোনটা করালেন। দাদাজানের বয়স হয়েছে তো...” গলাটা করুন শোনায় পৌলমীর “...তাই আপনাকে ডেকেছেন, তা নাহলে নিজেই যেতেন!”

“আরে না! স্যারকে আছেন জানলে আমি নিজেই তো আসতাম! খুব ভাল করেছো আমাকে ফোন করে। এদিকে আসলে আমি প্রতিবারই দেখা করে যাব উনার সাথে!”

মুখটা ঝলমল করে ওঠে পৌলমীর, “আপনি বসেন, আমি চা নিয়ে আসছি! আমার চা খুব ভাল হয়, মা বলেন!”

চা শেষে পুরোনো শিক্ষকের সাথে আরো আধা ঘন্টা কাটায় মতি। বয়স হলে কি হবে, উনার তেজ যায়নি। ভদ্রলোকের লেখাপড়ার ভাল অভ্যেস ছিল তাও বইয়ের সংগ্রহ দেখলে বোঝা যায়। সে সংগ্রহের একটা অংশ নাকি বিক্রি করার চেষ্টা করছেন পৌলমীর কলেজের পাঠ্য কিনতে। সেটা শুনে মতি খুব ইচ্ছে হলো বলতে, “বইগুলো আমিই কিনে নিচ্ছি, কত লাগবে বলুন!” কিন্তু এই বৃদ্ধকে সে যতটুকু চিনেছে, জানে একথা শুনলে তিনি প্রচন্ড অপমানিত হবেন।

ওঠার সময় সে হঠাৎই ঝুঁকে পায়ে ছুঁয়ে সালাম করে ফেলে মতি, বলে, “দোয়া করবেন স্যার!” বৃদ্ধ চোখের পানি মুছে হাত রাখেন মতির মাথায়।

প্রচন্ড আপনজনের মত বাসার দরজা পর্যন্ত এগিয়ে আসে পৌলমী, ধরা গলায় বলে, “আবার আসবেন!”

***

পেছনে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেলে পকেট থেকে ওর কালো নোটবুকটা বের করে মতি। পাতা উল্টিয়ে একটা খবরের কাগজের কাটিং তুলে নেয়। সেখানে ছোট্ট করে এ বাসার ঠিকানা লেখা। আর লেখা “দর্শনের পুরানো বই বিক্রি হবে”। কাটিংটা ফেলতে গিয়েও আবার নোটবুকের মাঝেই পুরে রাখে মতি।

যে নোটবুকে বেশ বড় করেই তার নাম লেখা... “খান মোঃ মোতাহীর!”

© অমিত আহমেদ

বিঃদ্রঃ সহব্লগার ইশতিয়াক রউফয়ের জরুরি ভিত্তিতে আইডিয়া দরকার জেনে হুট করে মাথায় গল্পটা এসে গেল। তাই গল্পটা তাঁকেই উৎসর্গ করা হলো। এটিকে গল্প না বলে গল্পের খসড়া বলা উচিত, একটানে লিখেছি, পরিমার্জনার প্রয়োজন আছে। তবে তা আর হবে না মনে হয়। এক বার তীর ছুঁড়ে ফেললে আমার আর সেটার পেছনে ছোটা হয় না।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০০৭
পরিমার্জিত দ্বিতীয় প্রকাশ: গল্পগ্রন্থ, "বৃষ্টিদিন রৌদ্রসময়", শস্যপর্ব ও শুদ্ধস্বর প্রকাশন, বইমেলা ২০০৯

0 টি মন্তব্য:

Post a Comment