Friday, January 30, 2009

হঠাৎ করে বাংলাদেশ

গানের প্রেক্ষাপট একটু জানাই। ১৯৯৭ সাল। বিশ্বকাপ ক্রিকেট তখন এক বিশাল ব্যাপার আমাদের জন্য। ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাইনি, টেস্ট তো দূরের কথা। আইসিসি ট্রফিতেও সুবিধা করতে পারি না। জিম্বাবুয়ের কাছে বরাবর হেরে যাই। তখন এক অসম্ভব ঘটনা ঘটে গেলো। কেনিয়াকে হারিয়ে আমরা আইসিসি ট্রফি জিতে গেলাম। সারা বাংলাদেশ বদলে গেলো। রাস্তার মোড়ে মোড়ে রঙ খেলা। ট্রাক ভর্তি করে লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে তরুন-তরুনীদের উচ্ছ্বাস। তখনো আমার জীবদ্দশায় বাংলাদেশে এতো আনন্দের কিছু ঘটেনি।

কত ছোট ছোট ঘটনা।

বয়স বিবেচনায় রাস্তায় এক বৃদ্ধকে ছেড়ে দিলাম রঙের বালতি হাতে আমরা। বৃদ্ধ ফিরে এসে অভিমান নিয়ে বললেন, “আমাকে রঙ দিলানা?” রিক্সা দিয়ে যেতে যেতে আমাদের সামনে এসে হুড খুলে দিচ্ছে তরুনী মেয়েরা। মিষ্টির দোকানে বিনে পয়সায় মিষ্টি বিলানো হচ্ছে। পুলিশ কন্সটেবল এসে আদ্র চোখে জিজ্ঞেস করছে, “ভাই, আমরা ওয়াল্ডকাপে খেলুম, সত্যি?” সবাই জানে এটা। তবু তিনি আমাদের মুখে শুনতে চান। মা-খালারা হঠাৎ করেই ফোনে রান্না-সন্তানের আলাপ বাদ দিয়ে ক্রিকেটের কথা বলেন। বাসায় অসংখ্য পতাকা থাকা সত্ত্বেও নতুন পতাকা কিনে আনেন। ছোট চাচা ফোনে বাবাকে বলেন, “দাদা, চোখ দিয়ে এমনিতেই পানি পড়ছে… কী করবো বলেন তো?”

সেই সময়ের কথা ভাবলে চোখ কেমন জ্বালা করে ওঠে। দেশ যতোই খারাপ খেলুক না কেনো, রাগ করে থাকতে পারি না।

এরপর ১৯৯৯ বিশ্বকাপের আগে দিয়ে লাকী আখন্দ অনেকদিনের অবসর ছেড়ে তাঁর এই গান নিয়ে আসেন।

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

হঠাৎ করে বাংলাদেশ

গীতিকার: লাকী আখন্দ (সম্ভবত)
সুরকার: লাকী আখন্দ
শিল্পী: লাকী আখন্দ

বিশ্বকাপে দেখো হিম-শীতলের দেশে
জমেছে ক্রিকেট পুরোটা।
সাউথ আফ্রিকা নিয়ে যাবে কাপটা
ভাবছে সবাই এ কথা।
ওয়েসী ইন্ডিজ নাকি অস্ট্রেলিয়া পেলো
লংকা দুখের ঝাপটা।
শচিন না হলেও ওয়াসিম আক্রাম
জয় করে নেবে কাপটা।

বলতে পারি না আজ
কার হবে সেই মালা
স্বপনের সুবাস মাখা।
আমাদের হৃদয়ে
সবুজের মাঝখানে
বিজয়ের সূর্য আঁকা।

হঠাৎ করে বাংলাদেশ, চারিদিকে বাংলাদেশ।।
আলোর কিছু থাকছে রেশ
এতেই ভালো লাগছে বেশ।
হঠাৎ করে বাংলাদেশ, চারিদিকে বাংলাদেশ।।
আলোর কিছু থাকছে রেশ
এতেই ভালো লাগছে বেশ!

অচেনা নতুন ভোরে
আমাদের চোখে ধরে।।
আগামীর মাঠে বোনা
ফসলের আবেশ।

হঠাৎ করে বাংলাদেশ, চারিদিকে বাংলাদেশ।
আলোর কিছু থাকছে রেশ
এতেই ভালো লাগছে বেশ!

দূরের আকাশে আজ অবিরাম উড়ছে
উচ্ছ্বাসে কিছু পতাকা
বিশ্বকাপে দেখো আমাদেরও নাম লেখা
ডানা মেলে থাকা বলাকা।

হঠাৎ করে বাংলাদেশ, চারিদিকে বাংলাদেশ।
আলোর কিছু থাকছে রেশ
এতেই ভালো লাগছে বেশ!
হঠাৎ করে বাংলাদেশ, চারিদিকে বাংলাদেশ।
আলোর কিছু থাকছে রেশ
এতেই ভালো লাগছে বেশ!

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ৩০ জানুয়ারি ২০০৯

Monday, January 26, 2009

সাইফাই গল্প: লেখকের চোখ

এক

"স্যার আপনার সাথে দেখা করতে একজন ভদ্রলোক এসেছেন।"

সামন্ত স্যান্যাল খুবই বিরক্ত হলেন। দুপুরের খাবারের পর তিনি একঘন্টা বারান্দায় বসে চা পান করেন। এই সময়টুকু তার বিশ্রামের। পাপানকে বার বার করে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে এ সময়ে তাকে বিরক্ত না করতে। তবুও সে সুযোগ পেলেই এসে বাগড়া দেবে।

সামন্ত স্যানাল একটা কমদামী বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের চুরাশি তলায় এক-ইউনিট নিয়ে থাকেন। ছোট্ট ইউনিটে একটা মোটে বারান্দা। তাও সেখানে বসে দেখার মতো কিছু নেই। ভবনের আশে-পাশেও একই ধাঁচের অসংখ্য দালান। মন্দের ভালো যা তা হলো তার দালানটা প্রধান সড়ক থেকে বেশ দূরে। তাই বারান্দার দিক দিয়ে কোনো গাড়ি ওড়ে না। মাঝে মাঝে বাচ্চা কিছু ছেলে-মেয়ে কমশক্তির বায়োযান[দ্রষ্টব্য] নিয়ে উড়োউড়ি করে। সেটা দেখতে ভালোই লাগে। ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায়। এছাড়া তার ঠিক মুখোমুখি বাসার জানালায় কোনো অজানা ফুলগাছের টব লাগানো। সেই গাছের ফুল ক’দিন পর পর রঙ বদলায়। আসল গাছ নাকি সিনথেটিক তা মাঝে মাঝেই জানতে ইচ্ছে করে। পাপানকে জিজ্ঞেস করলেই নিশ্চিত ভাবে জানা যায়। কিন্তু জিজ্ঞেস করতেও কেনো জানি ইচ্ছে করে না।

"পাপান তোমাকে না বলেছি আমাকে এই সময়ে বিরক্ত করবে না। বলি নাই?"
"যিনি দেখা করতে এসেছেন তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।"
সামন্ত স্যানাল বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে ফেলেন, "তোমাকে আমি কী জিজ্ঞেস করলাম? আমি দেখেছি ইদানিং তুমি আমার কথার সরাসরি উত্তর দাও না। ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে অন্য দিকে নিয়ে যাও। যে এসেছে সে দেখা করার আগে অনুমতি নিয়েছিলো?"
"জ্বী না।"
"অনুমতি না নিয়ে বেকুবের মতো দেখা করতে এসেছে কেনো? নাকি তার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলে তার অনুমতির প্রয়োজন নেই? নাকি?"

পাপান কোনো উত্তর দেয় না। ও খেয়াল করে দেখেছে রাগ হলে সামন্ত স্যানাল অহেতুক প্রশ্ন করেন। সেসব প্রশ্নের জবাব তিনি আশা করেন না। বরং জবাব দিলেই তার রাগ আরো বেড়ে যায়।
"কী? জবাব দিচ্ছো না কেনো?"
"স্যার আপনি ভালো করেই জানেন এই প্রশ্নের উত্তর জানার উপায় আমার নেই। জানতে হলে অন্য রুমে গিয়ে মহামান্য জিরকন পিথ্রিকে জিজ্ঞেস করে জেনে আসতে হবে। রাগ হলেই আপনি অহেতুক প্রশ্ন করেন। এসব প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করা মানেও সময় নষ্ট।"

সামন্ত স্যানালের ইচ্ছে করে এই বেহায়া রোবটকে ঘুরিয়ে একটা চড় দেন। নেহাতই নিরিহ প্রকৃতির মানুষ বলে ইচ্ছের বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না।

"আপনার কি আমার উপর রাগ হচ্ছে? রাগ হলেই আপনি আপন মনে বিড়বিড় করেন। এটা ইদানিং কালে শুরু হয়েছে।"
"পাপান আমার অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। ভালো হলে তোমার পাছায় একটা লাথি দিয়ে বের করে দিতাম। নতুন মডেলের কোনো সহকারী রোবট নিতাম।"
"দৈহিক গঠনে মানুষের সাথে আমার বিশেষ পার্থক্য আছে। পাছা বলতে আমার দেহের ঠিক কোন জায়গাটা আপনি নির্দেশ করছেন?"

সামন্ত স্যানাল চোখ বন্ধ করে দশ থেকে এক পর্যন্ত গুনতে থাকলেন। রাগ কমাতে তার ডাক্তার এই পরামর্শ দিয়েছে। ডাক্তার মেয়েটা গর্দভ হলেও এই পন্থাটা ভালো। দশ থেকে এক পর্যন্ত গোনার পর রাগ আসলেই কমে যায়। গোনা শেষ হবার আগেই সামন্ত পাপানের ধাতব ট্র্যাকের ঘড়ঘড়ে আওয়াজ শুনতে পান। তার মানে পাপান চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সামন্ত চোখ না খুলেই তিনি নির্লিপ্ত গলায় জিজ্ঞেস করেন, "জিরার কণা কে এসেছে বললে?"
"জিরার কণা নয়। জিরকন।" পাপান ওর ভাঙাচুরো বাম হাত তুলে ঘোষণা দেবার মতো করে নাটকীয় ভাবে বলে, "মহামান্য জিরকন পিথ্রি।"
"নাম তো বেশ পরিচিত মনে হচ্ছে! আমি চিনি?"
"স্যার আপনি অবশ্যই ওঁকে চেনেন। গত বছর তিনি রোবোফিকশন অ্যাওয়ার্ড[দ্রষ্টব্য] জিতেছেন। আপনার গত জন্মদিনে আমি তার "ধাতব চোরাবালি" উপন্যাসটা উপহার দিয়েছিলাম।"
"লেখক?", হা হয়ে যান সামন্ত স্যানাল, "রোবট লেখক জিরকন?"
"জ্বী!"
"ওই গর্দভ আমার সাথে দেখা করতে এসেছে কেনো?"

সামন্ত স্যানালের সম্বোধনে পাপান স্পষ্টই আহত হয়। ওর রেডিয়াম চোখে ঔজ্জ্বল্য কমে যায়। গলার স্বর নেমে যায়। পাপান বলে, "স্যার, সম্মানিত একজন ব্যক্তিকে আপনার "গাধা" বলে ডাকা ঠিক হয়নি। উনি গতবছর তার প্রথম উপন্যাসেই রোবোফকশন অ্যাওয়ার্ড জিতে নিয়েছেন। উনার দু’টো গল্পগ্রন্থ। দু’টোই থার্ড সোলারসিস্টেম[দ্রষ্টব্য] বেস্ট সেলার।"

পাপানকে বাগে পেয়ে প্রসন্ন ভাবে হাসেন সামন্ত স্যানাল। বলেন, "গর্দভকে আমি গর্দভই বলি। "ধাতব চোরাবালি" উপন্যাসের কাহিনী আমার মনে আছে। রোবট মেয়ের সাথে মধ্যবয়স্ক পুরুষ স্কুল টিচারের প্রেম। হাস্যকর!"
"উপন্যাসটির শেষ অংশ খুব হৃদয়বিদারক। আপনার হাস্যকর মনে হয়েছে জেনে দুঃখিত হলাম।"
"এক মেয়ে রোবট মা হতে চায়। এই না পাওয়ার বেদনায় সে তার প্রেমের স্মৃতি মস্তিষ্ক মুছে দিচ্ছে। এই ব্যাপারটা তোমার কাছে হৃদয়বিদারক মনে হতে পারে। আমার কাছে মনে হয়েছে হাস্যকর।"
"স্যার আমি কি উনাকে আসতে বলবো?" পাপান আহত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে।
"বলো", সামন্ত স্যানাল উদাত্ত কন্ঠে অনুমতি দিয়ে দেন।

দুই

জিরকন পিথ্রি, যে রোবট লেখক জিরকন নামেই অধিক পরিচিত, সামন্ত স্যান্যালের বসার ঘরে বসে বুঝতে পারে কোনো সমস্যা হয়েছে। স্যান্যালের সহকারী রোবট অনেক আগেই "পাঁচ মিনিট" বলে ভেতরে ঢুকেছে এখন পর্যন্ত আসার কোনো লক্ষণ নেই। জিরকন অস্বস্থি নিয়ে অন্তস্থ ক্রোনোমিটার[দ্রষ্টব্য] পরীক্ষা করেন। ঘড়ি বলছে মোটে পনেরো মিনিট গেছে অথচ মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ চলে গেছে!

জিরকনের পৃথিবীতে আসা হয়েছে হুট করে। কোনো পরিকলনা ছাড়াই। তাই দেখা করার আগে নিয়ম মেনে সামন্ত স্যান্যালের অনুমতি নেয়া হয়নি। সমস্যা কি এই নিয়েই হচ্ছে? তাহলে কি দেখা হবে না? দেখা না হলে একটা আফসোস থেকে যাবে। পরে আবার কবে-কখন পৃথিবীতে আসা হবে তার কোনো ঠিক নেই। জিরকন ব্যক্তিগত ভাবে সামন্ত স্যান্যালের ভক্ত। অনেকেই বলে তার লেখাতে সামন্ত স্যান্যালের প্রভাব আছে। হতেও পারে! স্যান্যালের প্রতিটি লেখাই সে একাধিক বার পড়েছে। জিরকনের মতে সমসাময়ীক আর কোনো লেখক লেখায় এতো বিস্তারিত বর্ণনা দিতে পারেন না। ভদ্রলোকের কাছ থেকে নতুন লেখকদের অনেক কিছু শেখার আছে।

আরেকটা সমস্যাও আছে। পৃথিবীতে আসার আগেই জিরকন পাকামো করে তার বন্ধুদেরকে বলে এসেছে - সে লেখক সামন্ত স্যান্যালের সাথে ব্যক্তিগত ভাবে দেখা করে আসবে। এখন সামন্ত স্যান্যাল যদি দেখা না করে বসার কামরা থেকেই ফিরিয়ে দেন তাহলে লজ্জার একশেষ হবে। গ্যানিমেডে[দ্রষ্টব্য] ওর আড্ডাখানা, ট্রান্সফিউশন ক্যাফেতে[দ্রষ্টব্য] ঠাট্টার তোড়ে ক’দিন মুখই দেখানো যাবে না। গুরুর দেখা পাবার চেয়ে এখন এই ব্যাপারটাই জিরকনকে বেশি ভাবিয়ে তোলে। কম সময়ে-বয়সে জনপ্রিয় হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ওকে ঈর্ষার চোখে দেখে। এর মাঝে এমন মুখরোচক খবর পেলে সেটা নিমিষে সবখানে ছড়িয়ে যাবে। দুঃশ্চিন্তায় জিরকনের হঠাৎ করেই তেষ্টা পায়।

"মহামান্য জিরকন!"
জিরকন চমকে ফিরে তাকায়, প্রো-টিল্ডা-পালসার[দ্রষ্টব্য] প্রজাতির রোবটটা কখন যেনো ফিরে এসেছে।

"লেখক কী বললেন? উনি কি দেখা করবেন?" জিরকন উৎকন্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করে।
"আপনি অনুমতি না নিয়ে এসেছেন দেখে স্যার খুব রাগ করেছেন! তবে তিনি দেখা করবেন বলে সম্মত হয়েছেন।"
জিরকনের বুক থেকে মস্ত ভার নেমে যায়, "ধন্যবাদ!"
"আমার সাথে আসুন। মহামান্য সামন্ত স্যান্যাল বারান্দায় বিশ্রাম করছেন।"

জিরকন ইতস্তত করছে দেখে পাপান ঘুরে দাঁড়ায়, "কোনো সমস্যা?"
জিরকন অস্বস্থি নিয়ে বাদামী চুলে আঙ্গুল চালায়, "আপনি যদি কিছু মনে না করেন, একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন..."

পাপান হাসির মতো একটা শব্দ করে, "আমার দৈহিক মডেল[দ্রষ্টব্য] নিয়ে তো?"
"জ্বী," জিরকন বলে, "পজিট্রনিক মস্তিস্ক-সম্পন্ন[দ্রষ্টব্য] প্রতিটি রোবটের মানবীয়-দেহ অধিকার অথচ..."
"আপনি জানতে চাইছেন আমাকে এই দেহ ধারণে মহামান্য সামন্ত স্যান্যাল বাধ্য করেছেন কিনা, তাই তো?"

জিরকন পাপানের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

"আপনি ভুল ভাবছেন। এটা আমার ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। স্যারের কোনো হাত নেই। মানবীয়-দেহ ধারণের ইচ্ছে আমার কখনোই হয়নি।"
"কিন্তু...", জিরকন যুক্তি দেবা চেষ্টা করে, "আপনি লেখক সামন্ত স্যান্যালকে "মহামান্য" বলে সম্বোধন করছেন? রোবোঅ্যাক্ট[দ্রষ্টব্য] ২.১.২ অনুসারে..."

জিরকনের জিজ্ঞাসাবাদে পাপান এবার দৃশ্যতই বিরক্ত হয়, কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে ওঠে, "আমি আপনাকেও "মহামান্য" বলে সম্বোধণ করেছি... সেটা কিন্তু আপনার কানে লাগেনি!"

জিরকন খুব বিব্রত হতে পড়ে। পাপান যে তাকেও "মহামান্য" বলে সম্বোধন করছে সেটা সে আসলেই খেয়াল করেনি।
জিরকনকে চুপ দেখে পাপান আবার বলে, "আমি জানি না আপনি ব্যক্তিগত ভাবে কী চেতনা ধারণ করেন। তবে আমার স্বল্প-বুদ্ধি আমাকে বলে গুনী ব্যক্তিকে সম্মান করতে হয়। তা সে মানুষ হোক কিংবা রোবট।"

পাপান হয়তো আরো কিছু বলতো কিন্তু বিব্রত জিরকনকে বাঁচাতেই যেনো দরজা ঠেলে সামন্ত স্যানাল বসার ঘরে ঢুকে পড়েন। ভারী গলায় বলেন, "পাপান, আমরা এখানেই বসি। তুমি বরং লেখকের আপ্যায়নের কিছু ব্যবস্থা করো।"

তিন

সামন্ত স্যানাল কৌতুহল নিয়ে রোবট লেখক জিরকন পিথ্রিকে দেখেন। বাদামী চামড়ার ছ'ফুট লম্বা সুদর্শন যুবক। দামী স্যুট পরে আছে।

কে বলবে এই ছেলেটা মানুষ নয়?

গত পঞ্চাশ বছরে ওদের চেহারার কী অভাবনীয় পরিবর্তনই না হয়েছে! স্যান্যালের মনে আছে, চল্লিশ বছর আগে যখন তিনি পাপানকে কেনেন, তখনো রোবটদের চেহারা পুরোপুরি মানুষের মতো হয়নি। সেটা রোবো-আন্দোলনের আগের কথা। পজিট্রনিক মস্তিষ্ক-সম্পন্ন রোবট তখনো বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। রোবো-আন্দোলনের পরে সব বদলে গেলো। পজিট্রনিক রোবটদের স্বাধীন ঘোষণা করা হলো। পাপান তখনই চলে যেতে পারতো। কিন্তু কোনো অজানা কারণে সে স্যান্যালের সাথেই থেকে গেলো। নিজের দৈহিক মডেলও পরিবর্তন করলো না।

এখন রাস্তায় দেখলে বোঝার উপায় নেই কে রোবট আর কে মানুষ। অবশ্য বোঝার যে খুব প্রয়োজন আছে তাও না। গত দশ বছর থেকে সৌরজগতের সব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রোবট ঢুকে পড়েছে। রাজনীতি, আইন, বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান থেকে শুরু করে সমাজসেবা পর্যন্ত। অধিকাংশ গ্রহেই রোবট-মানুষ বিয়ে বৈধ হয়ে গেছে। কেবল একটা, একটা জায়গায় ওরা মার খেয়ে গেলো! এতোদিনেও শিল্প-সাহিত্যের প্রধান ধারায় কোনো রোবট উল্লেখযোগ্য কিছু করে দেখাতে পারেনি।

"স্যার অনুমতি না নিয়ে দেখা করতে এসেছি বলে আমি দুঃখিত। এর পরেও যে আপনি আমার সাথে দেখা করতে সম্মত হয়েছেন এজন্য আমি গর্বিত বোধ করছি।"
"খুব বড় ভুল করেছো..." সামন্ত স্যান্যাল খ্যাঁক করে ওঠেন, "দেখা করার কোনো ইচ্ছেই আমার ছিলো না। কেবল পাপান জোরাজুরি করলো দেখে!"
জিরকন একটু হতভম্ব হয়ে গেলেও তাল সামলে বলে, "স্যার আপনি হয়তো আমাকে চেনেন না তবে আমি আপনার ভক্ত। আমার নাম জিরকন পিথ্রি। টুক-টাক লেখালেখি করি।"
"তোমার লেখা আমি পড়েছি। আমার সহকারী পাপান আবার তোমার খুব বড় ভক্ত। সে-ই আমাকে তোমার "ধাতব চোরাবালি" বইটা উপহার দিয়েছিলো।"

মানুষ লেখকেরা সাধারণত রোবট লেখকদের বই পড়তে চান না। পড়লেও স্বীকার করতে চান না। রোবট সাহিত্যকর্মকে নানান ভাবে হেয় করার একটা চেষ্টা তাদের মধ্যে সব সময় থাকে। সামন্ত স্যান্যাল তেমন বড় লেখক না হলেও লেখক সমাজে তার একগুঁয়েমি, জেদ আর প্রগল্ভতার জন্য পরিচিত। তিনি জিরকনের লেখা পড়েছেন মানে একটা বিশাল ব্যাপার! জিরকন স্বাভাবিক ভাবেই খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ে।
"বলেন কী স্যার! আপনার কাছে বইটা কেমন লেগেছে?"
"জঘন্য লেগেছে! খুব সস্তা উপন্যাস।"
জিরকন একদম চুপসে যায়। সামন্ত স্যান্যাল ওর উপন্যাসকে এক কথায় "দুর্দান্ত" বলে ফেলবেন এমন দুরাশা ওর মনে ছিলো না; তবে ভদ্রতা করেও তো "মন্দ হয়নি" ধরণের কিছু একটা বলা যেতো! ও খুব হতাশ গলায় বলে, "একদমই ভালো লাগেনি?"
"না। একদমই না।"

জিরকনের নিভে যাওয়া মুখ দেখেই হয়তো স্যান্যালের একটু মায়া হয়। তিনি বলেন, "শোনো ব্যাপারটা কী, তোমাদের রোবট লেখকদের প্রধান সমস্যা কি জানো?"
"কী?"
"প্রধান সমস্যা হচ্ছে তোমরা যে রোবট লেখক সেটা তোমরা জোর করে উপেক্ষা করার চেষ্টা করো। বুঝলে কি বললাম?"
"জ্বী না স্যার।"
"আচ্ছা। রোবটেরা লেখালেখি করে কতোদিন থেকে?"
"পজিট্রনিক মস্তিষ্কের প্রথম প্রজন্ম থেকে।"
"তার মানে চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর। আর মানুষ কতোদিন থেকে লেখে? সঠিক কোনো হিসেব আছে?"
"জ্বী না স্যার!"
"এখন তোমরা যদি প্রথম থেকেই মানব-দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মানবিক-সমস্যা নিয়ে লেখার চেষ্টা করো তাহলে ব্যাপারটা কেমন হয়ে যায় না? আমার ব্যক্তিগিত ভাবে মনে হয় তোমাদের লেখা উচিত রোবট-দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মানবিক ব্যাপার কিংবা পুরোদমে রোবটিক সুখ-দুঃখের কাহিনী।"
"জ্বী..."
"তুমি তোমার উপন্যাসে বারে বারে মানব শিক্ষকের বোধ প্রকাশ করার চেষ্টা করেছো। মানবিক অনুভূতি... খুব বেশি মানবিক অনুভূতি। তোমার কলমে সেগুলোকে মনে হয়েছে মনোবিজ্ঞানের তত্ত্বকথা। অথচ মানুষ শিক্ষককে ফোকাসের বাইরে রেখে তুমি যদি রোবট মেয়েটার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গল্প বলতে, তাহলে দারুন একটা ব্যাপার হতো।"
"ও!"
"আর গল্প চলনসই হলেও তোমার বর্ণনা করার হাত নেই। একটু পর পর অক্যুলাইজার, একটু পর পর অক্যুলাইজার[দ্রষ্টব্য]... খুবই বিরক্তিকর!"
"ও!"
"আর এই "ধাতব চোরাবালি" নামটা কেনো রেখেছো বোঝাও তো? ব্যাপারটা কী?"

এই প্রশ্ন নানান সংবাদপত্র তাকে একাধিক বার করেছে। তার ঠিক করা কিছু সংলাপও আছে - "মানব-শিক্ষক যখন রোবট-মেয়ের প্রেমে পড়লেন তিনি বুঝলেন সব তলিয়ে যাচ্ছেন... তলিয়ে যাচ্ছে তার মান-সম্মান আর এতোদিনের অর্জন যা কিছু! তলিয়ে যাচ্ছেন তিনি এক ধাতব মেয়ের পরিনয়ে। এ যেনো এক চোরাবালি... ধাতব চোরাবালি!"

কিন্তু এখন এমন চাঁচা-ছোলা সমালোচনার মাঝে হঠাৎ করা প্রশ্নে জিরকন কেমন তাল হারিয়ে ফেলে। ঠিক করা সংলাপ কেনো জানি আর কিছুতেই মনে পড়ে না।

সামন্ত স্যান্যাল খুব বিরক্তি নিয়ে যেনো এই প্রশ্নের উত্তর জানতেই হবে এমন ভাবে জিরকনের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

চার

পাপানের মনে ক্ষীণ শংকা ছিলো আপ্যায়নের ব্যবস্থা করার আগেই সামন্ত স্যান্যাল রোবট লেখক জিরকনকে বিদায় করে দেবেন। এর আগে হয়েছে এমন। ক’মিনিট কথা বলেই সামন্ত অতিথিকে ধমক দিয়ে বের করে দিয়েছেন।

সামন্ত স্যানাল সব সময় লম্বা আলখাল্লা ধরণের এক রকম ভারী জামা পরে থাকেন। এছাড়া অনেকদিন চুল কাটেন না বলে এই সত্তর বছর বয়সেও তার মাথা ভর্তি কালো চুল। সব মিলিয়ে তাকে লাগে ধর্মপ্রচারকের মতো। তার এই বেশ দেখেও অনেকে ঘাবড়ে যান।

তবে খাবারের ট্রলি ঠেলে বসার ঘরে গিয়ে পাপানের শংকা কেটে যায়। সামন্ত স্যানাল হাত-মাথা নেড়ে খুব উৎসাহ নিয়ে কথা বলছেন। তারমানে জিরকনকে তার পছন্দ হয়েছে। পছন্দ না হলে তিনি এতো নাড়া-চাড়া করেন না, স্থির বসে অতিথির দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকেন।

পাপানকে আসতে দেখে সামন্ত স্যান্যাল আনন্দ নিয়ে ফিরে তাকান, "এই তো পাপান এসে গেছে। পাপান তুমি জানো রোবট লেখকেরা ফ্যান্টাসাইজার[দ্রষ্টব্য] ব্যবহার করতে পারে না?"

পাপান রোবট-মানুষ দুই-ই পান করতে পারে এমন সিনথেটিক পানীয় আর প্রটিন-ব্লক ভরা ট্রে একপাশে রেখে বলে, "জানি। এটা মোটামুটি সবাই জানে। আপনি রোবট সাহিত্যের কোনো খবর রাখেন না বলে জানেন না।"

"কেনো পারে না?"
"ফ্যান্টাসাইজার উদ্ভাবন করা হয়েছিলো মানুষের মস্তিষ্কের উপর ভিত্তি করে। আমাদের পজিট্রনিক মস্তিষ্কে সেটা কাজ করে না।"
"রোবটদের জন্য এমন কিছু বানানো হয় না কেনো?"
"রোবটদের জন্য বানানো খুব কঠিন। আমাদের মস্তিষ্কের ঠিক কোন কোন অংশ আমাদের চিন্তা আর কল্পনার কাজে ব্যবহৃত হয় তা নিশ্চিত ভাবে কেউ বলতে পারে না।"
"এটা কোনো কথা হলো? তোমাদের মস্তিষ্ক তো গবেষণাগারে বানানো - আমাদের তো গোড়া থেকেই জানার কথা!
"ব্যাপারটা এতো সহজ না স্যার। প্রথম পজিট্রনিক মস্তিষ্কের উদ্ভাবন হয়েছিলো অনেকটা দূর্ঘটনার ফলে। এরপর সেই মস্তিষ্কের নিউরাল নেট মেট্রিক্স ব্যবহার করে আরেকটা, পরে সেটা থেকে আরেকটা - এভাবে কোটি কোটি মস্তিষ্ক তৈরি হয়েছে। ফলে মস্তিষ্ক বিবর্তিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত গবেষণাগারে বসে একদম শূন্য থেকে পজিট্রনিক মস্তিষ্ক বানানো অসম্ভব। কমপক্ষে একজন রোবটের নিউরাল নেট মেট্রিক্স লাগে।"

সামন্ত স্যানাল উত্তেজিত ভাবে হাত নেড়ে বলেন, "তার মানে রোবট লেখকদের তথ্য সংগ্রহ আর কল্পনার বিস্তারণ একাধিক ধাপে করতে হয়?"
"কল্পনার বিস্তারণের ব্যাপারটা ঠিক আছে। তবে তথ্য সংগ্রহ আমরা ফ্যান্টাসাইজার ব্যবহার না করেও খুব সহজেই করতে পারি। সামান্য পয়সা খরচ করলেই আমাদের তথ্য-ইউনিট[দ্রষ্টব্য] যে কোনো লাইব্রেরির সাথে সংযুক্ত করা যায় - মিলিসেকেন্ডেই প্রয়োজনীয় সব তথ্য-ইউনিটে জমা পড়ে।"
"কিন্তু ফ্যান্টাসাইজার ব্যবহার না করার মানে বুঝতে পারছো? এই যুগে এটা ব্যবহার না করে কেউ লেখে? লিখতে পারে?"

জিরকন এতক্ষণ চুপ করে দু’জনের কথা শুনছিলো। এবার একটু গলা খাকড়ে বলে, "কিন্তু স্যার এজন্যই কিন্তু রোবট লেখকেরা এখন পর্যন্ত ফ্যান্টাসি-নির্ভর কিছু লিখতে পারেনি। আমাদের সাহিত্য মানের জীবনমুখী উপন্যাস-গল্প কিংবা প্রবন্ধ। রম্যরচনাতেও ভালো তেমন কিছু লেখা হয়নি।"
"এখনো হয়নি, কিন্তু হবে। আমার কাছে ব্যাপারটা কেনো দারুণ লাগছে তা মনে হয় তোমরা বুঝতে পারছো না। আমার মনে হয় প্রযুক্তি নির্ভর লেখালেখির কারণে লেখক কল্পনার জোর আর বর্ণনার ধার হারাচ্ছে। একটা সময় "লেখকের চোখ" বলে একটা জিনিস ছিলো বুঝেছো? লেখক তখন লেখকের চোখে সবকিছু দেখতো, যাচাই করতো, অভিজ্ঞতা জমা করতো। পরে লেখায় সেসব উঠে আসতো। পাঠকেরা যখন পড়তো তখন সব নিজে কল্পনা করে নিতো - এই দুই প্রযুক্তি ছাড়াই। এখন তো লেখক গল্পের প্লট এলেই মাথায় ফ্যান্টাসাইজার লাগিয়ে বসে, আর অক্যুলাইজার ছাড়া কোনো লেখাই প্রকাশিত হয় না।"
"কিন্তু স্যার," বলে জিরকন, "এ দুই প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে কল্পনার সামঞ্জস্য ব্যাহত হবে না? আপনি যেমন কল্পনা করবেন, আমি তেমন নাও করতে পারি।"
"আরে এটাই তো মজা! একই লেখার পাঠক ভেদে ভিন্ন অর্থ হতে পারে। সবার কল্পনা এক হতে হবে এটা কেমন জোরের কথা? আরো ব্যাপার আছে..."
"কী রকম?"

নিজের প্রিয় বিষয়ে কথা বলার সুযোগ পেয়ে সামন্ত স্যান্যাল নড়ে-চড়ে বসেন, "ধরো তুমি একটা গল্পের প্লট নিয়ে ভাবছো। প্লটটা এমন যে একজন রোবট একা ক্যাফেতে বসে আছে। নিঃসঙ্গ রোবট। একা থাকে। কারো সাথেই তার বনে না। সপ্তাহের শেষ দিনে সে একা এই ক্যাফেতে বসে এক কাপ সিনথেটিক কফি খায়। তেমনি একদিন সে একা বসে আছে, হঠাৎ তার টেবিলের সামনে একটা বাচ্চা মেয়ে এসে দাঁড়ায়। সেই বাচ্চা মেয়েটা রোবটকে গল্প শোনায়। তার কল্পনার গল্প। যেখানে সেই ক্যাফের প্রতিটা চেয়ার, টেবিল, শেলফ, বাতি, দেয়াল... সবকিছু জীবন্ত। রোবটের জীবন বদলে যায়। সে পৃথিবীকে অন্য দৃষ্টিতে দেখতে শেখে। এখন বলো - এই গল্প তুমি কিভাবে লিখবে?"
"প্রথমেই ক্যাফে সম্পর্কে বিস্তারিত পড়বো। দলছুট রোবটের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করতে হবে। এরপরে বাচ্চা মেয়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ট নিয়েও কিছু লেখাপড়া আছে... পাপান যেমন বললো, আমাদের তথ্য-ইউনিটে..."
সামন্ত স্যানাল বিরক্তি নিয়ে বাতাসে হাত নাচান, "ভুল ভুল... সব ভুল!"

পাপান আর জিরকন দু’জনেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।

"জিরকন তুমি এখন পর্যন্ত ক’টা ক্যাফেতে গিয়েছো?" জিজ্ঞেস করেন সামন্ত স্যান্যাল।
"সঠিক হিসেব নেই। অনেক।"
"কোনো দলছুট রোবট কিংবা বাচ্চা মেয়ের সাথে তোমার কখনো সাক্ষাত হয়নি?"
"একাধিক বার হয়েছে।"
"তাহলে তুমি কেনো এই ঘটনা লেখার জন্য তোমার তথ্য-ইউনিটে চলে যাবে? তোমার আগের সবস্মৃতি তো জমা আছে, আছে না?"
"জ্বী আছে। কিন্তু আমাদের রোবট মস্তিষ্ক তো সব তথ্য জমা রাখে না। যেসব তথ্য অসম্পূর্ণ ও অপ্রাসঙ্গিক, সেগুলো বাদ পড়ে। অনেকটা মানুষের মস্তিষ্কের মতোই।"
"ঠিক!" হাসেন স্যান্যাল, "আর সেখানেই তো আসে লেখকের চোখের ব্যাপারটা। একজন প্রাচীন লেখক কী করতো জানো? সে তার স্মৃতি হাতড়াতো। সেই স্মৃতি পূর্ণাঙ্গ হতো না। অনেক ফাঁক থাকতো। সেই ফাঁকগুলো সে তার কল্পনা দিয়ে ভরে দিতো। গল্প ততো গবেষণাগ্রন্থ নয় যে সব লাইনে লাইনে মিলে যেতে হবে।"
"কিন্তু স্যার এভাবে লিখলে তো অক্যুলাইজার ব্যবহার করা কঠিন হয়ে যাবে। কারণ সরাসরি চিন্তার সাথে অক্যুলাইজার যুক্ত করা যায় না। নিরেট তথ্য লাগে। মানুষের জন্য ফ্যান্টাসাইজার কিংবা রোবটের জন্য তথ্য-ইউনিট..."
"অক্যুলাইজার ব্যবহার করার কী দরকার?"
"দরকার নেই?"
"না। বর্ণনা দিলেই তো হয়।"
"স্যার পাঠক তো এতো কষ্ট করে বর্ণনা পড়তে চায় না। তারা চায় সরাসরি গল্পে ঢুকে যেতে..."
"পাঠক অলস হয়ে গেছে। আমি তো আমার কোনো বইয়ে অক্যুলাইজার ব্যবহার করিনা। পাঠক পড়তে না চাইলে সেটা তার ব্যাপার।"

জিরকনের বলতে ইচ্ছে করে, "সেজন্যই আপনার বই চলে না।" কিন্তু সাহস হয় না।

পাপান বলে, "আমার একটা প্রশ্ন আছে। নিরেট বর্ণনা দিলে গল্পের কাহিনী ক্ষতিগ্রস্থ হয় না?"
"কেনো? কাহিনী কেনো ক্ষতিগ্রস্থ হবে?"
"আপনার উদাহরণের প্লটের কথাই বলি। আপনি গল্প শুরু করলেন ক্যাফের বর্ণনা দিয়ে। এরপরে শুরু করলেন দলছুট রোবটের বর্ণনা। এরপরে ছোট মেয়ের বর্ণনা, এরপর কাহিনী শুরু হলো। আপনি যদি অক্যুলাইজার ব্যবহার করতেন তাহলে এইসব পাঠক বই খুলেই মুহূর্তেই জেনে যেতো।"

"ঠিক। কিন্তু এতে কাহিনী ক্ষতিগ্রস্থ হবে কী করে? বরং প্রযুক্তির সহায়তা নিলেই কাহিনী ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।"
জিরকন আগ্রহে সোজা হয়ে বসে, "সেটা কী করে?"
"গল্পের স্থান-কাল-পাত্র প্রযুক্তির ঠিক করা বাস্তবতায় আটকা পড়ে যেতো। ধরো আমাকে আমার ফ্যান্টাসাইজার কিংবা তোমার তথ্যভান্ডার বললো দলছুট রোবট নিরিহ হয়। আমি তখন এই রোবটকে দিয়ে মেয়েটাকে খুন করাতে পারতাম না।"
"মেয়েটাকে খুন করার প্রয়োজনীয়তা আসছে কেনো?"
"আসতেই পারে। গল্প লিখতে লিখতে আমার প্লট বদলে যেতে পারে। আমার মনে হতে পারে শেষে রোবট বদলে যায় না। বরং তার মনে হয়, মেয়েটা তার চেনা জগত বদলে দিচ্ছে। সেই চেনা জগত ফিরে পেতে সে মেয়েটাকে খুন করতেই পারে।"
"আচ্ছা!"
"ফ্যান্টাসাইজার কিংবা তথ্য-ইউনিটের উপর ভর করে যদি আমরা কাহিনীর ফাঁদি তাহলে মাঝপথে এমন প্লট বদলানো সম্ভব?"
"না। প্রযুক্তি-বাস্তবতা বদলে আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হবে। সেক্ষেত্রে রোবট আর মেয়ের চারিত্রিক বৈশিষ্টও পালটে যাবে।"
"তাহলে তোমার মনে হয় না এই দুই প্রযুক্তি আমাদের কল্পনার জোর কমিয়ে দিচ্ছে? লেখক তার লেখার ধার আর দেখার চোখ হারাচ্ছে?"
"হয়তো। তবু স্যার আমি অক্যুলাইজার ব্যবহার না করার যুক্তিটা পুরো মানতে পারলাম না!"
"কেনো?"
"ব্যাপারটা এমন হতে পারে - আমি লেখা-লেখির প্রাচীন পদ্ধতি মেনেই লেখা শুরু করলাম। পরে লেখা শেষে আমার লেখা তথ্য-ইউনিটে যুক্ত করে সেই অনুযায়ী অক্যুলাইজার ম্যাপ বানিয়ে ফেললাম?"
"কিন্তু তুমি যে এতক্ষণ ধরে বর্ণনা লিখলে তাতে তোমার বুদ্ধি-মননের ছাপ আছে। সেটা ফেলে দেবে? কেবল পাঠকের মন যোগাতে?"

জিরকন এই কথার কোনো উত্তর দেয় না। নিজের মনে কী যেনো ভাবতে থাকে।

পাঁচ

জিরকনের সাথে সাক্ষাতের পর মাস খানেক চলে যায়।

পাপান লক্ষ্য করে সামন্ত স্যান্যালের রোবো-ফিকশনে বিশেষ আগ্রহ জন্মেছে। প্রায়ই পাপানের কাছ থেকে বই-টই চেয়ে নিয়ে পড়েন। এমনই একদিন সামন্ত এসে জিজ্ঞেস করেন, "আচ্ছা পাপান, আমাদের সাক্ষাতের পরে জিরকনের কোনো লেখা-টেখা আসেনি পত্রিকায়?"
পাপান কেমন চোখ লুকানোর চেষ্টা করে। দুর্বল গলায় বলে, "কই না! না-তো!"

সামন্ত স্যান্যাল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকান। এতোদিন পরেও পাপান ঠিক মতো মিথ্যা বলা শিখলো না। তিনি জেরা করেন, "মিথ্যা বলছো কেনো পাপান?"
পাপান তার বদঅভ্যাস মতো সরাসরি জবাব দেয় না। বলে, "স্যার গল্পটা আপনার না পড়াই ভালো!"

সামন্ত স্যান্যাল হুট করে রেগে যান, "পাপান আমার কী ভালো না ভালো সেটা তোমাকে দেখতে হবে? লাই পেয়ে তুমি একদম মাথায় উঠে বসেছো। দাও, ওর গল্পটা দাও।"

স্যান্যাল জিরকনের গল্প সহ পত্রিকাটা নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসেন। পাতা উল্টেই বুঝতে পারেন কেনো পাপান গল্পটা তাকে দেখাতে চাচ্ছিলো না। গল্পে একাধিকবার অক্যুলাইজার ব্যবহার করা হয়েছে। সামন্ত পাপানের বোকামীতে আপন মনেই হাসেন। জিরকন যে তার কথা শুনে অক্যুলাইজার ব্যবহার করা ছাড়বে না তা তো তিনি সেদিনই ওর ভাব-ভঙ্গি দেখে বুঝে নিয়েছিলেন। সেই নিয়ে এতো লুকোছাপা কেনো?

কিন্তু গল্পটা পড়তে পড়তে তাঁর চোখ-মুখ লাল হয়ে ওঠে। পড়ন্ত বয়সের বন্ধু-বান্ধবহীন এক লেখকের গল্প - যিনি সারা জীবন কেবল লিখেই গেছেন, পাঠক-সমালোচকের স্বীকৃতি পাননি। সময় বয়ে যায়, সবাই বদলায়, কেবল তিনি একাই নিজেকে বৃত্তে আটকে রাখেন। কিছুটা অভিমানে, আর কিছুটা আত্মরক্ষায়। নিঃসঙ্গ সেই লেখকের একমাত্র সঙ্গি একজন দলছুট রোবট।

ছয়

সূর্য পশ্চিমে ঢুলে গেলে পাপান বারান্দায় সামন্ত স্যান্যালের জন্য আরেক কাপ চা নিয়ে আসে। দেখে সামন্ত স্যান্যাল একদৃষ্টে পাশের দালানের জানালার সিনথেটিক ফুলের দিকে তাকিয়ে আছেন। পাপান এসেছে বুঝে তিনি দৃষ্টি না সরিয়েই বলেন, "বুঝলে পাপান, যতো যাই বলি না কেনো জিরকন ছেলেটার কিন্তু দেখার চোখ আছে। লেখকের চোখ।"

© অমিত আহমেদ

[দ্রষ্টব্য]: সাইফাই গল্পের সিরিজ শুরু করার ইচ্ছা। বেশ কয়েকটা প্লট ইতিমধ্যে মাথায় ঘুরঘুর করছে। এই গল্পে ব্যবহৃত পরিভাষা আর চরিত্রগুলো ঘুরে ফিরে নানান গল্পে আসবে। তাই আমার সাইফাই গল্পে সচরাচর ব্যবহৃত চরিত্র ও পরিভাষা নিয়ে আমার সাইফাইক্লোপিডিয়া

ব্যবহৃত ছবি: ফটোশপে বানানো।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ২৬ জানুয়ারি ২০০৯

Sunday, January 25, 2009

সহসা ভালোবাসা ৪: আমার কাটা হাত আর সেই মেয়েটা

সারা জীবনে অনেক মানুষের ভালোবাসা আমি পেয়েছি। কাছের মানুষের। এমন কী মাঝে মাঝে একদম অচেনা-অজানা কারো কাছ থেকে। এমন কারো কাছে যাঁদেরকে আমি আগে কখনো দেখিনি। আবার যে দেখবো সেই সম্ভাবনাও নেই। কিন্তু আমার জীবনে তাঁদের মমতার বড় একটি ছাপ থেকে গেছে। আমার এই সিরিজ তাঁদের প্রতি আমার স্বগত শ্রদ্ধার প্রকাশ।

চার

এই ঘটনা কবে ঘটেছিলো মনে নেই। সম্ভবত কলেজে পড়ার সময়, নিউ মার্কেটে।

সেই সময়ে একটা ব্যাপার ছিলো। সব কিছুই তুচ্ছ মনে হতো। মনে হতো আমি অজেয়। কেউ, কিচ্ছু আমাকে আমার উচ্চতা থেকে নামাতে পারবে না। প্রচন্ড গর্ব আর তারুন্যে সারাক্ষণ চুর হয়ে থাকতাম। চারপাশে খুব তাচ্ছিল্য নিয়ে তাকাতাম।

নিউমার্কেটে তখন যেতাম প্রধানত আড্ডা মারতে আর মেয়ে দেখতে। তখন বইয়ের আর চিত্রশিল্পীদের দোকানের সামনের খোলা চত্বরে বসে আড্ডা দেয়া যেতো। এখন মনে হয় না আর যায়। কর্তৃপক্ষ একটা “চত্বরে বসা নিষেধ” টাইপ টিনের নোটিশবোর্ড টাঙিয়ে রাখে। খোলামেলা বলে সেই জায়গাটা আমাদের বিশেষ পছন্দের ছিলো। আড্ডা দিতে দিতে চারপাশের সব দেখা যেতো। মাঝে মাঝে বন্ধুরা একে অন্যকে টোকা দিয়ে হেঁটে যাওয়া কোনো সুন্দরী মেয়ে দেখাতাম। চিন্তাহীন নির্বিবাদী জীবন।

জায়গাটা পছন্দ হবার আরেকটা কারণ হলো ঠিক অন্যপাশেই গলিতেই চায়ের স্টল। সেখান থেকে সারা চত্বরের দোকানে চা যায়। আমরাও আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে নিজে গিয়ে, কিংবা চা নিয়ে ঘুরঘুর করা পিচ্চির মাধ্যমে চায়ের ফরমায়েশ দিই। তেমনি একদিন সবাইকে বসিয়ে রেখে আমি গেছি চায়ের কথা বলতে।

মাঝে মাঝে হয় না আপনার কোথাও কেটে গেছে, আপনি খেয়ালই করেননি? হয়তো দরদর করে রক্ত ঝরছে, আপনি খেয়ালই করেন নি। চায়ের অর্ডার দিয়ে ফিরে আসবো, এমন সময় একটা মেয়ে কেমন শিউরে উঠে বললো, “ভাইয়া আপনার হাত কেটে গেছে!”
আমি খুব তাচ্ছিল্য নিয়ে হাতের দিকে তাকাই, ডান কিংবা বাম হাত, মনে নেই, আসলেই কেটে গেছে। কিভাবে কোথায় কাটলো কে জানে! টপ-টপ করে রক্ত ঝরছে। আমি খুব তাচ্ছিল্য নিয়ে বললাম, “ও এটা? ব্যাপার না।”
মেয়েটা খুব শংকা নিয়ে বলে, “অনেকখানি কেটে গেছে তো! অনেক রক্ত পড়ছে!”

আমি এবার মেয়েটার দিকে ভালো মতো তাকাই। ছিটের কমদামী সালোয়াক কামিজ পরা, শুকনা-শাকনা, শ্যামবর্ণ, চুলে তেল দেয়া, গ্রামের বাড়িতে গেলে এমন চেহারা আর বেশ অনেক চোখে পড়ে। আমার মনে তেমন উৎসাহ জাগে না। মেয়েটা সুন্দর হলে হয়তো আলাপ জমাবার চেষ্টা করতাম, কিন্তু এখন গা লাগাই না।

বলি, “ব্যাপার না। একটু পরেই বন্ধ হয়ে যাবে।”
আমি চলে যেতে চাইলে মেয়েটা কেমন আপনজনের মতো আদেশ করে, “না! একটু দাঁড়ান…”
আমি কেমন থমকে যাই। এমন আদেশের বিপক্ষে না বলার ক্ষমতা তো আমার নেই।
মেয়েটা চায়ের স্টল থেকে একগ্লাস পানি নিয়ে আমার হাত ধরে। খুব যত্ন নিয়ে আমার কাটা ধুয়ে দেয়। এরপর হাত ব্যাগ থেকে একটা রুমাল বের করে বেঁধে দিয়ে বলে, “এবার ঠিক আছে।”

আমি খুব বিব্রত হয়ে যাই। এমন কাটাকুটি সবসময়ই হয়। ভয় পাবার মতো কিছু না। কিন্তু মেয়েটা আমার অনুমতির তোয়াক্কা না করে যেভাবে আমার ক্ষত বেঁধে দিলো… আমি কি বলবো বুঝে পাই না।
মেয়েটা বলে, “বাসায় গিয়েই ডেটল লাগাবেন। ঠিক আছে?”
আমি মিনমিনে গলায় বলি, “আচ্ছা।”

আমি হাতে রুমাল বেঁধে আড্ডায় ফিরে যাই। রুমাল দেখে বন্ধুরা ছাড়ে না। নানান প্রশ্ন করে। ঘটনা শুনে তাদের উল্লাস শুরু হয়ে যায়, “ভাই… তুই দেখাইলি…”, “কস কী মামা?”, “দেখতে কেমুন?”, “ওই, ফোন নাম্বার নিছস?” আমি চুপ করে থাকি। আমার হঠাৎ মনে হয় আমি মেয়েটাকে ধন্যবাদ জানাইনি। আবার উঠে গিয়ে সেই মেয়ের খোঁজ করতে আমার লজ্জা লাগে। আমি চুপ করে বসে থাকি। মেয়েটাকে নিয়ে বন্ধুদের করা ঠাট্টায় শামিল হতে পারি না।

সেদিন, এমনকি এর পরেও অনেকদিন, আমার মনে ধন্যবাদ না জানানোর দোষ বুকে কাঁটার মতো বিঁধে থাকে!

বি:দ্র: এই রকম ঘটনা আমার সাথে অনেকবারই হয়েছে। কখনো কোনো পথচারি, কখনো ক্লাসমেট, কখনো বাসের সহযাত্রী, কখনো দোকানী… এখন মনে পড়ে, তাদের বেশিরভাগকেই আমার ধন্যবাদ তো জানানো হয়ইনি, বরং সামান্য কাটা নিয়ে তাদের গায়ে পড়ে সাহায্য করতে চাওয়া নিয়ে বিরক্ত হয়েছি।

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: আমারব্লগ, ২৫ জানুয়ারি ২০০৯

Friday, January 23, 2009

আমার একটা ফ্রি ই-বই “ফেলে আসা গল্প যতো”

আসছে বইমেলার নতুন গল্পের বইয়ের কাজ করতে গিয়ে আমার পুরানো গল্পগুলোও নাড়া-চাড়া করা হয়ে গেলো। তাই করতে গিয়ে দেখলাম আমার আসলে নানান জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অনেক পিচ্চি গল্প আছে। আকারে ছোট, ওজনেও হয়তো তেমন ভারী নয়। বেশির ভাগই নানান দৈনিক, সাপ্তাহিক কিংবা ব্লগে প্রকাশিত। কয়েকটা আবার আমার বেশ প্রিয়। গল্পগুলো অনেকটা চানাচুরের মতো। পেট ভরেনা ঠিকই, কিন্তু হঠাৎ মুঠো ভরে খেতে মন্দ লাগে না।

আইডিয়াটা ছিলো প্রধানত তারেক ওরফে কনফুসিয়াসের। ওর কথা শুনে একদম ঝোঁকের মাথায়; এক রকম বলতে গেলে নিজের জন্যই; এমন কিছু গল্প তুলে একটি ই-বই বানিয়ে ফেললাম।

কৃতজ্ঞতা টিপু কিবরিয়া ভাইকে - চাইতেই তিনি তাঁর একটি ছবি প্রচ্ছদে ব্যবহার করার অনুমতি দিয়ে দিলেন। মাশিদ আপুকে - তিনি তাঁর কাক সিরিজের ছবিগুলো বইয়ের অলংকরণে ব্যবহার করতে দিয়েছেন। আর বইমেলা ডট কমের ফরিদকে - সে খুব উৎসাহ নিয়েই বইটি ওর সাইটে তুলে দিয়েছে।

হাতে অবসর থাকলে বইটি ডাউনলোড করে নিতে পারেন - বই-মেলা ডট কম এর ডাউনলোড পেজ। এখানে গিয়ে read the book বাটনে ক্লিক করুন।


© অমিত আহমেদ

এই বিষয়ে অন্য পোস্ট:
+ ফেলে আসা গল্পের প্রতিজ্ঞা, ফরিদ, সামহোয়্যার ইন, ১ ফেব্রুয়ারি ২০০৯
+ অণুগল্পের একটা ফ্রি ই-বই “ফেলে আসা গল্প যতো”, অমিত আহমেদ, আমারব্লগ, ২৩ জানুয়ারি ২০০৯

Monday, January 19, 2009

সহসা ভালোবাসা ৩: উদ্যানের সেই সিগারেট বিক্রেতা

সারা জীবনে অনেক মানুষের ভালোবাসা আমি পেয়েছি। কাছের মানুষের। এমন কী মাঝে মাঝে একদম অচেনা-অজানা কারো কাছ থেকে। এমন কারো কাছে যাঁদেরকে আমি আগে কখনো দেখিনি। আবার যে দেখবো সেই সম্ভাবনাও নেই। কিন্তু আমার জীবনে তাঁদের মমতার বড় একটি ছাপ থেকে গেছে। আমার এই সিরিজ তাঁদের প্রতি আমার স্বগত শ্রদ্ধার প্রকাশ।

তিন

মাধ্যমিক পরীক্ষার পরের কথা। কোনো কারণে মন খুব খারাপ। বাসে করে চন্দ্রিমা উদ্যানে গিয়েছি। একটা সময় ছিলো যখন মন খারাপ হলেই আমি চন্দ্রিমা উদ্যান, মিরপুর স্টেডিয়াম কিংবা পুরান এয়ারপোর্টে গিয়ে বসে থাকতাম।

সবুজ ঘাসে একা বসে আছি। তখনো সিগারেট ধরিনি। বন্ধুরা কেউ ধরালে শখ করে দুই-একটা টান দিতাম।

উদ্যানের ঘাসে বসে কেনো জানি আমার সিগারেট টানতে ইচ্ছে করে। দূরের এক সিগারেট বিক্রেতাকে হাত ইশারা করে ডাকি। বিক্রেতা কাছে এলে আমি দু’টো সিগারেট কিনে একটা ধরাই।

বিক্রেতা কেনো জানি চলে যায় না, বরং আমার পাশে গলার ট্রে নামিয়ে বসে পড়ে। বলে, “বাইয়ার কী মন খারাপ?”

আমি কোনো জবাব দেই না। অচেনা সিগারেট বিক্রেতার সব প্রশ্নের জবাব দেবার কোনো কারণ নেই। লোকটা বসেই থাকে। আপন মনে আমাকে গ্রামের কথা বলে। ঢাকার বৈরি পরিবেশের কথা বলে। রেখে আসা নতুন বউ এর কথা বলে। আমি কোনো কথা না বললেও লোকটার কথা শুনতে আমার ভালোই লাগে।

আমি আমার সিগারেট শেষ করে আরো দু’টো নেই। বিক্রেতা এবার উদ্যানের চাঁদাবাজদের কথা বলে। সিগারেট নিয়ে দাম শোধ না করা পান্ডাদের কথা বলে। আমি শুনে যাই। সেই দু’টো সিগারেটও শেষ হয়ে যায়। আমি বলি, “আরো দুইটা বেনসন দেন।”
বিক্রেতা আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে, “আমি আপনারে সিগ্রেট বেচুম না!”
আমি বিস্ময় চাপতে পারি না। জিজ্ঞেস করি, “কেনো? সিগারেট বেচবেন না কেনো?”
“আফনে অল্পক্ষণে চাইরডা সিগ্রেট খাইছেন। আফনের বয়স কম। এমনে খাইলে তো মইরা যাইবেন!”

আমি ফাঁকা চোখে তাকিয়ে থাকি। বিক্রেতা মমতা নিয়ে বলে, “বাইরে… মাইনষের জেবনে কত্ত সমস্যা… মন খারাপ কইরা কী হইবো কন?”

আমার গলায় কেমন ভালো লাগা কষ্ট দানা বাঁধে। আমি বিক্রেতার দিকে তাকিয়ে একজন পরিপূর্ণ মানুষকে দেখি। লোকটা আমার আগের জানা মানুষের সংজ্ঞা বদলে দেয়। আমি হঠাৎ পাওয়া বিশ্বাস বুকে চেপে বাড়ি ফিরে আসি।

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: আমারব্লগ, ১৯ জানুয়ারি ২০০৯

Sunday, January 18, 2009

সহসা ভালোবাসা ২: সেই রিক্সাওয়ালা ভাই

সারা জীবনে অনেক মানুষের ভালোবাসা আমি পেয়েছি। কাছের মানুষের। এমন কী মাঝে মাঝে একদম অচেনা-অজানা কারো কাছ থেকে। এমন কারো কাছে যাঁদেরকে আমি আগে কখনো দেখিনি। আবার যে দেখবো সেই সম্ভাবনাও নেই। কিন্তু আমার জীবনে তাঁদের মমতার বড় একটি ছাপ থেকে গেছে। আমার এই সিরিজ তাঁদের প্রতি আমার স্বগত শ্রদ্ধার প্রকাশ।

দুই

মনে হয় আটানব্বই এর কথা। কলেজ ফাঁকি দিয়ে পাঞ্জাবী পরে খুব ভাব নিয়ে বইমেলায় গিয়েছি। পরিকল্পনা ক’টা নতুব বই কিনে বাসায় যাবো।

বাসায় বইমেলার কথা কিছু বলিনি। মা জানেন কলেজ থেকে সোজা বাসায় যাবো। না বলে কোথাও গেলে মা আবার খুব রাগ করতেন। আর বাসায় ফিরতে দেরি হলে তো কথাই নেই। কিন্তু মেলায় ঘুরতে ঘুরতে দেরি হয়ে গেলো। ঘড়ি দেখে তাড়াহুড়ো বই-টই কিনে-টিনে মেলার গেট থেকে জাদুঘর পর্যন্ত রিক্সা ভাড়া করেছি। পরিকল্পনা সেখান থেকে বাসা পর্যন্ত বেবিটেক্সি নেবো।

রিক্সা খানিক দূর যাবার পরে বুঝলাম বিশাল ভুল করে ফেলেছি। যেই রিক্সায় উঠেছি তার চালক নবাব বিশেষ। বয়স কম হলে কী হবে, দুলকী চালে রিক্সা চালাচ্ছে। যে লেনে ভিড় বেশি সেখানে ঢুকে বসে আছে। আশে-পাশের সবাই টান দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আমার খুব রাগ লাগে। আর তখন বয়সও কম। আমি খুব চিল্লাচিল্লি শুরু করলাম, “হই মিয়া, আপনে তো রিক্সাই টানতে পারেন না!”, “আরে কী করেন? ওইদিক খালি আপনি এই গাড়িগুলার মধ্যে রিক্সা ঢুকাইলেন ক্যান?”, “ঢাকায় নতুন না?”, “আরে দ্যাখো… আপনের কী খাইয়া রিক্সা চালান? জোরে টানেন… জোরে…”

রিক্সাওয়ালা মুখ ভার করে থাকে। কিন্তু আমার রাগ চরমে উঠিয়ে দিয়ে সে রিক্সা যেভাবে চালাচ্ছিলো সেভাবেই চালাতে থাকে। অনেক কেচ্ছার পর রিক্সা যখন জাদুঘরের থামে মনে হয় বিশ্বজয় করা হলো। আমার মাথায় তখন রক্ত চড়ে আছে। লাফ দিয়ে রিক্সা থেকে নেমে পকেটে হাত দিয়েই সে রক্ত দুম করে মাথা থেকে নেমে গেলো। মানিব্যাগ নেই! কোনো এক ফাঁকে আমার ভাবের পাঞ্জাবী থেকে পকেট মারা গেছে।

আমি বুঝতে পারি রিক্সাওয়ালা এবার শোধ নেবে। সারা রাস্তা বকাবকি করতে করতে নিয়ে এসেছি। এখন সেই শোধ নেবার মোক্ষম সময়। আমি শুকনো গলায় বলি, “ভাই, আমার পকেট মারা গেছে।”
আমাকে অবাক করে দিয়ে রিক্সাওয়ালা কোনো রাগ দেখায় না। গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলে, “ভিড়ে মইধ্যে হয় এমুন।”
আমার খুব খারাপ লাগে। আমি বলি, “ভাই কী করবো বলেন তো? আমার সাথে বাসায় চলেন, আমি দুইগুন ভাড়া দেবো।”
রিক্সাওয়ালা আমার কথায় কান দেয় না। গলায় একটা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় নিয়ে বলে, “বাদ্দেন তো বাই। আফনে একটা সমস্যার পড়ছেন। অহন বাড়িত ক্যামনে যাইবেন ভাবছেন?”

আমার মন ভিজে যায়। এতোকিছুর পরেও মানুষটা শোধ নিচ্ছে না। বরং তার চিন্তা আমি কিভাবে বাড়ি ফিরে যাবো তা নিয়ে। আমার খুব খারাপ লাগে। বলতে ইচ্ছে হয়, “ভাই আমাকে মাফ করে দেন।” বলতে পারি না। অচেনা মানুষের মততার ভার সইতে না পেরে মাথা নিচু করেই ফিরে আসি।

© অমিত আহমেদ
প্রথম প্রকাশ: আমারব্লগ, ১৭ জানুয়ারি ২০০৯

Friday, January 16, 2009

সহসা ভালোবাসা ১: পরীক্ষা শেষে সেই মহিলা

সারা জীবনে অনেক মানুষের ভালোবাসা আমি পেয়েছি। কাছের মানুষের। এমন কী মাঝে মাঝে একদম অচেনা-অজানা কারো কাছ থেকে। এমন কারো কাছে যাঁদেরকে আমি আগে কখনো দেখিনি। আবার যে দেখবো সেই সম্ভাবনাও নেই। কিন্তু আমার জীবনে তাঁদের মমতার বড় একটি ছাপ থেকে গেছে। আমার এই সিরিজ তাঁদের প্রতি আমার স্বগত শ্রদ্ধার প্রকাশ।

এক

উচ্চমাধ্যমিক পদার্থবিদ্যা দ্বিতীয়ভাগ পরীক্ষা দিয়ে মাটিতে থম ধরে বসে আছি। আমার ধারণা পরীক্ষা এতো খারাপ হয়েছে যে আমি ফেল করে যাবো। মাথা খারাপ অবস্থা। মনে হচ্ছে আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সব চুরি হয়ে গেছে। আমাকে এভাবে ফেলে রেখে ক’জন বন্ধুও বাড়ি যেতে পারছে না।
আমি যতই বলি, “তোরা যা… আমি সারারাত এখানে থাকবো।”
ওরা বলে, “আমরাও থাকবো। সমস্যা কী?”
আমার ইচ্ছা ওরা চলে গেলেই পালিয়ে যাওয়া। কমলাপুর থেকে ট্রেন ধরবো।

আমার অবস্থা দেখে রাস্তা ধরে হেঁটে যাওয়া নিন্মবিত্ত এক মহিলা এগিয়ে আসেন। কথা শুনে জোর করে আমাকে ধরে কোন গলির কোথা দিয়ে যেনো তাঁর বাসায় নিয়ে যান। টিনের চালা। উনি কী মনে করে কোক কিনে আনেন। আমার হাতে গ্লাস তুলে দেন। মাথায় হাত বুলিয়ে মমতার কিছু কথা বলেন। কী বলেন আমার মনে নেই। তবে মনে আছে তাঁর কথা শুনে আমার চোখে প্রায় পানি চলে আসে। আমি মাথা নিচু করে কোক পান করি; আর ভাবি এতো ভালোবাসা যেই মানুষ পায় তার তুচ্ছ পরীক্ষার ফল দিয়ে কী আসে যায়?

মাঝে মাঝেই আমার সেই মহিলার কথা মনে পড়ে। সেই পরীক্ষায় ফেলের ধারে কাছেও ছিলাম না। ঝোঁকের মাথায় হয়তো আসলেই পালিয়ে যেতাম। বড্ড বড় ভুল করতাম। তাঁর মমতার কথাগুলো আমাকে কতটা ছুঁয়েছে তা ব্যাখ্যা করতে পারবো না। সেই বাসা কোথায় ছিলো মনে নেই। চেহারা দেখলে চিনবো সে সম্ভাবনাও নেই। তাঁকে আমার কৃতজ্ঞতাটুকু তাই আর কখনোই জানানো হয়নি।

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: আমারব্লগ, ১৬ জানুয়ারি ২০০৯

Monday, January 05, 2009

তৃতীয় ষড়ব্লগ

এক

সারা জীবনে অনেক ভুল করেছি। অন্যের প্ররোচনায়। নিজ অজ্ঞানতায়। সেই ভুলগুলি আমাকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। দুমড়ে-মুঁচড়ে দিতে চেয়েছে। মাটিতে মিশিয়ে দিতে চেয়েছে। ঠিক তখন, ঠিক সেই মুহূর্তে, আমার মনে পড়েছে আমার বাবার কথা। একজন মুক্তিযোদ্ধা কথা। তাঁর হার না মানা আত্মবিশ্বাসী দৃপ্ত পথ চলার কথা। আমার মনে পড়েছে মা'র কথা। শত প্রতিকুলতাতেও যিনি আমাকে বুকে আগলে রাখেন। হাতে ধরে নতুন করে পথ চলতে শেখান। আমি বল ফিরে পাই। আত্মবিশ্বাস ফিরে পাই। উপলব্ধি করি আমার হার মানার উপায় নেই। কারণ আমাকে হার মানতে শেখানো হয় নি!

আজ কোনো বিশেষ দিন নয়। তবুও খুব বাবা-মা'কে মনে পড়ছে!

দুই

জাতীয় নির্বাচন নিয়ে খুব দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম। আমি রাজনীতি সচেতন মানুষ নই; তবে এইবারের নির্বাচন অন্য সববারের মতো ছিলো না। অনেক কিছুই ঘটতে পারতো, সেই সম্ভাবনা আর সুযোগ ছিলো। কোনো অজানা কারণে আমার তেমন কিছুই ঘটে যাবে বলে মনে হচ্ছিলো। ঘটেনি। সুষ্ঠু ও অহিংস নির্বাচন হয়েছে। আমি অনেক খুঁজেও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে এবারের নির্বাচন নিয়ে নেতিবাচক কিছু খুঁজে পাইনি। নির্বাচনের আগে দিয়ে আমারব্লগে এটিএন বাংলার লাইভ স্ট্রিমিং শুরু করলো। আর অনলাইনে নানান সাইটে খবরের আপডেট তো আছেই। সেই ঝোঁকে আমি টানা দুইরাত না ঘুমিয়ে নির্বাচন অনুসরণ করে গেলাম। কোনো রাজনৈতিক দল সমর্থন করার চেয়ে রাজাকার আর রাজাকারের বাচ্চারা কোনো আসন পেয়ে গেলো কিনা তা নিয়েই বেশি শঙ্কা ছিলো। সচলায়তনে সবাইকে নিয়ে লাইভ ব্লগিং চলছিলো। দিনশেষে ফলাফল দেখে দিল ঠান্ডা হয়ে গেছে (মহাজোট ২৬২, চার দল ৩২, অন্যান্য ৫)। বাঙালি কী জিনিস তা আরেকবার প্রমান হলো। আশা রাখবো আওয়ামী লীগ এবার সংসদে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য কাজে লাগিয়ে যুদ্ধপরাধীদের বিচার সেরে ফেলবে। একই কারণে তাদের বিশেষ কিছু দায়বদ্ধতা চলে আসে। এই নিয়ে নতুন করে কিছু না বলে ইশতিয়াক রউফের "ময়ূরপংখী রাজনীতি" লেখাটির সাথে সহমত জ্ঞাপন করছি।

তিন

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো ধর্মঘট চলছে। খবর যা শুনি, মনে হয় ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কেচ্ছা চলবে। এজন্য নানান সমস্যা হচ্ছে। চরম অর্থনৈতিক দৈন্যতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এখানে মানুষের জমানো টাকা বলে কিছু থাকে না। উপার্জন বাড়লে সেই মতো খরচ বাড়ে। ট্যাক্স বাড়ে। আমার ব্যাঙ্কে যা গচ্ছিত ছিলো তার সব শেষ। এখন টেনে-টুনে কোনো মতে চালাচ্ছি। তবে ধর্মঘটের কারণে একটি জিনিস বুঝতে পারলাম। তা হলো উপার্জন একটু বাড়ার সাথে সাথে আমার গায়ে তেল জমে গেছে। আগে অড-জব করেছি। মোটেই গায়ে লাগেনি। এখন আর ইচ্ছে করে না। করবোও না... বরং অন্য সোর্স থেকে আরেকটি স্কলারশিপ বাগানোর ধান্দা করছি।

ব্যাচেলর্সের শিক্ষার্থীরা যদিও ক্লাস হচ্ছে না বলে খুশি; ধর্মঘটের কারণে তাদেরকেই কিন্তু ভুগতে হবে বেশি। প্রথমত, ধর্মঘটের জন্য বাদ পড়া ক্লাসগুলো এই শীতকালেই শেষ করা হবে। সাধারণত এক টার্মে ব্যাচেলর্সে আমরা ৫টি কোর্স নেই। তারমানে গত টার্মের ৫টি আর এই শীতের ৫টি মিলে মোট ১০টি কোর্স তাদের সাইজ করতে হবে। আর লোড সামলাতে এবার যদি কেউ কম কোর্স নেয় তাহলে তাদের গ্র্যাজুয়েশন পিঁছিয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত, এই ধর্মঘটের ফাঁদে যেসব শিক্ষার্থী পড়েছে তাদের ডিগ্রীর দাম কমে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানে একসাথে ১০টি কোর্স সামলানো সোজা ব্যাপার না, তাই শিক্ষকদের কাছে নির্দেষ আসবে কোর্স সহজ করার। গড়পড়তা ৪০টি কোর্সের মধ্যে ১০টিই যদি টেনেটুনে করা হয় তবে চাকুরিদাতা সেই ডিগ্রীর দাম দেবে কেনো? আমাদের, গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের অন্তত এই সমস্যা নেই।

সবশেষে যা হবে তা হলো বেসিক এর সমস্যা। বিশেষ করে টেকনিক্যাল সায়েন্সের ছেলে-মেয়েদের। এমনিতেই এখানে পড়াতে গিয়ে দেখি ওদের বেসিক কতো খারাপ। দুই বছর শেষ করে ফেলে ডেটা স্ট্রাকচার সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখে না। সেখানে এভাবে ক্লাস করে ওরা আদপে কিছু শিখতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।

চার

এই বইমেলায় "বৃষ্টিদিন রৌদ্রসময়" নামে আমার একটি গল্পের বই বেরুতে পারে... নজমুল আলবাব ভাইয়ের শস্যপর্ব প্রকাশন থেকে। গতবার উপন্যাস "গন্দম" প্রকাশিত হয়েছিলো জাগৃতি প্রকাশন থেকে। এইবারও একটি উপন্যাসই করার ইচ্ছে ছিলো; কিন্তু শুরু করেও ব্যস্ততার কারণে আর শেষ করতে পারিনি। তাই গল্পগ্রন্থই সই। এখন পর্যন্ত নতুন-পুরাতন মিলিয়ে মোট নয়টি গল্প নির্বাচিত হয়েছে।

পাঁচ

ক'মাস আগে বান্ধবীকে নিয়ে গণকের কাছে গিয়েছিলাম। আমার নিজের মোটেও ভাগ্যে বিশ্বাস নেই। কিন্তু মেয়েটি আবার খুব বিশ্বাস করে। টার্কিশ কফি, ট্যারট, ক্রিস্টাল বল, হস্তরেখা সবই মোটামুটি ওর যাচাই করা হয়ে গেছে। সেদিন ডাউনটাউনে এলোমেলো ঘুরতে ঘুরতে কাকতালীয় ভাবে গনকের সন্ধান পাওয়া গেলো। ট্যারটকার্ড রিডিং। জন প্রতি বিশ ডলার। ভাবলাম, অনেক কিছুই তো করলাম জীবনে। ট্যারটকার্ডও না হয় হয়ে যাক। গণক খুব মন দিয়েই আমার কার্ড দেখলো। মিলিয়ে মিশিয়ে অনেক কিছু বললো। বললো, নিজের সবকিছু সবাইকে জানাতে নেই। তুমি জানাও। এটা ঠিক না। মানুষ ভালো না। অনেকেই স্বার্থ কিংবা হিংসা বশে তোমার ক্ষতি করে ফেলতে পারে। সাবধানে থেকো।

কথা গোপন করতে হলে প্রায়শই মিথ্যে বলতে হয়। এটা আমি খুব সহজে পারি না। মাঝে মাঝে যখন খুব, খুব মিথ্যে বলা প্রয়োজন হয়ে পড়ে তখনও ভুল করে সত্যি বলে ফেলি। কিংবা গলায় এতোই প্রকট অপরাধের ছাপ নিয়ে মিথ্যে বলি যে ধরা পড়ে যাই। মিথ্যে বলে পরে আবার সত্যি বলেছি এমন উদাহরণও অসংখ্য আছে। অথচ আশে-পাশে যাদেরকে দেখি, যাদের সাথে চলি, বিশেষ করে বাঙালি যারা; তারা কখনোই কেনো জানি সব কথা খুলে বলে না। অনেক কিছুই চেপে রাখে। গোপনে রাখে। সময় বুঝে মানুষ বুঝে তবে বলে। একমাত্র আমিই খোলা বইয়ের মতো ঘুরে বেড়াই। ভন্ড গণকের কথাই হয়তো ঠিক। মানুষ হয়তো আসলেই ভালো না। হয়তো আমার আসলেই সাবধানে থাকা দরকার।

ছয়

ধূমপান আবার শুরু করেছি। মনের মধ্যে এই নিয়ে কাঁটা বিঁধে আছে। ভেবেছিলাম নিজে থেকেই ছেড়ে দিতে পারবো, সেই মানসিক জোর আমার আছে। এখন বুঝলাম নেই। কানাডা সরকার প্রায়ই টিভিতে বিজ্ঞাপন দেয় - সিগারেট ছাড়তে হলে ডাক্তারের সাথে কথা বলো। তাই ক'দিন আগে গেলাম ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার নানান পরামর্শের সাথে তিন বাক্স ফ্রি নিকোটিন প্যাচ দিয়ে দিলো। এই প্যাচ ব্যবহার করে তার তিন পেশেন্ট নাকি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছে। বাক্সগুলো বাসায় সাজিয়ে রেখেছি। এখনই ব্যবহারের কোনো ইচ্ছে নেই। শুরু যখন করেই ফেলেছি আরও ক'দিন টেনে-টুনে নেই!

© অমিত আহমেদ

ছবি কৃতজ্ঞতা: wordworks-uk.com