Friday, July 31, 2009

ঢাকা থেকে ১১: মানুষ কিংবা জানোয়ার

ছেলেবেলার একটা গল্প বলি। থাকতাম মধ্য পীরেরবাগ, মিরপুর। এলাকাটা তখন আক্ষরিক অর্থেই সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা। ফলজ আর ওষধী গাছের সারি, তার ফাঁকে ফাঁকে শাপলা-শালুক-কচুরিপানা ভর্তি পুকুর। কাঁচা রাস্তার দু'পাশ জুড়ে ওয়ালী মিয়ার জমিতে সবুজ ঝির ঝিরে ধানি বাতাস। আহ!

সেদিন বিকেলে আমি গেছি পুকুর পাড়ে। গিয়ে দেখি বস্তির চার-পাঁচজন আমার বয়সী ছেলে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের সাথে বোম্বাস্টিক আর সাতচারা খেলি। সবাই চেনা। আমার আগ্রহ হয়। ব্যাপার কী? সবাই এক সাথে দাঁড়িয়ে কী করে? আমি ঠেলে-ঠুলে ওদের মাঝে ঢুকি। যা দেখি তাতে আমার মাথা ঘুরে যায়।

সবাই মিলে একটা জ্যান্ত ব্যাঙ ধরে এনেছে। আমার সামনেই সেই ব্যাঙের দুই পা টেনে ওরা হড়-হড় করে ছিঁড়ে ফেলে! ব্যাঙের হা করা মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না; ঠোঁট দু’টো কেবল থর থর কাঁপতে থাকে। আমি হতভম্ব ভাব কাটিয়ে চিৎকার করি, "এইটা তোরা কী করলি?" ওরা ভাবে আমি ভয় পেয়েছি। দাঁত বের করে বলে, "আরে এমন ব্যাঙ কত্তো আছে!"

আরেকবার, কলেজের পাট শেষে, এক দোকানে বসে কলা-বন খাচ্ছি। দেখি বাচ্চা একদল ছেলে-মেয়ে একটা চড়ুইছানা ধরে এনেছে। সেই নিয়ে ওদের মধ্যে খুব আমোদ চলছে। চড়ুইয়ের এক পায়ে সুতা বেঁধেছে আর সেই সুতার অন্যপ্রান্ত ধরে বন-বন করে ঘোরাচ্ছে। মাঝে মাঝে আবার পাখিটাকে একে অন্যের গায়ে ছুঁড়ে মারছে। আমি দৌঁড়ে গিয়ে কোনো মতে ওদের থামাই।

আরেকবার, যাচ্ছি রাজশাহীতে। বাস থেমেছে নাটোরে। সেখানে নেমে ভাবছি কাঁচাগোল্লা খাবো। এমন সময় একটা দৃশ্য দেখে খাবার রুচি উবে যায়। একটা কুকুর। বটগাছের নিচে পুরানো ময়লা বস্তার মতো পড়ে রয়েছে। সারা গা জুড়ে দগদগে ঘা।

জিজ্ঞেস করে জানলাম ক'দিন আগে কোনো এক দোকানী এর গায়ে ফুটন্ত পানি ঢেলে দিয়েছে! সেই যে গাছের নিচে এসে শুয়েছে, আর নড়েনি। আমি কুকুরের চোখের দিকে তাকাই। সেই চোখে যন্ত্রনা ছাড়া আর কিছু নেই। এক চুল নড়লেও প্রচন্ড ব্যাথা, তাই হয়তো একদমই নড়ে না। আমি একটা রুটি কিনে মুখের সামনে দেই। কুকুরটা খাবারের দিকে চেয়েও দেখে না। সে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। আমার অসহ্য লাগে। মনে হয় সাথে একটা পিস্তল থাকলে এই যন্ত্রনা থেকে ওকে মুক্তি দিতে পারতাম।

আজ কেনো বলছি এসব? কারণ, সেদিন একটু দূর থেকেই দেখলাম এক গাড়িচালক ইচ্ছে করে শুয়ে থাকা কুকুরের উপর গাড়ি চালিয়ে দিলেন। ভাগ্য যে গাড়ির চাকা পড়েছিলো কুকুরের পায়ে। আমাদের কয়েকজনের চিৎকার উপেক্ষা করেই তিনি গাড়ি সেই অবস্থাতে রেখে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলেন। আশে-পাশে সবার মুখ হাসি-হাসি। কুকুরের যন্ত্রনাক্লিষ্ট আর্তনাদে যখন টেকা দায় হয়ে পড়লো, তখন তিনি যেনো অনিচ্ছা সত্বেই গাড়িটা সাঁ করে চালিয়ে চলে গেলেন। আর বেচারা কুকুর, বেঁকে যাওয়া মোচড়ানো পা নিয়ে তিন পায়ে কোনো মতে পালিয়ে বাঁচলো।

সেদিনের পর থেকেই আমি লক্ষ্য করে যাচ্ছি - ঢাকায় যেসব কুকুর আছে তাদের অনেকেরই পা বাঁকানো, কিংবা ভাঙা। অনেকের গায়ে দগদগে ঘা। আরেকটার দেখলাম গায়ে কালশিটে পরা, বোঝাই যায় রড কিংবা ওইরকম কিছু দিয়ে পেটানো হয়েছে। রাস্তায় বেড়াল তো এখন বলতে গেলে একদমই দেখতে পাই না। আগে গাছে কাঠবেড়ালি দেখতাম, পাখির বাসা, একটু জংলা জায়গায় গুঁইসাপ। এসব কোথায় গেলো?

প্রানীজগতের প্রতি আমার মমতা জন্মগত। আমার পোষা কুকুর ছিলো দু'টো। একটা খলশে মাছ। মুনিয়া পাখি ছিলো চারটা, যাদের এক পর্যায়ে ছেড়ে দিয়েছিলাম। ব্যাঙও পুষেছি। আমার ধারণা আমার এই মমতা এসেছে আমার দাদা আর নানার কাছে থেকে। দাদা গরু, ছাগল, মুরগি, ইত্যাদি পালতেন। আমি দেখেছি কী মমতা নিয়েই না তিনি পশুগুলোর যত্ন নিতেন। আর নানা পেলেছেন কুকুর, কথা বলা ময়না, বেড়াল, বানর, ইত্যাদি। আমি নিশ্চিত যে, খুঁজলে দেখা যাবে কম-বেশি আমাদের সবার দাদা-নানাই পশু-পাখি পেলেছেন।

আমি বলছিনা আমরা সবাই বর্বর। এর বিপরীত চিত্র অবশ্যই আছে। তবুও। আমরা কৃষিপ্রধান দেশের মানুষ। জন্ম থেকেই আমরা মানুষ ও পশুর সহাবস্থান দেখে এসেছি। তাহলে কেনো এক-টুকু বর্বরতাও অতিথিপরায়ন ও সংস্কৃতিমনা হিসেবে পরিচিত কৃষক-বাউল-কবি-মাঝি কেন্দ্রিক বাঙালির মধ্যে থাকবে?

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ৩১ জুলাই ২০০৯

0 টি মন্তব্য:

Post a Comment