Sunday, January 25, 2009

সহসা ভালোবাসা ৪: আমার কাটা হাত আর সেই মেয়েটা

সারা জীবনে অনেক মানুষের ভালোবাসা আমি পেয়েছি। কাছের মানুষের। এমন কী মাঝে মাঝে একদম অচেনা-অজানা কারো কাছ থেকে। এমন কারো কাছে যাঁদেরকে আমি আগে কখনো দেখিনি। আবার যে দেখবো সেই সম্ভাবনাও নেই। কিন্তু আমার জীবনে তাঁদের মমতার বড় একটি ছাপ থেকে গেছে। আমার এই সিরিজ তাঁদের প্রতি আমার স্বগত শ্রদ্ধার প্রকাশ।

চার

এই ঘটনা কবে ঘটেছিলো মনে নেই। সম্ভবত কলেজে পড়ার সময়, নিউ মার্কেটে।

সেই সময়ে একটা ব্যাপার ছিলো। সব কিছুই তুচ্ছ মনে হতো। মনে হতো আমি অজেয়। কেউ, কিচ্ছু আমাকে আমার উচ্চতা থেকে নামাতে পারবে না। প্রচন্ড গর্ব আর তারুন্যে সারাক্ষণ চুর হয়ে থাকতাম। চারপাশে খুব তাচ্ছিল্য নিয়ে তাকাতাম।

নিউমার্কেটে তখন যেতাম প্রধানত আড্ডা মারতে আর মেয়ে দেখতে। তখন বইয়ের আর চিত্রশিল্পীদের দোকানের সামনের খোলা চত্বরে বসে আড্ডা দেয়া যেতো। এখন মনে হয় না আর যায়। কর্তৃপক্ষ একটা “চত্বরে বসা নিষেধ” টাইপ টিনের নোটিশবোর্ড টাঙিয়ে রাখে। খোলামেলা বলে সেই জায়গাটা আমাদের বিশেষ পছন্দের ছিলো। আড্ডা দিতে দিতে চারপাশের সব দেখা যেতো। মাঝে মাঝে বন্ধুরা একে অন্যকে টোকা দিয়ে হেঁটে যাওয়া কোনো সুন্দরী মেয়ে দেখাতাম। চিন্তাহীন নির্বিবাদী জীবন।

জায়গাটা পছন্দ হবার আরেকটা কারণ হলো ঠিক অন্যপাশেই গলিতেই চায়ের স্টল। সেখান থেকে সারা চত্বরের দোকানে চা যায়। আমরাও আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে নিজে গিয়ে, কিংবা চা নিয়ে ঘুরঘুর করা পিচ্চির মাধ্যমে চায়ের ফরমায়েশ দিই। তেমনি একদিন সবাইকে বসিয়ে রেখে আমি গেছি চায়ের কথা বলতে।

মাঝে মাঝে হয় না আপনার কোথাও কেটে গেছে, আপনি খেয়ালই করেননি? হয়তো দরদর করে রক্ত ঝরছে, আপনি খেয়ালই করেন নি। চায়ের অর্ডার দিয়ে ফিরে আসবো, এমন সময় একটা মেয়ে কেমন শিউরে উঠে বললো, “ভাইয়া আপনার হাত কেটে গেছে!”
আমি খুব তাচ্ছিল্য নিয়ে হাতের দিকে তাকাই, ডান কিংবা বাম হাত, মনে নেই, আসলেই কেটে গেছে। কিভাবে কোথায় কাটলো কে জানে! টপ-টপ করে রক্ত ঝরছে। আমি খুব তাচ্ছিল্য নিয়ে বললাম, “ও এটা? ব্যাপার না।”
মেয়েটা খুব শংকা নিয়ে বলে, “অনেকখানি কেটে গেছে তো! অনেক রক্ত পড়ছে!”

আমি এবার মেয়েটার দিকে ভালো মতো তাকাই। ছিটের কমদামী সালোয়াক কামিজ পরা, শুকনা-শাকনা, শ্যামবর্ণ, চুলে তেল দেয়া, গ্রামের বাড়িতে গেলে এমন চেহারা আর বেশ অনেক চোখে পড়ে। আমার মনে তেমন উৎসাহ জাগে না। মেয়েটা সুন্দর হলে হয়তো আলাপ জমাবার চেষ্টা করতাম, কিন্তু এখন গা লাগাই না।

বলি, “ব্যাপার না। একটু পরেই বন্ধ হয়ে যাবে।”
আমি চলে যেতে চাইলে মেয়েটা কেমন আপনজনের মতো আদেশ করে, “না! একটু দাঁড়ান…”
আমি কেমন থমকে যাই। এমন আদেশের বিপক্ষে না বলার ক্ষমতা তো আমার নেই।
মেয়েটা চায়ের স্টল থেকে একগ্লাস পানি নিয়ে আমার হাত ধরে। খুব যত্ন নিয়ে আমার কাটা ধুয়ে দেয়। এরপর হাত ব্যাগ থেকে একটা রুমাল বের করে বেঁধে দিয়ে বলে, “এবার ঠিক আছে।”

আমি খুব বিব্রত হয়ে যাই। এমন কাটাকুটি সবসময়ই হয়। ভয় পাবার মতো কিছু না। কিন্তু মেয়েটা আমার অনুমতির তোয়াক্কা না করে যেভাবে আমার ক্ষত বেঁধে দিলো… আমি কি বলবো বুঝে পাই না।
মেয়েটা বলে, “বাসায় গিয়েই ডেটল লাগাবেন। ঠিক আছে?”
আমি মিনমিনে গলায় বলি, “আচ্ছা।”

আমি হাতে রুমাল বেঁধে আড্ডায় ফিরে যাই। রুমাল দেখে বন্ধুরা ছাড়ে না। নানান প্রশ্ন করে। ঘটনা শুনে তাদের উল্লাস শুরু হয়ে যায়, “ভাই… তুই দেখাইলি…”, “কস কী মামা?”, “দেখতে কেমুন?”, “ওই, ফোন নাম্বার নিছস?” আমি চুপ করে থাকি। আমার হঠাৎ মনে হয় আমি মেয়েটাকে ধন্যবাদ জানাইনি। আবার উঠে গিয়ে সেই মেয়ের খোঁজ করতে আমার লজ্জা লাগে। আমি চুপ করে বসে থাকি। মেয়েটাকে নিয়ে বন্ধুদের করা ঠাট্টায় শামিল হতে পারি না।

সেদিন, এমনকি এর পরেও অনেকদিন, আমার মনে ধন্যবাদ না জানানোর দোষ বুকে কাঁটার মতো বিঁধে থাকে!

বি:দ্র: এই রকম ঘটনা আমার সাথে অনেকবারই হয়েছে। কখনো কোনো পথচারি, কখনো ক্লাসমেট, কখনো বাসের সহযাত্রী, কখনো দোকানী… এখন মনে পড়ে, তাদের বেশিরভাগকেই আমার ধন্যবাদ তো জানানো হয়ইনি, বরং সামান্য কাটা নিয়ে তাদের গায়ে পড়ে সাহায্য করতে চাওয়া নিয়ে বিরক্ত হয়েছি।

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: আমারব্লগ, ২৫ জানুয়ারি ২০০৯

0 টি মন্তব্য:

Post a Comment