ছোট বেলায় অনেক চরিত্রই আমার মাথায় ঘাপটি মেরে থাকতো। নন্টে ফন্টে, হাঁদা ভোঁদা, বাঁটুল দি গ্রেট, টিনটিন, প্রোফেসর শঙ্কু, ফেলুদা, ব্যোমকেশ, টেনিদা, তিন গোয়েন্দা, ডন কিহোতে, হোজা নাসিরুদ্দিন, বিরবল, খলিফা হারুন-উর-রশিদ, রাজা বিক্রমাদিত্য, আর্চি, ম্যাকগাইভার, ঈশপ, লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল, মিশা, মহামতি ফিহা, শার্লক হোমস... তালিকা করতে গেলে হয়তো একদিনে শেষ হবে না। তবে সেই তালিকাতে গোপাল ভাঁড়-এর নাম কখনোই ছিলো না।গোপাল ভাঁড়-এর গল্প আমি প্রথম পড়ি ক্লাস টু কিংবা থ্রিতে থাকার সময়। নিউজপ্রিন্টে ছাপা একটি বই। বইয়ের মলাটে - মোটাসোটা ভুঁড়িওয়ালা উদোম গায়ে ধুতি পড়া টিকি ঝোলানো হাস্যরত এক ভদ্রলোকের ছবি। খুব একটা দৃষ্টিনন্দন কিছু নয়। বইয়ে অনেকগুলো হাস্যরসাত্মক অণুগল্প ছিলো। এর একটি বড় অংশ বিষ্ঠা বিষয়ক। পড়তে গেলেই গা ঘিনঘিনিয়ে ওঠে।
আর ভাষাও ছিলো খুব খটমট ধরণের। যেমন "গোপাল নিজের বাসায় আসলো" না বলে বলা হতো "গোপাল তৎ বাটিতে উপনিত হইলেন"। দুই ক্লাসের একটি ছেলের এমনতর ভাষা ভালো না লাগারই কথা। পরে গোপাল ভাঁড়ের অন্য বইও পড়েছি। সবগুলোই কমবেশি একই রকম। সস্তা বাঁধাই, বাজে প্রচ্ছদ, অপটু হাতে লেখা, গল্প বাছাইয়ের কোনো মা-বাপ নেই। তাই গোপাল ভাঁড় কখনোই সেভাবে আমার আগ্রহ জাগাতে পারেনি।
অথচ সমধারার বিরবলকে নিয়ে বেশ কয়েকটি দুর্দান্ত কমিকস পড়েছিলাম। কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি চমৎকার বইও হাতে এসেছিলো। হোজা নাসিরুদ্দিনকে নিয়ে সত্যজিত রায়ের বইটি তো রীতিমতো সংগ্রহে রাখার মতো। সেবা প্রকাশনী থেকেও হোজা নাসিরুদ্দিনকে নিয়ে দু'টি বই প্রকাশিত হয়েছে। যার মধ্যে একটি আবার উপন্যাস। দুটোই খুব চমৎকার। শিশুতোষ অণুগল্পের কাতারে ঈশপ আর পঞ্চতন্ত্রের গল্প নিয়েও অনেক সুন্দর সুন্দর বই হয়েছে, হচ্ছে। তাই গোপাল ভাঁড়কে বলা যায় অবহেলিত, লেখক-প্রকাশক ও গবেষকদের আগ্রহ জাগাতে অপারগ।
গবেষণা কিংবা সাহিত্যে গোপালের অবহেলিত হবার বিষয়টি অনেকবারই আমার মাথায় এসেছে। এতদিন ধরে গোপালের গল্প মুখে মুখে চলে আসছে। এতদিন পরেও গোপাল ভাঁড়ের নাম আমরা জানি। এখনো গোপালের গল্প নতুন নতুন বই বের হচ্ছে। কিন্তু এসব গল্প কিংবা বইয়ের আবেদন কেনো একটি সীমার মধ্যে আটকে থাকে? শহুরে পাঠকেরা গোপালের গল্পে কেনো স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না? কিংবা নামী লেখক, প্রকাশক ও গবেষকেরা? শিশুদের আগ্রহ জাগাতে কেনো গোপাল তেমন সফল নয়? এই নিয়ে আমার একটি হাইপোথেসিস আছে।
হাইপোথেসিস: গোপালের বেশির ভাগ গল্পের আবেদন চিরন্তন নয়।
(ক)
সময়ের সাথে সাথে কিছু জিনিসের আবেদন বদলায়, বোধ বদলায়, ধারণা বদলায়। সেই সাথে সাথে বদলায় হাস্যরসের উপাদান। একটি উদাহরণ হবে দাসপ্রথার যুগে দাসদেরকে নিয়ে চালু কৌতুকগুলো। তৎকালীন দাসপ্রভুদের কাছে সেসব কৌতুক হাস্যকর মনে হলেও এখন সেগুলো নেহায়তই পৈশাচিক ঠাট্টা বলে মনে হবে। একই জিনিস দেখা যায় গোপালের কিছু গল্পে। ভৃত্য, কিংবা নিচুস্তরের কাউকে নিয়ে করা ওর ঠাট্টাগুলো এখন কারও ভালো লাগার কথা নয়। একটি উদাহরণ দেই - রামবাবুর সাথে গল্প করতে করতে গোপালের খুব তেষ্টা পেয়েছে। সে ওর ভৃত্যকে ডেকে ঠাস ঠাস তিনটে চড় লাগিয়ে দিয়ে বলছে, "যা এক ঘটি জল নিয়ে আয়! ঘটি যেনো না ভাঙে।" ব্যাপার দেখে রামবাবু বলছে, "গোপাল, ঘটি ভাঙার আগেই ওকে চড় মেরে বসলে যে?" গোপাল জবাব দিচ্ছে, "আরে ভেঙে ফেলার পর মেরে কি আর লাভ আছে? এর চেয়ে আগেই মেরে দিলাম। সাবধান থাকবে।"
আমার কাছে এই গল্পটি ভালো লাগেনি। লাগার মতো কিছু না-ও। একজন মানুষের গায়ে হাত তোলার মধ্যে হাস্যরসের উপাদান অন্তত্য আমি খুঁজে পাই না। তবে গোপাল যে সময়ের মানুষ সে সময়ের প্রেক্ষিতে ঘটনাটি হাসির হতেই পারে।
(খ)
মল-মূত্র নিয়ে করা গোপালের গল্পগুলো প্রথমত, আর তেমন হাসির নেই বরং একটু গা ঘিনঘিনিয়ে ওঠার ব্যাপার আছে। দ্বিতীয়ত, সব আড্ডায় এগুলো বলা যায় না। একটি উদাহরণ - গোপাল বেয়াই-বেয়াইনের সাথে বেড়াতে গিয়ে এক ঝোপের আড়ালে প্রস্রাব করতে বসেছে। বেয়াই বলছে, "গোপাল উত্তর দিকে মুখ করে প্রস্রাব করছো, ওদিকে মুখ করে প্রস্রাব করা শাস্ত্রে মানা আছে।" আবার বেয়াইন বলছে, "দক্ষিণ দিকে মুখ করে প্রস্রাব করাও শাস্ত্রে মানা।" শুনে গোপাল বলছে, "আমরা ছোট মানুষ, বেয়াই যেই মুখ বললেন সেই মুখেও প্রস্রাব করি, আবার বেয়াইন যেই মুখ বললেন সেই মুখেও করি।"
মজা যে লাগে না তা নয়। মজা লাগে। তবে সেই সাথে একটু অস্বস্থিও লাগে। বেয়াই-বেয়াইনের সামনে প্রস্রাব করতে বসা, বসে টুক-টাক কথা বলা, এগুলো একটু কেমন যেনো। সে সময়ে মল-মূত্রের জীবানু কিংবা নোংরাটে ব্যাপারগুলো নিয়ে সেভাবে কেউ জ্ঞাত ছিলো না। বিষ্ঠা ছিলো কেবলই দূর্গন্ধ ছড়ানো কিছু একটি। কিন্তু সময়ের সাথে এই নিয়ে আমাদের ধারণা বদলেছে। সেই সাথে এই নিয়ে অস্বস্থিটাও বেড়েছে।
(গ)
আরেকটি ব্যাপার হলো গোপালের চক্রান্তের বাড়াবাড়ি। একটি গল্পে আছে যেখানে বাসায় মেয়ে জামাই এসে আর যেতে চাচ্ছে না। গোপাল এতে খুব বিরক্ত। পরে সে একটি চক্রান্ত করে যাতে সবাই মনে করে গোপালের স্ত্রীর সাথে মেয়ে জামাইয়ের কিছু একটি নটখট আছে। লজ্জায় মেয়ে জামাই বিদায় নেয়।
এই গল্প পড়তে গিয়েও মজা লাগে। কিন্তু সেই সাথে নিজের স্ত্রীকে নিয়ে করা বাড়াবাড়িতে রুচিটাও একটু ধাক্কা খায়। এ ধরণের বেশ কয়েকটি গল্প আছে যেখানে নির্দোষ কাউকে হেয় কিংবা লজ্জায় ফেলে গোপালের জয় হচ্ছে।
এই দোষগুলো থেকে বিরবল কিংবা হোজা নাসিরুদ্দিনের গল্পগুলি মোটামুটি মুক্ত। হয়তো এই কারণেই এই দু'জনকে নিয়ে দুই বাঙলার লেখক-প্রকাশকেরা আগ্রহ পান বেশি। এসব কিছু মনে রেখেও আমার মনে হয় গোপালকে নিয়ে গবেষণার দরকার আছে। ইউরোপে তো রাজার ভাঁড়দেরকে নিয়ে গবেষণার শেষ নেই। কাছাকাছির মধ্যে বিরবল, হোজা নাসিরুদ্দিনকে নিয়েও যথেষ্ঠ গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে। হোজা নাসিরুদ্দিনকে নিয়ে তো এমনকি মিউজিয়াম পর্যন্ত আছে। সেখানে গোপাল ভাঁড় কেনো অন্তরালে থেকে যাবে?
অলটারনেচিভ হাইপোথেসিস: কাছের চরিত্র বলে গোপালকে দূরে ঠেলা হয়েছে।
মনোবিজ্ঞান বলে মানুষ কাছের সহজলভ্য উপাদান ঠেলে দূরের কষ্টারাধ্য উপাদানে আগ্রহ দেখায় বেশি। যে জিনিস পেতে কষ্ট করতে হয়, পাবার সম্ভাবনা কম, নিষিদ্ধ কিংবা দুর্লভ সেসব জিনিসে মানুষের সহজাত আকর্ষণ আছে। এমন হতে পারে এই কারণেই বাঙলার লেখক প্রকাশকেরা গোপালের গল্পের চেয়ে সমধারার বিরবল কিংবা হোজা নাসিরুদ্দিনের গল্পে আগ্রহী হয়েছেন বেশি।
কাল্পনিক কিংবা ঐতিহাসিক চরিত্রকেও বাজারজাত করতে হয়। মানুষের কাছে জনপ্রিয় করতে হয়। গোপালকে নিয়ে লেখক প্রকাশকদের অনাগ্রহের কারণে গোপালকে নিয়ে ভালো বই আসেনি। গোপালকে ঠিক মতো বাজারজাত করা হয়নি। গবেষকরাও জনপ্রিয় বিষয়ে গবেষণা করতে পছন্দ করেন। তাই গোপালকে নিয়ে গবেষণাও সেভাবে করা হয়নি।
তবে, গবেষণা হয়নি বলে লেখক-প্রকাশকের অনাগ্রহ সেই থেকে পাঠকের অনীহা, নাকি লেখক-প্রকাশকেরা সর্বগ্রাহী করতে পারেননি বলে পাঠকদের অবহেলা আর গবেষণায় উপেক্ষা - বিষদ গবেষণা ছাড়া এই নিয়ে নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
গোপালকে নিয়ে বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া আর অন্যান্য সাইট মিলিয়ে যা জানা যায় তা হলো – গোপাল ভাঁড়ের গল্প মুখে মুখে, লোককথায় বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে অনেকদিন থেকে চলে আসলেও গোপালের নাম জনপ্রিয় হয় প্রধানত ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে। কলকাতার বটতলায় গোপালের প্রথম বই প্রকাশিত হবার পর থেকে। সে ছিলো নদীয়ার স্বনামধ্য রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় (১৭১০-১৭৮৩) এর সভার ভাঁড়। গোপালকে তার বুদ্ধি, প্রজ্ঞা আর হাস্যরসের জন্য সবাই এক নামে চিনতো। মজার গল্পে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলে দেবার গুন ছিলো গোপালের সহজাত। নানান সময় নানান সমস্যার সমাধান গল্পে গল্পে করে দিতো বলে গোপাল ছিলো রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বিশেষ প্রিয়পাত্র।
তবে এই ইতিহাস নিয়েও সন্দেহ আছে। অনেক ইতিহাসবিদ বলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় গোপাল নামক কারও উপস্থিতির প্রমান কোনো দলিলে পাওয়া যায়নি। সেক্ষেত্রে দু'টি ব্যাপার হতে পারে -
এক
রাজার দেহরক্ষী, শঙ্কর তরঙ্গ এর কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। সে নিজেও তার কৌতুক আর বুদ্ধির জন্য জনপ্রিয় ছিলো। এমন হতে পারে তার গল্পগুলোই পরে গোপাল ভাঁড়ের নামে চালানো হয়েছে।
দুই
গোপাল ভাঁড় নামে কেউ কখনো ছিলোই না। অবহেলিত প্রজারা রাজার সভায় নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে গোপালকে কল্পনা করে নিয়েছে। ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনার উল্লেখ আছে। এমন আরেকটি জনপ্রিয় উদাহরণ হবে বিলেতের শেরউড বনের দস্যু রবিন হুড। এই হচ্ছে গোপালকে নিয়ে পাওয়া আমার সর্বোচ্চ তথ্য।
তিন
গোপালের চেহারা নিয়েও আমার একটি প্রশ্ন আছে। গোপালকে আমরা কিভাবে দেখি তা লেখার প্রথমেই বলেছি। মোটাসোটা, অর্ধটাক, টিকি। লেখায় ব্যবহৃত ছবিটিতেও এমন দেখা যায়। এই চেহারাটি কে কিভাবে প্রথম চালু করলেন? জানতে ইচ্ছে করে!
আমি ঠিক করেছি গোপালের ভালো গল্পগুলি সব ব্লগে তুলে রাখবো। এই আমার "সেরা গোপাল ভাঁড় প্রোজেক্ট"। কাজটি একটু সতর্কতার সাথেই করছি। কাছাকাছি বলে হোজা কিংবা বিরবলের বেশ কিছু গল্প গোপাল ভাঁড়ের গল্প বলে ভুল করা হয়। একটি উদাহরণ হবে "মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত।" আমি খোঁজ নিয়ে যা জেনেছি এই গল্পটি হোজা নাসিরুদ্দিনের, গোপালের নয়। গোপালের গল্পের ভালো কোনো নিবন্ধন নেই বলে অন্য গল্পের নিবন্ধন থেমে গল্প মেলাতে হচ্ছে। আমার ব্লগটি ঘুরে দেখতে পারেন। সেখানে যদি গোপালের কোনো গল্প বাদ পড়ে যায় তবে এক দুই লাইনে আমাকে ইমেইল করে জানাতে পারেন। আর যদি কেউ গোপালকে নিয়ে কোনো গবেষণাপত্রের খোঁজ দিতে পারেন তবে খুব কৃতজ্ঞ থাকবো।
গোপালের একটি গল্প দিয়েই লেখাটি শেষ করছি।
একদিন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সাথে গোপালের কোনো বিষয় নিয়ে তুমুল বিতন্ডা লেগে গিয়েছে। তর্কা-তর্কির এক পর্যায়ে রাজা রেগে কাঁই হয়ে গোপালকে বলেন, "গোপাল তোমার বাড় ইদানিং বড্ড বেড়েছে। মুখে মুখে যে তর্ক করছো, আমার সাথে তোমার দূরত্ব কত জানো?" গোপাল চটপট উঠে দাঁড়িয়ে সিংহাসণ থেকে নিজের আসনের দূরত্ব মেপে নিয়ে বলে, "বেশি না রাজা মশাই। মোটে সাড়ে তিন হাত!"
© অমিত আহমেদ
প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ৩১ জুলাই ২০০৮
ব্যবহৃত ছবি © BangaliNet
3 টি মন্তব্য: