Tuesday, July 28, 2009

ঢাকা থেকে ১০: ডে জা ভু!

এক

আমার বন্ধুর বিয়েতে ওর বোন আর ভাগ্নীরা এসেছিলো আমেরিকা থেকে। আমার আসার অন্যতম প্রধান কারণও ছিলো দোস্তের বিয়ে। তবে দুর্ভাগ্য; নানান ঝামেলায় আসার তারিখ পিছিয়ে একটুর জন্য বিয়েটা মিস করেছি। গতকাল ওরা চলে গেলো। বাসা থেকেই সবার কান্না-কাটি। আমি এসব একদম সহ্য করতে পারি না; তাই একটু দূরেই ছিলাম। বিমানবন্দরে ওদের সাথে যাচ্ছিলাম আমি আর আমার বন্ধু। আমার বোন নেই বলে বন্ধুর বোনদেরকেই নিজের বোনের মতো মনে হয়। গতকাল মনটা তাই খারাপ হয়ে ছিলো। জানি, ঠিক এই ঘটনাই ঘটবে আমার পরিবারে আর কিছু দিন পর যখন আমি চলে যাবো!

দুই

গতকাল সারারাত পাগলা বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে রাত জেগে কাজ করেছি। কানাডার দিন মানে এখানে রাত। একাডেমিয়ার কিছু বিষয়ে আমার তৎক্ষণাত সিদ্ধান্তের দরকার ছিলো। তাই রাত জাগা ছাড়া যোগাযোগের আর কোনো উপায় ছিলো না। কী কাজ সেটা বলে আপনাদের বিরক্ত করবো না; শুধু জানিয়ে রাখি গতকাল আমার সবচেয়ে সফল দিনগুলোর (আসলে রাত্তির) একটা ছিলো। একের পর এক সুখবর পেয়েছি! দিলটা এই কারণে খোশ!

দুপুরে ঘুম থেকে উঠে দেখি তখনো বৃষ্টি চলছে। সচল অতিথি শাহেনশাহ সিমনকে নিয়ে একটা কাজে আর কাজ শেষে একজনকে দেখতে হাসপাতালে যাবার কথা ছিলো। কিন্তু রাস্তার অবস্থা শুনে আর যাওয়া হয়নি। মা গিয়েছিলেন বাজারে আর বাবা অফিসে; দু'জনের কাছেই শুনলাম রাস্তায় পানি জমে একাকার হয়ে আছে। সরকার থেকে কিছু রাস্তায় পাম্প বসানো হয়েছে সেটাও শুনলাম, কিন্তু যা বুঝলাম তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বন্ধুদের কল দিয়ে জানলাম অধিকাংশই অফিসে গিয়ে ফিরে এসেছে, বাকিরা যাবার কষ্টটুকুও আর করেনি; জলবন্ধতার কারণে বেশির ভাগ অফিসেই আজ কাজ হয়নি। বনানীতে এক এপার্টমেন্টে শুনলাম একাধিক পাম্প বসিয়ে গ্যারাজ থেকে পানি সরানো হচ্ছে। ওদের গ্যারাজ ছিলো ভূমিতলে, সেই গ্যারাজ সব গাড়ি সহ পানিতে ঢুবে গেছে! আমার বিচিত্র কারণে হাসি পায়। আমাদের দেশটাতে বৃষ্টি হলেও সমস্যা, না হলেও! সেচের ব্যবস্থা নেই, নেই নিষ্কাশনেরও!

রাত আটটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বের হয়ে যাই। গন্তব্য "ফাহিম মিউজিক সেন্টার"। আমার বাসা থেকে কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ। কারণ ওয়ারফেজের নতুন অ্যালবাম "পথচলা"। একটা সময় ছিলো যখন ওয়ারফেজের বেড়াছেঁড়া ফ্যান ছিলাম। দেয়াল টপকে, মারামারি করে, রোদে-বৃষ্টিতে ভিজে, বাবা-মা'র হাত-পা ধরে, কতো কনসার্ট যে দেখেছি! তখন ক্যাসেট টেপ কিনতাম এলিফ্যান্ট রোডের "গীতাঞ্জলি" থেকে আর মিরপুর-১০ এর "চৌধুরি উদ্যোগ" থেকে। ওই দোকানগুলোতে ওয়ারফেজের পোস্টার আর স্টিকারের বায়না দিয়ে রাখতাম। কী যে একটা সময় ছিলো তখন! সেই সময়ের গানগুলো মিজান নতুন করে গেয়েছে শুনে আর অপেক্ষা করতে পারলাম না। অর্ধভেজা হয়ে আটটা দশে দোকানে পৌঁছে দেখি দোকান তখনো খোলাই আছে। সিডি কিনে পাশের রেস্তোরায় গিয়ে বসেছি, চায়ে চুমুক দেবার আগেই বন্ধুদের কল। ওরা আছে স্টার কাবাবে। চা শেষ করে সেখানে যেতে যেতে আরেকটু ভেজা হয়।

স্টার কাবাবে বারোয়ারি আড্ডায় দশটার বেশি বেজে যায়। আস্তে আস্তে সবাই উঠতে থাকে। থেকে যাই কেবল বাল্যবন্ধু আমরা তিনজন। আর আমাদের ঝোঁক ওঠে, এই অন্ধকার নেমে আসা জলাবন্ধ ঢাকায় বৃষ্টি ভেজা রাস্তা ধরেই আমরা আশুলিয়ায় যাবো! বন্ধুর গাড়িতে চেপে বসে আমি আমার ওয়ারফেজের সিডিটা ছেড়ে দেই। মিজানের গলায় শুরু হয় "বসে আছি একা"। আমরা চমকে উঠি। ঠিক একই ঘটনা তো ঘটেছিলো অনেকদিন আগে। তখন আমরা সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকবো/ঢুকেছি। আড্ডা মেরে প্রায়ই এমন বেরিয়ে পড়তাম। তবে সেদিন, আমাদের মনে পড়ে, ঠিক এমনই ঝুম বৃষ্টির পরে একই রকম আড্ডা শেষে গাড়িতে গান বাজিয়ে আমরা ক'জন রওনা দিয়েছিলাম বনানী থেকে। সেই ঘটনার পর কতোদিন চলে গেছে। এর মাঝে আমাদের গাড়ির মডেল বদলেছে। পেশা বদলেছে। প্রেমিকা বউ হয়েছে, না হলে নতুন প্রেমিকা এসেছে। কিন্তু সেই বন্ধুত্বটা বদলায়নি; বদলাবে যে সেই সম্ভাবনাও নেই।

তিন

বাংলাদেশের খেলা দেখে আসলাম। এই ম্যাচেও জিতেছি। সিরিজটা আমাদের পকেটে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সবাইকে আমার অভিনন্দন!

খেলা দেখেও চরম আনন্দ পেয়েছি। শেষের ওভারগুলো বাদ দিলে (ফুলটসে দুই উইকেট!!) আমার আজও গতদিনের মতো মনে হয়েছে যে খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ছিলো ওরা জিততে পারবে। এই আত্মবিশ্বাস একটা দারুন জিনিসটা - এটা থাকলে আর বেশি কিছু লাগে না। আশরাফুলকে এতো গালি দেই তবে এই ছেলেটা দায়িত্ব নিয়ে খেললে যে যে কোনো ম্যাচ জেতাবার ক্ষমতা রাখে তা আজ আবার প্রমান হলো। যেমনটা দরকার ছিলো ঠিক তেমনটাই খেলেছে। একটা সেঞ্চুরি ওর পাওনা ছিলো; সেটা নষ্ট করলো ঝোঁকের মাথায় লোপ্পা ক্যাচটা তুলে দিয়ে।

পাইলট শতগুনে ভালো খেলোয়াড় ছিলো সেটা মেনে নিয়েই বলি; এই সিরিজে মুশফিকুরের কিপিং দেখে ততো খারাপ লাগেনি। হাতে বেশ কিছু শটও আছে। ছেলের বয়স মোটে ২০; আর কিছুদিন গেলে খারাপ হবে না।

আর সাকিব! ওর কথা আর কী বলবো! বাংলাদেশ দলে এমন পরিপক্ক খেলোয়াড় আমি আগে আর দেখিনি। এক কথায় অসাধারণ! ওকেই পাকাপাকি ভাবে ক্যাপ্টেন বানিয়ে দিলে মন্দ হয় না। ক্যারাবিয়ানরা ইতিমধ্যেই ওকে "দ্য আইসম্যান" বলে ডাকা শুরু করেছে।

উৎপল শুভ্র দেখলাম লোকাল ম্যাগাজিনে এই নিয়ে একটা রিপোর্টও লিখে ফেলেছেন। ভদ্রলোকের উদ্দ্যম আছে বলতে হবে। প্রথমআলো থেকে শুরু করে উজডেন, ক্রিকইনফো, ক্যারাবিয়ান সংবাদপত্র সবখানেই তাঁর রিপোর্ট দেখতে পাই।
তাঁকেও আমার অভিনন্দন!

(২৭-২৮-২৯ জুলাই ২০০৯)

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ২৮ জুলাই ২০০৯

বিশেষ দ্রষ্টব্য
ওয়ারফেজের "পথচলা" অ্যালবামটা দুর্দান্ত হয়েছে। মিজানের গলা আর উচ্চারণ আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। মিউজিক স্বাভাবিক ভাবেই এ-প্লাস। আর অ্যালবামে অতর্কিতে বাবনার গান পেয়ে একই সাথে চমকিত ও আনন্দিত হয়েছি। না শুনে থাকলে বাংলাদেশবাসীদের কিনে শোনার অনুরোধ করছি।

দুইখান ছবি

সিডি কিনে যে রেস্তোরায় চা পান করতে ঢুকেছিলাম। ছেলেটা ওখানেই কাজ করে। নিজের ছবি তোলার দারুন আগ্রহ।
The Restaurant

আশুলিয়া। সারিনা ভাসমান রেস্তোরায় ওঠার ব্রিজ। তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে।
Rain Rain Rain

0 টি মন্তব্য:

Post a Comment