Friday, July 31, 2009

ঢাকা থেকে ১১: মানুষ কিংবা জানোয়ার

ছেলেবেলার একটা গল্প বলি। থাকতাম মধ্য পীরেরবাগ, মিরপুর। এলাকাটা তখন আক্ষরিক অর্থেই সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা। ফলজ আর ওষধী গাছের সারি, তার ফাঁকে ফাঁকে শাপলা-শালুক-কচুরিপানা ভর্তি পুকুর। কাঁচা রাস্তার দু'পাশ জুড়ে ওয়ালী মিয়ার জমিতে সবুজ ঝির ঝিরে ধানি বাতাস। আহ!

সেদিন বিকেলে আমি গেছি পুকুর পাড়ে। গিয়ে দেখি বস্তির চার-পাঁচজন আমার বয়সী ছেলে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের সাথে বোম্বাস্টিক আর সাতচারা খেলি। সবাই চেনা। আমার আগ্রহ হয়। ব্যাপার কী? সবাই এক সাথে দাঁড়িয়ে কী করে? আমি ঠেলে-ঠুলে ওদের মাঝে ঢুকি। যা দেখি তাতে আমার মাথা ঘুরে যায়।

সবাই মিলে একটা জ্যান্ত ব্যাঙ ধরে এনেছে। আমার সামনেই সেই ব্যাঙের দুই পা টেনে ওরা হড়-হড় করে ছিঁড়ে ফেলে! ব্যাঙের হা করা মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না; ঠোঁট দু’টো কেবল থর থর কাঁপতে থাকে। আমি হতভম্ব ভাব কাটিয়ে চিৎকার করি, "এইটা তোরা কী করলি?" ওরা ভাবে আমি ভয় পেয়েছি। দাঁত বের করে বলে, "আরে এমন ব্যাঙ কত্তো আছে!"

আরেকবার, কলেজের পাট শেষে, এক দোকানে বসে কলা-বন খাচ্ছি। দেখি বাচ্চা একদল ছেলে-মেয়ে একটা চড়ুইছানা ধরে এনেছে। সেই নিয়ে ওদের মধ্যে খুব আমোদ চলছে। চড়ুইয়ের এক পায়ে সুতা বেঁধেছে আর সেই সুতার অন্যপ্রান্ত ধরে বন-বন করে ঘোরাচ্ছে। মাঝে মাঝে আবার পাখিটাকে একে অন্যের গায়ে ছুঁড়ে মারছে। আমি দৌঁড়ে গিয়ে কোনো মতে ওদের থামাই।

আরেকবার, যাচ্ছি রাজশাহীতে। বাস থেমেছে নাটোরে। সেখানে নেমে ভাবছি কাঁচাগোল্লা খাবো। এমন সময় একটা দৃশ্য দেখে খাবার রুচি উবে যায়। একটা কুকুর। বটগাছের নিচে পুরানো ময়লা বস্তার মতো পড়ে রয়েছে। সারা গা জুড়ে দগদগে ঘা।

জিজ্ঞেস করে জানলাম ক'দিন আগে কোনো এক দোকানী এর গায়ে ফুটন্ত পানি ঢেলে দিয়েছে! সেই যে গাছের নিচে এসে শুয়েছে, আর নড়েনি। আমি কুকুরের চোখের দিকে তাকাই। সেই চোখে যন্ত্রনা ছাড়া আর কিছু নেই। এক চুল নড়লেও প্রচন্ড ব্যাথা, তাই হয়তো একদমই নড়ে না। আমি একটা রুটি কিনে মুখের সামনে দেই। কুকুরটা খাবারের দিকে চেয়েও দেখে না। সে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। আমার অসহ্য লাগে। মনে হয় সাথে একটা পিস্তল থাকলে এই যন্ত্রনা থেকে ওকে মুক্তি দিতে পারতাম।

আজ কেনো বলছি এসব? কারণ, সেদিন একটু দূর থেকেই দেখলাম এক গাড়িচালক ইচ্ছে করে শুয়ে থাকা কুকুরের উপর গাড়ি চালিয়ে দিলেন। ভাগ্য যে গাড়ির চাকা পড়েছিলো কুকুরের পায়ে। আমাদের কয়েকজনের চিৎকার উপেক্ষা করেই তিনি গাড়ি সেই অবস্থাতে রেখে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলেন। আশে-পাশে সবার মুখ হাসি-হাসি। কুকুরের যন্ত্রনাক্লিষ্ট আর্তনাদে যখন টেকা দায় হয়ে পড়লো, তখন তিনি যেনো অনিচ্ছা সত্বেই গাড়িটা সাঁ করে চালিয়ে চলে গেলেন। আর বেচারা কুকুর, বেঁকে যাওয়া মোচড়ানো পা নিয়ে তিন পায়ে কোনো মতে পালিয়ে বাঁচলো।

সেদিনের পর থেকেই আমি লক্ষ্য করে যাচ্ছি - ঢাকায় যেসব কুকুর আছে তাদের অনেকেরই পা বাঁকানো, কিংবা ভাঙা। অনেকের গায়ে দগদগে ঘা। আরেকটার দেখলাম গায়ে কালশিটে পরা, বোঝাই যায় রড কিংবা ওইরকম কিছু দিয়ে পেটানো হয়েছে। রাস্তায় বেড়াল তো এখন বলতে গেলে একদমই দেখতে পাই না। আগে গাছে কাঠবেড়ালি দেখতাম, পাখির বাসা, একটু জংলা জায়গায় গুঁইসাপ। এসব কোথায় গেলো?

প্রানীজগতের প্রতি আমার মমতা জন্মগত। আমার পোষা কুকুর ছিলো দু'টো। একটা খলশে মাছ। মুনিয়া পাখি ছিলো চারটা, যাদের এক পর্যায়ে ছেড়ে দিয়েছিলাম। ব্যাঙও পুষেছি। আমার ধারণা আমার এই মমতা এসেছে আমার দাদা আর নানার কাছে থেকে। দাদা গরু, ছাগল, মুরগি, ইত্যাদি পালতেন। আমি দেখেছি কী মমতা নিয়েই না তিনি পশুগুলোর যত্ন নিতেন। আর নানা পেলেছেন কুকুর, কথা বলা ময়না, বেড়াল, বানর, ইত্যাদি। আমি নিশ্চিত যে, খুঁজলে দেখা যাবে কম-বেশি আমাদের সবার দাদা-নানাই পশু-পাখি পেলেছেন।

আমি বলছিনা আমরা সবাই বর্বর। এর বিপরীত চিত্র অবশ্যই আছে। তবুও। আমরা কৃষিপ্রধান দেশের মানুষ। জন্ম থেকেই আমরা মানুষ ও পশুর সহাবস্থান দেখে এসেছি। তাহলে কেনো এক-টুকু বর্বরতাও অতিথিপরায়ন ও সংস্কৃতিমনা হিসেবে পরিচিত কৃষক-বাউল-কবি-মাঝি কেন্দ্রিক বাঙালির মধ্যে থাকবে?

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ৩১ জুলাই ২০০৯

Tuesday, July 28, 2009

ঢাকা থেকে ১০: ডে জা ভু!

এক

আমার বন্ধুর বিয়েতে ওর বোন আর ভাগ্নীরা এসেছিলো আমেরিকা থেকে। আমার আসার অন্যতম প্রধান কারণও ছিলো দোস্তের বিয়ে। তবে দুর্ভাগ্য; নানান ঝামেলায় আসার তারিখ পিছিয়ে একটুর জন্য বিয়েটা মিস করেছি। গতকাল ওরা চলে গেলো। বাসা থেকেই সবার কান্না-কাটি। আমি এসব একদম সহ্য করতে পারি না; তাই একটু দূরেই ছিলাম। বিমানবন্দরে ওদের সাথে যাচ্ছিলাম আমি আর আমার বন্ধু। আমার বোন নেই বলে বন্ধুর বোনদেরকেই নিজের বোনের মতো মনে হয়। গতকাল মনটা তাই খারাপ হয়ে ছিলো। জানি, ঠিক এই ঘটনাই ঘটবে আমার পরিবারে আর কিছু দিন পর যখন আমি চলে যাবো!

দুই

গতকাল সারারাত পাগলা বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে রাত জেগে কাজ করেছি। কানাডার দিন মানে এখানে রাত। একাডেমিয়ার কিছু বিষয়ে আমার তৎক্ষণাত সিদ্ধান্তের দরকার ছিলো। তাই রাত জাগা ছাড়া যোগাযোগের আর কোনো উপায় ছিলো না। কী কাজ সেটা বলে আপনাদের বিরক্ত করবো না; শুধু জানিয়ে রাখি গতকাল আমার সবচেয়ে সফল দিনগুলোর (আসলে রাত্তির) একটা ছিলো। একের পর এক সুখবর পেয়েছি! দিলটা এই কারণে খোশ!

দুপুরে ঘুম থেকে উঠে দেখি তখনো বৃষ্টি চলছে। সচল অতিথি শাহেনশাহ সিমনকে নিয়ে একটা কাজে আর কাজ শেষে একজনকে দেখতে হাসপাতালে যাবার কথা ছিলো। কিন্তু রাস্তার অবস্থা শুনে আর যাওয়া হয়নি। মা গিয়েছিলেন বাজারে আর বাবা অফিসে; দু'জনের কাছেই শুনলাম রাস্তায় পানি জমে একাকার হয়ে আছে। সরকার থেকে কিছু রাস্তায় পাম্প বসানো হয়েছে সেটাও শুনলাম, কিন্তু যা বুঝলাম তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বন্ধুদের কল দিয়ে জানলাম অধিকাংশই অফিসে গিয়ে ফিরে এসেছে, বাকিরা যাবার কষ্টটুকুও আর করেনি; জলবন্ধতার কারণে বেশির ভাগ অফিসেই আজ কাজ হয়নি। বনানীতে এক এপার্টমেন্টে শুনলাম একাধিক পাম্প বসিয়ে গ্যারাজ থেকে পানি সরানো হচ্ছে। ওদের গ্যারাজ ছিলো ভূমিতলে, সেই গ্যারাজ সব গাড়ি সহ পানিতে ঢুবে গেছে! আমার বিচিত্র কারণে হাসি পায়। আমাদের দেশটাতে বৃষ্টি হলেও সমস্যা, না হলেও! সেচের ব্যবস্থা নেই, নেই নিষ্কাশনেরও!

রাত আটটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বের হয়ে যাই। গন্তব্য "ফাহিম মিউজিক সেন্টার"। আমার বাসা থেকে কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ। কারণ ওয়ারফেজের নতুন অ্যালবাম "পথচলা"। একটা সময় ছিলো যখন ওয়ারফেজের বেড়াছেঁড়া ফ্যান ছিলাম। দেয়াল টপকে, মারামারি করে, রোদে-বৃষ্টিতে ভিজে, বাবা-মা'র হাত-পা ধরে, কতো কনসার্ট যে দেখেছি! তখন ক্যাসেট টেপ কিনতাম এলিফ্যান্ট রোডের "গীতাঞ্জলি" থেকে আর মিরপুর-১০ এর "চৌধুরি উদ্যোগ" থেকে। ওই দোকানগুলোতে ওয়ারফেজের পোস্টার আর স্টিকারের বায়না দিয়ে রাখতাম। কী যে একটা সময় ছিলো তখন! সেই সময়ের গানগুলো মিজান নতুন করে গেয়েছে শুনে আর অপেক্ষা করতে পারলাম না। অর্ধভেজা হয়ে আটটা দশে দোকানে পৌঁছে দেখি দোকান তখনো খোলাই আছে। সিডি কিনে পাশের রেস্তোরায় গিয়ে বসেছি, চায়ে চুমুক দেবার আগেই বন্ধুদের কল। ওরা আছে স্টার কাবাবে। চা শেষ করে সেখানে যেতে যেতে আরেকটু ভেজা হয়।

স্টার কাবাবে বারোয়ারি আড্ডায় দশটার বেশি বেজে যায়। আস্তে আস্তে সবাই উঠতে থাকে। থেকে যাই কেবল বাল্যবন্ধু আমরা তিনজন। আর আমাদের ঝোঁক ওঠে, এই অন্ধকার নেমে আসা জলাবন্ধ ঢাকায় বৃষ্টি ভেজা রাস্তা ধরেই আমরা আশুলিয়ায় যাবো! বন্ধুর গাড়িতে চেপে বসে আমি আমার ওয়ারফেজের সিডিটা ছেড়ে দেই। মিজানের গলায় শুরু হয় "বসে আছি একা"। আমরা চমকে উঠি। ঠিক একই ঘটনা তো ঘটেছিলো অনেকদিন আগে। তখন আমরা সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকবো/ঢুকেছি। আড্ডা মেরে প্রায়ই এমন বেরিয়ে পড়তাম। তবে সেদিন, আমাদের মনে পড়ে, ঠিক এমনই ঝুম বৃষ্টির পরে একই রকম আড্ডা শেষে গাড়িতে গান বাজিয়ে আমরা ক'জন রওনা দিয়েছিলাম বনানী থেকে। সেই ঘটনার পর কতোদিন চলে গেছে। এর মাঝে আমাদের গাড়ির মডেল বদলেছে। পেশা বদলেছে। প্রেমিকা বউ হয়েছে, না হলে নতুন প্রেমিকা এসেছে। কিন্তু সেই বন্ধুত্বটা বদলায়নি; বদলাবে যে সেই সম্ভাবনাও নেই।

তিন

বাংলাদেশের খেলা দেখে আসলাম। এই ম্যাচেও জিতেছি। সিরিজটা আমাদের পকেটে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সবাইকে আমার অভিনন্দন!

খেলা দেখেও চরম আনন্দ পেয়েছি। শেষের ওভারগুলো বাদ দিলে (ফুলটসে দুই উইকেট!!) আমার আজও গতদিনের মতো মনে হয়েছে যে খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ছিলো ওরা জিততে পারবে। এই আত্মবিশ্বাস একটা দারুন জিনিসটা - এটা থাকলে আর বেশি কিছু লাগে না। আশরাফুলকে এতো গালি দেই তবে এই ছেলেটা দায়িত্ব নিয়ে খেললে যে যে কোনো ম্যাচ জেতাবার ক্ষমতা রাখে তা আজ আবার প্রমান হলো। যেমনটা দরকার ছিলো ঠিক তেমনটাই খেলেছে। একটা সেঞ্চুরি ওর পাওনা ছিলো; সেটা নষ্ট করলো ঝোঁকের মাথায় লোপ্পা ক্যাচটা তুলে দিয়ে।

পাইলট শতগুনে ভালো খেলোয়াড় ছিলো সেটা মেনে নিয়েই বলি; এই সিরিজে মুশফিকুরের কিপিং দেখে ততো খারাপ লাগেনি। হাতে বেশ কিছু শটও আছে। ছেলের বয়স মোটে ২০; আর কিছুদিন গেলে খারাপ হবে না।

আর সাকিব! ওর কথা আর কী বলবো! বাংলাদেশ দলে এমন পরিপক্ক খেলোয়াড় আমি আগে আর দেখিনি। এক কথায় অসাধারণ! ওকেই পাকাপাকি ভাবে ক্যাপ্টেন বানিয়ে দিলে মন্দ হয় না। ক্যারাবিয়ানরা ইতিমধ্যেই ওকে "দ্য আইসম্যান" বলে ডাকা শুরু করেছে।

উৎপল শুভ্র দেখলাম লোকাল ম্যাগাজিনে এই নিয়ে একটা রিপোর্টও লিখে ফেলেছেন। ভদ্রলোকের উদ্দ্যম আছে বলতে হবে। প্রথমআলো থেকে শুরু করে উজডেন, ক্রিকইনফো, ক্যারাবিয়ান সংবাদপত্র সবখানেই তাঁর রিপোর্ট দেখতে পাই।
তাঁকেও আমার অভিনন্দন!

(২৭-২৮-২৯ জুলাই ২০০৯)

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ২৮ জুলাই ২০০৯

বিশেষ দ্রষ্টব্য
ওয়ারফেজের "পথচলা" অ্যালবামটা দুর্দান্ত হয়েছে। মিজানের গলা আর উচ্চারণ আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। মিউজিক স্বাভাবিক ভাবেই এ-প্লাস। আর অ্যালবামে অতর্কিতে বাবনার গান পেয়ে একই সাথে চমকিত ও আনন্দিত হয়েছি। না শুনে থাকলে বাংলাদেশবাসীদের কিনে শোনার অনুরোধ করছি।

দুইখান ছবি

সিডি কিনে যে রেস্তোরায় চা পান করতে ঢুকেছিলাম। ছেলেটা ওখানেই কাজ করে। নিজের ছবি তোলার দারুন আগ্রহ।
The Restaurant

আশুলিয়া। সারিনা ভাসমান রেস্তোরায় ওঠার ব্রিজ। তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে।
Rain Rain Rain

Monday, July 27, 2009

ঢাকা থেকে ৯: ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল

এক

আজ আর গতকাল মিলে বেশ বৃষ্টি হলো। গতকাল বৃষ্টিভেজা রাতে বাংলাদেশ বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলা দেখেছি। খেলায় সবাইকে এতো আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছিলো যে মুহূর্তের জন্যও আমার মনে হয়নি যে আমরা হারতে পারি। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে আমার শুভেচ্ছা।

এই বৃষ্টির খুব দরকার ছিলো। গরম কমাবার জন্য নয়, কৃষকদের জন্য। প্রতিদিন সংবাদপত্রে পড়ছি আর টিভিতে দেখছি পানির জন্য কৃষকদের হাহাকার। পাটচাষী পাটে জাগ দিতে পারছেন না, বেচে দিতে হচ্ছে পানির দরে। আমন-চাষী আমন রোপন করতে পারছেন না। মাঠের ফসল শুকিয়ে ঝামা হয়ে আছে। প্রথমআলো লিখেছে, উত্তরাঞ্চলে ব্যাঙের বিয়ে দেবার ধুম পড়েছে। মহিলার দল গ্রাম ঘুরে ঘুরে পূজো-অর্চনা করে ব্যাঙের বিয়ে দিচ্ছেন। মসজিদে চলছে বিশেষ মোনাজাত। বৃষ্টির জন্য এতো হাহাকার! সেচ ব্যবস্থার এই হাল আমাদের কৃষি প্রধান বাংলাদেশে!

শুনি তেলের দাম, বিদ্যুত/ব্যাটারির দাম, সব মিলিয়ে হাতে-পেটে-খাওয়া কৃষকের কাছে সেচযন্ত্র রাখা মানে হাতি পোষা। আমার এক বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিলো। সে এক এনজিওতে কাজ করে। সে বললো দেশি উপাদানে সেচ যন্ত্র তৈরি সম্ভব; খরচ পড়বে মোটে হাজার খানেক টাকা। সরকার চাইলেই হয়। এনজিওগুলো তো আর এ ধরনের প্রোজেক্টে বিনিয়োগ করতে চাইবে না।

দুই

বাঙালির একটা মজার ব্যাপার আছে। সেটা হলো দলাদলি - কারণ ছাড়া দলাদলি। বাঙালি খুব মিশুক জাতি বলে আমাদের মধ্যে একদম অসামাজিক মানুষ তেমন পাওয়া যায় না; আমরা বন্ধু-বান্ধব নিয়ে চলতে পছন্দ করি। এই চেনাজানার মধ্যেও আমি দেখেছি অবধারিত ভাবেই কিছু উপদল তৈরি হবে যার একটার সাথে আরেকটার খুব একটা বনে না। অন্য দলকে কিংবা দলের সফল ব্যক্তি/ব্যক্তিদেরকে নিয়ে আজে-বাজে কুটচন্ডালিও চলবে।

পরশু রাতে কাজী নজরুল ইসলামের উপন্যাস "বাঁধন-হারা" পড়তে গিয়ে এমন মনে হলো। "সমালোচক" এবং "পরশ্রীকাতর" যে এক নয় তা তিনি লিখেছেন। লিখেছেন, "যাকে হরদম দেখতে পাওয়া যায়, এমন একটি ব্যক্তি যে সারা দুনিয়ায় "মশহুর" একজন লোক হবেন, এ আমরা সইতে পারি নে।" এই ব্যাপারগুলো আগেও লক্ষ্য করেছি, এখনো দেখতে পাই। আগেও রবি ঠাকুর, শরৎচন্দ্রের লেখায় বাঙালির চারিত্রিক গঠন নিয়ে এমন দু'এক লাইন লেখা পড়ে চমকে গেছি! এতোদিন হয়ে গেছে এখনো এভাবে লাইনে-লাইনে কিভাবে মিলে যায়। বাঙালির জাতিগত চরিত্র কি এতোটাই দৃশ্যমান? এতোটাই নিরেট?

তিন

বাংলাদেশে আমার আসার হার কমছে। এবার অবশ্য বেশি দিনের ব্যবধান ছিলো না; গত বছরের ফেব্রুয়ারিতেই দেশে ছিলাম। কিন্তু বৈদেশে যাবার পরে প্রথম ক'বছর যেমন প্রতি গ্রীষ্মে দেশে চলে আসতাম, এখন সেটা আর হয় না। অনেক কিছু হিসেব করে তবেই আসতে হয়। এবার দেশে এসেও মাথায় কাজের চিন্তা জেরবার করে রেখেছে। অনেক কাজ বাকি, অনেক ডেডলাইন সামনে পড়ে আছে। এসব চিন্তা মাঝে মাঝেই দেশে থাকার আনন্দটা কেমন মলিন করে দেয়। ব্যাপারটা খুব দুঃখজনক।

ঢাকায় এবার বেশ ছবি তুলে বেড়াচ্ছি। কারণ আছে বেশ কিছু। প্রথমত প্রবাসে আমার বন্ধুসমাজের প্রায় সবাই ভিনদেশী। ওদের ঢাকা দেখার খুব শখ। অন্তর্জালে ঢাকার ছবি দেখাতে গিয়ে মাঝে মাঝে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যাই। সেখানে ছবি মানেই হয় খুব ঋণাত্মক (বস্তির পরে বস্তি, ভিক্ষুকের পরে ভিক্ষুক) না হলে খুব ধনাত্মক (শপিং মল আর অ্যাপার্টমেন্ট, চেইন রেস্তোরা আর আইস্ক্রিম পার্লার)। আমি চেষ্টা করছি এমন ছবি তুলতে যাতে ঢাকার মাঝামাঝি এবং দৈনন্দিন অবস্থাটা কিছু বোঝা যায়। আর লোভীদের দাপটে যেভাবে ঢাকার পরিবর্তন হচ্ছে, আর যেভাবে মৌলবাদ নড়েচড়ে উঠছে, কখন যে কী হয়ে যায় ভরসা পাই না। তাই আমার ঢাকার ছবি আমি আমার কাছে রাখতে চাই।

আমার তোলা কিছু ছবি দেখাই আপনাদেরকে। ছবি বিষয়ক আরো তথ্যের জন্য ছবিতে ক্লিক করতে পারেন।

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ২৭ জুলাই ২০০৯

তিন নেতার মাজার।
Tinn Netar Mazaar

দোয়েল চত্বর।
Doyel Chottor

রাজু স্মারক ভাস্কর্যের একাংশ।
Raju Memorial Sculpture

শাহবাগ।
The Entrance

প্রায় ১০৫ বছর পুরানো কার্জন হলের পুকুর।
Curzon Hall

আমাদের মিনিবাস।
Our Good Old Mini Bus

পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার। অলংকার বাজার।
Old Town v1

Friday, July 24, 2009

ঢাকা থেকে ৮: একের ভেতরে সাত!

১৮ জুলাই ২০০৯

আজ ছবির হাটে একটা মিনি সচলাড্ডা হয়ে গেলো। বাংলাদেশের সময় ভেবে আমি গিয়েছিলাম ১৫ মিনিট পরে, কিন্তু গিয়ে দেখি বিপ্লব'দা ছাড়া আর কেউ নেই। পরে আস্তে আস্তে সবাই উপস্থিত হতে শুরু করলেন। এই আড্ডা নিয়ে এক প্যারা লিখে রেখেছিলাম, কিন্তু এখন আর দেবার প্রয়োজন বোধ করছিনা কারণ বিপ্লব'দা এবং এনকিদু ইতিমধ্যেই এই নিয়ে দু'টো পোস্ট দিয়ে দিয়েছেন [বিপ্লব'দার প্রতিবেদন, এবং এনকিদুর ছবিব্লগ]। আমি শুধু ধন্যবাদ জানাবো। এই বৈঠক অনেকের সাথে সামনাসামনি কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে; তাই ধন্যবাদ আয়োজক বিপ্লব'দা এবং উপস্থিত সবাইকে।

শাহেনশা সিমন এবং এনকিদু থাকে আমার বাসার কাছাকাছিই। তাই সচলাড্ডা শেষে বনানীতেও আমাদের তিনজনের একটা ক্ষুদ্র আড্ডা জমেছিলো।

১৯ জুলাই ২০০৯

আজ গিয়েছিলাম চীন মৈত্রি সম্মেলন কেন্দ্রে, এক বন্ধুর সাথে। জেসিআই (অর্থাৎ জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল) নামক এক সংগঠনের "ফিউচার লিডারস সামিট" শীর্ষক সভায়। এ সংগঠন সম্পর্কে আমার কোনো পূর্ব ধারণা ছিলো না; থাকার কথাও অবশ্য না, কারণ মনে হলো কম্পিউটার বিজ্ঞানীর চেয়ে ব্যবসায়ী কিংবা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চাকুরেরাই এই সংগঠনে স্বাচ্ছন্দ বোধ করবেন বেশি। সংগঠনের সভ্যদের মধ্যে তাঁদের সংখ্যাই বেশি ছিলো। আলোচনাও ছিলো অর্থনীতি কেন্দ্রিক। বাংলাদেশ কর্পোরেট জগতের অনেক চেনা-জানা মুখই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আফতাব খুরশিদ, গীতি আরা সাফিয়া, ওয়াকার চৌধুরী, প্রমুখ। জুন শীন নামক জনৈক কোরিয়ান উপস্থিত ছিলেন। জানা গেলো তিনি জেসিআই এর ওয়ার্ল্ড প্রেসিডেন্ট এবং কোনো এক কোম্পানীর সিইও। বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানও উপস্থিত ছিলেন।

বিষয়বস্তুতে আগ্রহ নেই বলেই মনে হয় আমার কাছে সভাটা একটু নিরসই মনে হয়েছে। এতো আলোচনার পরেও আমি বুঝতে পারিনি এই সংগঠনের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্যটা আসলে কী? অনানুষ্ঠানিক (আমি তাদের মিশন স্টেটমেন্ট পড়িনি, তাই এটা আনুষ্ঠানিকও হতে পারে) লক্ষ্য অবশ্যই "পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি"। ব্যবসায়ী ও কর্পোরেট জগতে যারা তরুন তারা অবশ্যই চাইবেন যতো পারা যায় যোগাযোগ বাড়াতে। এরকরম একটা সংগঠনের সভ্য হয়ে থাকলে ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও একই সংগঠনের সভ্য সেই দাবীতে নিজেদের মধ্যেই অনেক কাজ সেরে নেয়া যায়। এতে বিশেষ করে তরুনদের যাদের চেনাজানা কম ব্যবসার পথ অনেকটাই সুগম হয়। আমার কাছে তাই এমন সংগঠনের দরকার আছে বলেই মনে হয়।

তবে এ ধরণের সংগঠনের সাধারণত জনস্বার্থমূলক কিছু উদ্যোগ থাকে। তেমন কিছু নিয়ে জেসিআই সভায় আলোচনা হতে দেখলাম না। আমি একটু পরে গিয়েছিলাম এর আগে এসব আলোচনা হয়ে গেলে আমার অবশ্য জানার কথা নয়। কিংবা হয়তো সেসব বিষয় এই সভার বিষয়সূচিতে ছিলো না। প্রশ্নোত্তর পর্বে অবশ্য কিছু ভালো প্রশ্ন ছিলো। ড়্যাফল ড্র, উপস্থাপনা, খাবার-দাবার আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বেশ ভালোই ছিলো। বিশেষ করে একদল মেয়ের নাচ, যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়ে বলে জানা গেলো, আমার কাছে দুর্দান্ত লেগেছে!

সব শেষে ছিলো শাফিন আহমেদের গান। বাংলা ব্যান্ড জগতে আমার কিছু চেনাজানা আছে। অনেক বড়ভাই, বন্ধু, ও ছোটভাই নানান ব্যান্ডে ঢুকে পড়েছে কিংবা নিজেদেরই ব্যান্ড খুলেছে। তাদের কাছ থেকে মাইলসের পেশাদারিত্ব নিয়ে অনেক শুনেছি। যদিও ইদানিং শুনতে পাই শাফিন এখন আর মাইলসে নেই; চেষ্টা করছে সলো ক্যারিয়ার গড়ার। তবে আজ শাফিন সে কাজটা করলো তার তুলনা নেই। তাকে স্টেজে ওঠাবার পরে বোঝা গেলো এটা কিসের অনুষ্ঠান এবং কী সে বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণাই নেই। স্টেজে উঠেই সে ব্যানার খুঁজে বোঝার চেষ্টা করলো ব্যাপারটা কী। তারপর শুরু হলো সিডি ছেড়ে দিয়ে গানের সাথে ঠোঁট মেলানো! আমরা হতবাক! তাও যদি ঠোঁট মেলানোটা ঠিক মতো হতো! একবার তো সিডি এগিয়ে গিয়ে মিউজিকের আগেই হুট করে গান শুরু হয়ে গেলো। শাফিন তখন মাইক্রোফোন থেকে দূরে মিটিমিটি হাসছে সাথে মাথা দোলাচ্ছে। হঠাৎ গান শুরু হয়ে যাওয়ায় সে লাফ দিয়ে যেভাবে মাইক্রোফোন জাবড়ে ধরলো সেটা একটা সিনই ছিলো! আজকের সেরা বিনোদন!

২০ জুলাই ১০০৯

আজ একটা কাজ করে ফেললাম যেটা বৈদেশে কখনোই করার সুযোগ পাই নাই। সেটা হলো "ভাতঘুম"। দুপুরবেলা; এক গামলা ভাত, মাছের ঝোল, গোসত, ভর্তা আর আচার মাখিয়ে খেয়ে; এক গ্লাস ঠান্ডা জল গলায় ঢেলে; কাঁথা জড়িয়ে দে ঘুম। এরপর বিকেলে উঠে আয়েশি ভঙ্গিতে হেলতে-দুলতে মোড়ের দোকানে গিয়ে এক কাপ চা।
আহ!

২১ জুলাই ২০০৯

একটা জিনিস বেশ মজা পাচ্ছি। আমার সাথে অনেকেরই নতুন করে পরিচিত হতে হচ্ছে। অনেককেই আগে চিনতাম। অনেকদিনের যোগাযোগহীনতায় সেই পরিচিতিতে মরচে ধরেছে। মুখ চিনলেও আমাদের পরিচয় কিভাবে সেটা হঠাৎ মনে পড়ে না। আর পড়লেও দেখা যায় একে অন্যের নাম বেমালুম ভুলে বসেছি। আরেকটা জিনিস যেটা হয়, কোনো একটা ঘটনার প্রেক্ষিতে আমার ব্যক্তিত্ব অনুমানের চেষ্টা। হয়তো দেখা যাবে আমার সম্পর্কে কারো একটা ঘটনাই মনে আছে, সহজাত ভাবেই চেষ্টা করা হবে সেই ঘটনার থেকে আমাকে বুঝে নেয়ার। আরে ব্যাটা, এর মাঝে তো ভলগা-রাইনে কতো জলই বয়ে গেছে!

২২ জুলাই ২০০৯

আজ সূর্যগ্রহণ দেখলাম। খুব উত্তেজক!

আমি সকাল সাড়ে সাতটায় উঠে দেখি বাবা-মা ইতিমধ্যে পার্কে হাঁটতে চলে গেছেন। আমি বাসায় সহকারী ছেলেটাকে বলি এককাপ চা আনত। ছেলেটা অনেকদিন ধরে আছে। লেখাপড়া শেখানো হয়েছে। সবার পড়া শেষ হলে তাকে বেশ আয়েশ করে সংবাদপত্র পড়তে দেখা যায়। তাই আমার ধারণা ছিলো আজ যে সূর্যগ্রহণ সেটা সে জানে। ছাদে গিয়ে বুঝলাম সেই ধারণা ভুল। সংবাদপত্রে কী পড়ে কে জানে!

ক্যামেরার এলসিডি ডিসপ্লেতে দুইজনে সূর্যগ্রহণ দেখি। মেঘ অবশ্য খুব বিরক্ত করছিলো। অনেক ছাদেই উৎসাহী মানুষের দেখা পেলাম (আফসোস, কোনো মেয়েকে দেখলাম না!)। সূর্যগ্রহণের কিছু ছবিও চটপট তুলে ফেললাম। সূর্যগ্রহণ শেষে ছেলে আমাকে আচমকা জিজ্ঞাস করে, "ভাইয়া এইটা কি এখন থেইকা রোজ হইবো?" আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে থাকি। এরপরে একটা ইটের টুকরো নিয়ে ছাদের মেঝেতে ছবি এঁকে ব্যাপারটা বুঝাই। সে বেশ বুঝতে পেরেছে মনে হলো। ছেলেটাকে ছবি সহ কিছু সাধারণ জ্ঞানের বই কিনে দিতে হবে। এসব বেসিক জিনিস সবারই জানা থাকা দরকার।

Solar Eclipse 2009: The Unvailing of the Sun

বৈদেশ থেকে বলতে গেলে একবস্ত্রে এসেছি। একটা মোটে কাপড়ের তৈরি ব্যাগ ছিলো সাথে। এদিকে সামনে একটা বিয়ের অনুষ্ঠান আছে। টিশার্ট পড়ে তো আর যাওয়া যায় না। তাই বিকেলে কেনাকাটা করতে বেরিয়েছিলাম। কেনাকাটার মাঝেই পান্থের কল। জানা যায় সে আর শাহেনশাহ বসে আছে মহাখালি প্রিয়াঙ্গন শপিং মলের নিচে। আমি পাততাড়ি গুটিয়ে মহাখালি রওনা দেই। জানা যায় অতন্দ্র প্রহরী সদ্য এসেছে প্রাচ্যরাজ্য থেকে; এখন পরিকল্পনা তাকে নিয়ে কোথাও বসে চৈনিক দেশের কৃষ্টি ও রেয়াজের গল্প শোনা। আমরা মহাখালই থেকে রওনা দেই। মিরপুর অরিজিনাল ১০ এর এক রেস্তোরা কুইক বাইটে দেখা করার কথা। অতন্দ্র প্রহরী আমাদের আগেই উপস্থিত ছিলো। সেখানে চারজনের ধুম আড্ডা হয়। বেশ খানাদানাও হয়। জায়গাটা বেশ ভালোই মনে হলো, অনেক তরুণীই সখীদের নিয়ে খেতে-টেতে আসে। আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আবার যাবো!

এই নিয়ে প্রহরীর পোস্ট: একটি অমিমাংসিত রহস্যের গল্প

২৩ জুলাই ২০০৯

আজ তিনদফা আড্ডা।
বাবার সাথে বাইরে গিয়েছিলাম। তখন বন্ধুদের ফোন। ওরা আছে নর্থ সাউথের সামনে। একটু পরেই শাহেনশাহ-এর ফোন, সে আর এনকিদু আছে বনানীর ধারে কাছেই। বাবা যখন আমাকে নর্থ সাউথের সামনে নামিয়ে দিচ্ছে তখন আবার ফোন, আমার তিন পুরানা দোস্তরা আছে বনানীর স্টার কাবাবে। আমি নর্থ সাউথের সামনে চেনা-পরিচিত এবং বন্ধুদের সাথে এককাপ চা খাই। এটা দৈনন্দিন কাজ। এরপরে স্টার কাবাবে হাঁটা দেই। সেখানে থাকা তিন বন্ধুর দু'জনকে আসার পরেই দেখেছি, আরেকজনের সাথে দেখা হলো অ-নে-ক-দি-ন পরে। এখন সে আমার অন্য বন্ধুরই বাগদত্তা। খুব ভালো লেগেছে। ওদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে আরেক কাপ চা পান করতে করতে শাহেনশাহকে কল দেই। ও বলে, "আমরা স্টার কাবাবে।"
আমি চমকে চারপাশে তাকাই, "কয়তলায়?"
শাহেনশাহ বলে, "একতলায়।"
আমি ছিলাম দোতলায়। ওকে জানাই একটু পরেই নামছি। আড্ডা দিতে দিতে সময়জ্ঞান একটু বিস্মরণ হয়। আধা ঘণ্টা পরে তাই আবার শাহেনশাহর ফোন। আমি বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিচে নেমে যাই। ওখানে এনকিদু আর শাহেনশাহর সাথেও আড্ডা জমে যায়। সেই আড্ডায় আমার এক বন্ধুও কিছুক্ষণের জন্য যোগ দিয়ে যায়। স্টার কাবাবের পরে টঙ দোকানেও আমাদের পা পড়ে। আমাদের ম্যারাথন আড্ডা চলে অনেক রাত্তির পর্যন্ত।

২৪ জুলাই ২০০৯

ঢাকায় আসার পরে আমার খালাতো ভাইদেরকে তেমন সময় দিতে পারিনি। তাই আজ ওদের সাথে বের হয়েছিলাম। বাংলাদেশে আসলে আমি পশ্চিমা চেইন রেস্তোরায় খুব একটা খেতে চাইনা। তবে ওদের আগ্রহ আছে বলে গেলাম কেএফসি-তে। গুলশানের শাখাটা দেখলাম বেশ বড়। আর কর্মচারিরা মনে হয় ইংরেজি জানে, সেটা ঝালাই করে নেবার খুব চেষ্টা দেখলাম ওদের মাঝে। বাংলা প্রশ্নেরও ইংরেজি উত্তর।

এসব চেইন রেস্তোরার একটা জিনিস খেয়াল করেছি, দেশ অনুযায়ী মেনু আর স্বাদ পালটায়। তাই ভারতে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ভাজা হয় ভেজটেবল তেলে আর ম্যাকডোনাল্ডসে পাওয়া যায় মহারাজা বার্গার। এখানেও একই কাহিনী। মিল/কমবো যেগুলো পাওয়া যাচ্ছে তেমনটা ঠিক পশ্চিমা দেশে পাওয়া যায় না। একটু বেশি মশলাদার, আর মেনুতে সালাদ নেই বললেই চলে। এরপরে স্পোর্টস জোন আর ক্লাব জেলাটো হয়ে এক ভাইকে নামিয়ে দিয়ে আসি জাদুঘর মিলনায়তনে। সে এসএসসি-তে গোল্ডেন পেয়েছে, তার সংবর্ধনা আছে।

রাত্তিরে দু'টো দাওয়াত ছিলো। বিয়ে আর পঞ্চাশতম জন্মবার্ষিকীর। বিয়ের দাওয়াতে খেয়ে, জন্মদিনের দাওয়াতে গান-টান শুনে এরপরে বাসায় এলাম।

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ২৪ জুলাই ২০০৯

Saturday, July 18, 2009

ঢাকা থেকে ৭: শহর থেকে একটু দূরে

গতকাল গিয়েছিলাম মাস্টারবাড়ি। গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে পোড়াবাড়ির দিকে গেলে মাওনা বলে একটা জায়গা পড়ে। সেখান থেকে একটু দক্ষিণে হেঁটে যেতে হয়। ঢাকা থেকে খুব বেশি দূরে নয়; তবে গ্রামের গন্ধ পেতে হলে খুব বেশি দূরে কিন্তু যেতে হয় না। বাংলাদেশ এখনো গ্রামের দেশ। শহর থেকে গাড়িতে ঘন্টা-আধা ঘন্টা দূরত্বে গেলেই গ্রামে চলে যাওয়া যায়।

পুরোদমে ঢাকার সন্তান হলেও আমার সৌভাগ্য; যে এলাকাতে বড় হয়েছি সেখানে কিছুটা হলেও গ্রামের ছোঁয়া ছিলো। গোয়ালঘর ছিলো। কলাবাগান ছিলো। বাঁশঝাড় ছিলো। মাঠের পর মাঠ ধানি জমি ছিলো। বাঁশঝাড় থেকে কঞ্চি কেটে ছিপ বানিয়ে পুকুরে মাছ ধরতাম। ধানক্ষেতের আইল ধরে হেঁটে বেড়াতাম অনেক দুপুর। ঢাকার মধ্যে এমন জায়গা মনে হয় আর ছিলো না।

তবে গ্রাম বলতে যা বোঝায় তার স্বাদ পেতাম গ্রামেরবাড়িতে গেলে। যে গ্রামে আমার পরিবারের আদিবাস, সেখানে উঠোন পেরুলেই পদ্মা নদী। চারপাশে শিমুল, তেঁতুল, আম, আতা, বট, অশ্বথ, জলপাই, নিম, ডুমুর, ডালিম, আরো কতো নাম না জানা গাছ। নদীর ধারে বসে শুশুক গুনতাম। অসংখ্য শুশুক ছিলো তখন পদ্মায়। সন্ধ্যা হলেই শেয়ালের ঢাক শুনতাম। আর শ'য়ে শ'য়ে জোনাক পোকা আর আকাশ ভরা তারায় এক ঝিকমিকে বৈরাগ্য হতো রাত্তিরে। এখন ওসব আর কিছু না থাকলেও গ্রামের গন্ধটা রয়ে গেছে। গোবর, কাঁচা মাটি, ঘাস-ফসল আর মজা পুকুরের গন্ধ মিলে একটা আলাদা গন্ধ হয় গ্রামের। যে গন্ধ নাকে গেলে কেমন স্থবিরতা আসে মনে। হাঁটার গতি শ্লথ হয়। মনে হয় কিছু না করেও কোথাও বসে থাকতে পারবো ঘন্টার পর ঘন্টা। গতকাল মাস্টারবাড়িতে সেই গন্ধ পেলাম।

খুব ভালো লেগেছে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে চারপাশের মানুষকে দেখলাম। মসজিদের উঠোনে রোদ পোহাচ্ছে বেড়াল আর মাওলানা; লেইসফিতার ঝাঁকা ঘিরে দাঁড়িয়ে তরুনী মেয়ে আর বধূরা; মোড়ের চায়ের টঙে চলছে বাংলা সিনেমার গান; তেলমাখা চুলে সিঁথি কেটে চলছে সাইকেলে রেডিও বাঁধা যুবক; এফএম রেডিওর মতো মোবাইল ফোনটা কানের দুই ইঞ্চি কাছে ধরে স্পিকারে কথা বলছে পাওনাদার; কাঁঠাল গাছের নিচে বসে গুলতানি মারছে সদ্য স্কুল পাস করা যুবকেরা। সব গ্রামের মানুষের ছবি যেনো কম বেশি একই।

গাজিপুর শালবন রাস্তার দুই পাশে রেখে গেলেও সময়ের অভাবে আর নামা হয়নি। নামলে শালবনের কিছু ছবি নেয়া যেতো। ভাওয়াল রাজার প্রাসাদ এখন আদালদ বাড়ি। সেটাও দেখা হলো না। কতো কী দেখার বাকি রয়ে গেছে এই বাংলাদেশেই! বেশ ছবি তুলেছি; তার কিছু বরং দেখাই আপনাদেরকে।

© অমিত আহমেদ
প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ১৮ জুলাই ২০০৯

হাঁটা পথে ধরে...
The Trail

রক্ষীর মতো প্রহরায় দাঁড়িয়ে থাকে একসারি তালগাছ।
The Sentinels

এই কাঁটাময় গাছের নাম জানি না। আমলকির দেখতে মতো খুব টক এক ধরণের ফল হয়। স্থানীয় নাম - অড়-বড়ই। একটা পাখির বাসাও মনে হয় দেখা যায়!
Thorny Stem

আমাদের জাতীয় ফল। পুরো গ্রাম ভর্তি অসংখ্য কাঁঠাল গাছ, আর তার সবগুলোই ফলে ফলে ফলময়।
Jackfruit

অতিথির জন্য আছে গাছের মিষ্টি ডাবের পানি।
The Coconut Picker

মাটির ঘর। অনেকদিন পরে এতো উঁচু মাটির ঘর দেখলাম। এখন এখানে কেউ থাকেনা বলে তেমন রক্ষণাবেক্ষণ নেই।
The House of Clay

এমন সুন্দর জায়গাও আছে ঢাকার কাছে!
Bengali Countryside

Thursday, July 16, 2009

ঢাকা থেকে ৬: মাশীদাপুর জন্মদিন, ছিনতাই

এক

মাশীদ আপু আমার অত্যধিক প্রিয় একজন মানুষ। কারণটা খুব সহজ - উনার সাথে আমার মানসিকতা একদম মিলে যায়। এই মানসিকতা মেলানোর ব্যাপারটা কিন্তু খুব সহজ নয়, বিশেষ করে যখন সেটা আমাদের মতো হয়। আর তাই অবিরত এর-তার সাথে মিলিয়ে-মানিয়ে চলে হঠাৎ নিজের মতো আরেকজন বাঙালি খুঁজে পাওয়ার মধ্যে একটা ক্রিস্টোফার কলোম্বাসীয় আনন্দ আছে। মাশীদ আপুর সাথে পরিচিত হয়ে আমি সেই আনন্দ পাই।

মজার ব্যাপার হলো মাশীদাপুর সাথে পরিচয় না থাকলেও উনাকে আমি আগে প্রায়শই দেখতাম। বুয়েট কলোনীর যেই দালানে মাশীদ আপুরা থাকতেন সেই দালানের সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠলেই বন্ধু রঞ্জনের বাসা। কলেজ থেকে প্রায়ই ওর বাসায় চলে যেতাম। ওর মতো আরো অনেক নটরডেমিয়ানের বাসও ছিলো বুয়েট কলোনীতে। তাই আসা-যাওয়া কিংবা মাঠে বসে আড্ডা-ক্রিকেটের ফাঁকে মাশীদাপুকে অনেকবার দেখেছি। কিন্তু তখনো পরিচয় হয়নি। পরিচয় হলো সচলায়তন। এরপরে কুয়ালা লামপুরের রাস্তায় রাস্তায় দুই কাবিলের টো-টো চক্কর। মাশীদাপুর দেয়া শার্ট পরে আমার ফটোসেশন।

যখনই মন-টন খারাপ হয়েছে কিংবা কেউ কষ্ট দিয়েছে যখনই বিপদে পড়েছি কিংবা বড় কোনো ভুল করে ফেলেছি তখনই অনলাইনে মাশীদাপুকে খুঁজেছি। অনলাইনে পেলে মন অনেকটাই ভালো হয়ে গিয়েছে। কারণ জানি আর যে যাই বলুক না কেনো মাশীদাপু আমাকে বুঝে নেবেন ঠিক ঠিক। এই এটুকু মাত্র নিশ্চয়তার মূল্য যে কতো, সেটা আমি জানি। খুব ভালো করেই জানি।

শুভ জন্মদিন মাশীদ আপু!

দুই

আজ সারাদিন বাসায় বসে কাজ করেছি। স্কুলের কিছু কাজ সাথে করে নিয়ে এসেছি; উপায় নেই; কাজগুলো এগিয়ে রাখতেই হবে। বিকেলে মা'কে নিয়ে গিয়েছিলাম ছোট খালার বাসায়। খালা-খালু-মামা-মামী আর সব খালাতো-মামাতো ভাই-বোন মিলে মোটামুটি একটা পারিবারিক সম্মলেন হয়ে গেলো। এমন সম্মেলন আরো কয়েকটাই পাওনা হয়ে আছে।

তিন

ইদানিং একটা মজার জিনিস লক্ষ্য করি। সেটা হলো যাদের সাথে আড্ডা পেটাই তাদের বেশিরভাগের সাথেই তেমন খাতির ছিলো না ঢাকায় থাকাবস্থায়। অনেককে তো চিনতামই না। ফলে যা হয়, ওদের সাথে নতুন করে চেনা-পরিচয় করতে হয়। কেউবা কোনো পূর্ব ঘটনার প্রেক্ষিতে পুরো আমাকে যাচাই করে নেবার চেষ্টা করে। এই ব্যাপারটা একই সাথে মজার ও বিরক্তিকর। সেদিন যেমন একজন বললো, "তুই কানাডা যাবার আগে আমার সাথে একটা কোর্স নিয়েছিলি না? তুই তো হেভী সিরিয়াস স্টুডেন্ট ছিলি।"

আমি দেঁতো হাসি দেই। আমি প্রথম সেমিস্টারেই প্রবেশনের ঝামেলায় পড়েছিলাম। সিরিয়াস আমি কখনোই ছিলাম না।

চার

ঢাকার একটা জিনিস আমার ভালো লাগছে না, সেটা হলো রাত আটটার পরে পুরো শহর অন্ধকারে ঢেকে যায়। আগেও এমন ছিলো, স্ট্রিট-লাইট ছিলো না, থাকলেও কাজ করতো না। কিন্তু তখন রাস্তার দুই পাশ ঘিরে শপিং মল, ফ্যাশন হাউস, আর রকমারি দোকানপাট ছিলো। সেই আলোতে রাস্তা চলা যেতো। শহরটাকেও ঝকঝকে লাগতো। এখন সব আটটায় বন্ধ হয়ে যায় বলে সাড়ে আটটার দিকেই রাস্তায় মিশকালো হয়ে যায়।

বিদ্যুত সাশ্রয় হচ্ছে, সেটা ঠিক আছে, কিন্তু রাস্তা আলোর ব্যবস্থা তো করতে হবে। এভাবে পুরো শহর অন্ধকারে ঢেকে ফেলা তো কোনো কাজের কথা নয়। কিছু রাস্তায় এরশাদের আনা সোডিয়াম লাইট দেখতে পাই। সেই আলোতে নিজের হাতই ঠিক মতো দেখতে পারি না রাস্তা তো দূরের কথা। তাও যদি হতো আমাদের রাস্তা খানা-খন্দহীন মসৃন মখমলের মতো। আমাদের রাস্তায় একটু পর পর গর্ত, একটু পর পর ডোবার মতো জল জমে আছে, ম্যানহলেরও ঢাকনা নেই।

তার ওপরে আছে ছিনতাই। বন্ধু-বান্ধব যারা আছে তাদের সবারই একাধিকবার ছিনতাই হয়ে গেছে। যা বুঝলাম ছিনতাই এখন রোজকার ঘটনা। স্পটগুলোও মোটামুটি জানা। সেদিন বনানী ১১ থেকে ১৮ যাবো, সামান্যই পথ, তবু বন্ধুরা কিছুতেই একা হেঁটে যেতে দেবে না। ওরা আমাকে বলেও দিলো ঠিক কোথায় কোথায় আমি "ঠ্যাক" খেয়ে যাবো! রাস্তা আলোময় জমজমাট থাকাবস্থায় এই সমস্যাটা এতো প্রকট ছিলো না।

© অমিত আহমেদ

ব্যবহৃত ছবি: কুয়ালা লামপুর টুইন টাওয়ারের সামনে মাশীদ আপু ও আমি।
প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ১৬ জুলাই ২০০৯

Wednesday, July 15, 2009

ঢাকা থেকে ৫: আজকে না হয় ছবিই হোক

ধুন্ধুমার আড্ডা হলো আজ বিকেলে। কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিলো না। এনএসইউ-এর পুরানো দালানের সামনে একে একে কিভাবে যেনো সবাই হাজির হয়ে গেলো। জমজমাট আড্ডা শেষে; স্টার কাবাবে খাসির পায়া নান ফালুদা আর মালাই চা মেরে এই একটু আগে বাসায় ঢুকলাম।

আজ ক্যামেরার ডেটা কেবলও কিনেছি। কিনতে গিয়ে দাম জিজ্ঞেস করেছি, দোকানী বলে ২০০টাকা দেন। আমার কেনো জানি হাসি পেয়ে গেলো। খানিকক্ষণ হাঃ হাঃ করে হাসার পর আমি কিছু বলার আগেই দোকানী মুখ কালো করে বলে, ৮০টাকাই দেন ভাইয়া!

টঙ দোকানে আদা আর লেবু দিয়ে যে রঙ চা তৈরি হয় সেটা আমার খুব প্রিয়। আজ টঙের সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডা মারতে মারতে একের পর এক চা পান করেই যাচ্ছি। সব শেষে দেখা গেলো দেড় ঘন্টায় চা নিয়েছি মোট ৮টা!

আচ্ছা এখন বাদ্দেই। ছবি যেহেতু তুলেছি, ডাউনলোড যেহেতু করেছি, এবং ফ্লিকারে যেহেতু উঠিয়েছি - আজ বরং ছবি দিয়েই দিনলিপি শেষ করে দেই। কথা বলার সময় তো পড়েই আছে!

© অমিত আহমেদ

আমাদের আদি ও অকৃত্রিম রিক্সা। প্রবাসে এই বাহনটা মাঝে মাঝে খুব মিস করি। বিশেষ করে বৃষ্টি হয়ে যাবার পরে যখন ঝিরঝিরে একটা ঠান্ডা বাতাস বয়।
Cycle Rickshaw

জ্যামে পড়ে জীবন জেরবার। তবুও রাজপথে।
Bumper to Bumper

রাত নেমে আসার পর বনানী। গুলশান দুই গোলচত্ত্বর থেকে কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ ধরে হেঁটে যাবার পথে তোলা।
After 8:00pm

গুলশান-১ গোলচত্ত্বরে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা যদিও শেষে বৃষ্টি নামি নামি করেও আর নামেনি। ছবির ডান কোনায় দেখুন বিলবোর্ডে পেপসি হাতে আমাদের ক্রিকেট কাপ্তান মাশরাফি।
Gulshan-1

গুলশান-১ এর একটা টঙ দোকানে বসে তোলা। অফিস সবে ছুটি হয়েছে। ফেরার বাস ধরার আগে সহকর্মীদের সাথে ভাজা বাদাম আর চানা-বুটের সাথে গুলতানি।
After Work

আমাদের প্রিয় টঙ দোকান। লাল চা, দুধ চা, কলা-বনরুটি, কেক, বিস্কিট, রোল, টোস্ট, লাড্ডু কিংবা সিগ্রেট!
Tong [Teashop]

দালানের পর দালান উঠেছে ঢাকার প্রতি ইঞ্চি জুড়ে। তার ফাঁকে চৌকো আকাশ।
Sky Above

তারের জালে জালে যেনো মৃত্যুকুপ। প্রতি রাস্তার মোড়ে একই দৃশ্য।
Electric Jumble

আজ এ পর্যন্তই; ছবি তুলে পরে আরো পোস্টানো হবে।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ১৫ জুলাই ২০০৯

Tuesday, July 14, 2009

ঢাকা থেকে ৪: যানজট-আর-আড্ডা

এক

একটা সময় নর্থ সাউথ আমার দ্বিতীয় বাসা ছিলো। খুব বেশি দিন ছিলাম না অবশ্য; তবে যে ক'দিন ছিলাম আমাকে অবধারিত ভাবেই বিটিএ কিংবা এসপিযি দালানের সামনের টঙ দোকানগুলোতে পাওয়া যেতো। বন্ধু-বান্ধব যারা দেখা করতে আসতো তাদেরকে বলা থাকতো তারা যেনো এসে যে কোনো টঙে অথবা পিচ্চিদের কাছে আমার খোঁজ করে। ওরাই দেখিয়ে দিতো আমি কোথায় আছি।

এহেন আড্ডার কারণ ছিলো কয়েকটা। প্রথমত, আমার দোস্ত সমাজের বাস বনানী ঘিরে। ওদের সবাই এনএসইউ-তে না পড়লেও দুপুরের পর বেরিয়ে হেঁটে আড্ডায় চলে আসতো। দ্বিতীয়ত, আমি এনএসইউ-তে ঢুকেছিলাম এইচএসসি দেবার ঠিক পরেই। ফলাফল বেরুনোর আগে। নিয়েছিলাম মোটে একটা ক্রেডিট কোর্স। তাই হেলাফেলায় দিন কাটাতাম; ভাবতাম আগে ফলাফল বের হোক। আর সবশেষ ও প্রধান কারণ হলো - স্বভাব। আড্ডা রক্তে থাকলে আর কিসের কী!

বছর গড়িয়ে প্রবাসে এলাম, আর সেই আড্ডার সুর গেলো কেটে। বছর-দুই বছর বাদে দেশে আসি। সেই সুযোগে চেনাজানার সংখ্যা কমতে থাকলো। পুরানো অনেক বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ কমতে কমতে এমদম বন্ধই হয়ে গেলো। সবার সমাবর্তন হয়ে গেলো। নতুনদের কাউকেই তেমন আর চিনি না। সব মিলিয়ে বেঁচে থাকলো আড্ডার একটা ভঙ্গাংশ মাত্র। কিছু হার্ডকোর আড্ডাবাজ যারা বউ থাকলে বউকে মানিয়ে, চাকরি সেরে, সব ঝঞ্ঝা কাটিয়ে বিকেলে আড্ডায় আসবেই আসবে। এলাকার বন্ধুরা, যাদের বাসা এনএসইউ এর কাছে-পিঠে, আর কিছু জুনিয়র ছেলে-পেলে। বেশির ভাগ মেয়ে বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ নেই-ই বলা যায়। প্রায় সবাই বিয়ে করে ফেলেছে, আড্ডায় আর আসে না।

এবার এসে দেখি সেই ভঙ্গাংশও আর নেই। নর্থ সাউথ ক্যাম্পাস সরে গেছে বসুন্ধরায় আর পুরানো ক্যাম্পাসের দখল নিয়েছে নর্দান ইউনিভার্সিটি। অল্প ক'টা বাদে টঙ দোকানগুলোও আর নেই। তবু মাঝে মাঝে হাঁটতে হাঁটতে ওদিকে যাই। কখনো বন্ধুদেরকে নিয়েই যাই। মঞ্জুর দোকানটা এখনো আছে। এককাপ চা নেই। এনএসইউ এর ছাত্ররা তো আর এদিকে আসে না। আশে পাশের ভবনে যারা কাজ করে তারা আসে। তাদের মাঝে এনএসইউ এর কাউকে হঠাৎ পাওয়া যায়। কিরে সাব্বির! কেমন আছস? কবে আসছস? চা খাবি? সিগ্রেট? কথা শেষ হয়ে যায়। আমি চায়ে চুমুক দিতে দিতে খুব স্বার্থপরের মতো চিন্তা করি। ভাবি ভালোই হয়েছে। আমার আড্ডা তো এমনিতেই মরে গেছে। এখানে অন্য আড্ডা আর না থাকলেই বা কী?

দুই

এখানে ক্ষমা চেয়ে রাখি, ক্যামেরার ডেটা কেবল এখনো কিনতে পারিনি! আজ বিকেলে কিনতেই বেরিয়েছিলাম। মা কিছু জিনিস কিনতে দিয়েছিলেন সেগুলো প্রথমে কিনলাম। জিনিসপত্রের দাম যে কী পরিমান বেড়েছে সেটাও হাতে-কলমে দেখলাম। খাবার-আনাজ-কাপড়-প্রসাধন-সিগারেট সব কিছুরই দাম বেড়েছে। মানুষ এই বাজারে কিভাবে যে সংসার চালাচ্ছে সেটাই একটা বিস্ময়! যাই হোক, গুলশান ১ থেকে মা'র জিনিসপত্র কিনে গাড়িতে গুলশান ২ এ যাবো। সামান্য পথ, এটুকু যেতে প্রায় এক ঘন্টার মতো লেগে গেলো! এর মাঝে আটটা বেজে সব দোকান বন্ধ। এই জিনিসটা আগে এতো কঠিন ভাবে কাউকে মানতে দেখিনি। এখন দেখি আটটা বাজলেই সব দোকানের শাটার নেমে যায়। একদিক থেকে ভালো এটা।

জ্যামের কারণে নানান সমস্যায় পড়ছি। আমাদের ড্রাইভার সাহেবও খুব ভালো বলতে পারেন না কোন রাস্তায় কখন জ্যাম থাকার সম্ভাবনা। কোথাও যাবো ঠিক করে বেরিয়ে দেখা যায় সময়ে আর কুলাচ্ছে না। রাস্তা বদলে অন্য কাজে রওনা হতে হচ্ছে। বললে হাস্যকর শোনাবে হয়তো, তবে ঢাকার এই জিনিসটা আমি এক রকম মিস-ই করতাম।

তিন

বাসায় খেতে খেতে এ ক'দিনের মধ্যেই ওজন বাড়িয়ে ফেলেছি। মা মনে হয় এই একমাসে পুরো বছরের খাবার খাইয়ে দিতে চান। সাথে চাচী-খালারাও যোগ দেন। সবার এক কথা, ওখানে কী না কী খাস! সব সময় না-ও বলতে পারি না। কষ্ট করে কেবল আমার জন্যই তৈরি করেছেন। নিয়ম ধরে সবার সাথে দেখা করতে হচ্ছে, কিংবা ফোন করতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছু আত্মীয় বাসায় আমাকে কল করে না পেয়ে, পরে আমি কল করিনি বলে, কিংবা এখনো বাসায় যাইনি বলে অভিমান করে আছেন। আগামীকাল আবার ফোন নিয়ে বসতে হবে। আর পরে বাসায় দাওয়াতে তো যেতে হবেই।

চার

বাংলাদেশর টেস্ট জেতা নিয়ে তেমন কোনো উল্লাস দেখলাম না কারো মাঝে। সবাই খুশি হলেও বলছে, এটা তো হবারই কথা ছিলো। এদিকে গাড়িতে এফএম রেড়িও জকিদের কথা শুনে আমি বিশাল টাশকি খেয়ে আছি। ব্যাপারটা কী আমি এখনো ঠিক সাইজ করতে পারছি না। এমন উচ্চারণের কারণ কী? কোনো কিছুই কারণ ছাড়া হয় না। এমন উচ্চারণ কি এখন কুলনেস ফ্যাক্টর হয়ে গেছে? নাকি যাদের কাছ থেকে ট্রেনিং নিয়েছে তারা এমন অথর্ব বাংলা শিখিয়েছে? কে যেনো একজন বললো রেডিও জকিদের চেহারাটা নাকি একটা ফ্যাক্টর। এটা শুনেও টাশকি খেয়েছি। রেডিও জকিদের কন্ঠ যাচাই না করে চেহারা যাচাই করতে হবে কেনো? তবে এটা শোনার পরে ইচ্ছে হয়েছে কোনো মেয়ে জকির সাথে দেখা করতে। কেউ চেনেন নাকি কাউকে?

© অমিত আহমেদ
প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ১৪ জুলাই ২০০৯

Monday, July 13, 2009

ঢাকা থেকে ৩: দিনান্ত ভালো থাকা

এক

গতকাল ছিলো জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে সঙ্গীতানুষ্ঠান। মুক্তিযোদ্ধা এস এম খালেদ-এর চিকিৎসার্থে অর্থ সংগ্রহের অনেক উদ্যোগের একটি হিসেবে। জাদুঘরের সামনে যেতেই বাহিরে লোহার দেয়ালে ছোট পোস্টার দেখতে পাই। "যিনি লড়েছেন দেশের জন্য আমরা লড়ছি তাঁর জন্য।"

জানতাম ভেতরে ঢুকলেই অনেক ব্লগারের সাথে প্রথমবারের মতো দেখা হবে। এই অভিজ্ঞতার একটা আলাদা আবেদন আছে। তাই একটু সময় নিয়েই, সবাইকে আসার সুযোগ করে দিয়ে ভেতরে যাই। কাউকে ফেসবুকে কিংবা সচলে দেখা ছবির মাধ্যমে চিনে ফেলি, কেউবা আমাকেই চিনে নেয়। প্রথমবারের মতো দেখা হয় এনকিদু, রণদীপম'দা, শাহেনশাহ সিমন, আকতার আহমেদ, পান্থ রহমান রেজা, আনিস মাহমুদ, মুস্তাফিজ ভাই, নিবিড়, আর তারেকের সাথে (কারো নাম কি বাদ পড়ে গেলো?)। একটা জিনিসটা খুব উপভোগ করি। চেনা ব্লগারদের সাথে দেখা হলে কখনো মনে হয় না প্রথম দেখা হলো। বরং মনে হয় অনেকদিন পরে চেনা কাউকে আবার দেখলাম। আড্ডার তালও খুব একটা কাটে না। সঙ্গীতানুষ্ঠানে ব্লগার আরো অনেকেই ছিলেন। টুটুল ভাই, লীলেন ভাই, বিপ্লব'দা, আর সবজান্তার সাথে পরিচয় হয়েছিলো গতবারের বইমেলায় আর সচলাড্ডায়। আরিফ ভাইকে তো সেই কবে থেকেই চিনি। আর নজরুল ভাই এর সাথে দেখা হয়েছিলো ঠিক তার আগের দিনের আড্ডায়।

সঙ্গীতানুষ্ঠান ছিলো খুব পরিপাটি। ছিমছাম পরিবেশনা। অনুষ্ঠান শুরু হয় গাজী আব্দুল হাকিমের বাঁশি দিয়ে। ভদ্রলোক অসাধারণ বাজান! এরপরে একে একে আসেন লীনা তাপসী, শাম্মী আকতার, খুরশীদ আলম, লিলি ইসলাম, শামসুল হুদা, ফাহিম হোসেন, সজীব, আর সবশেষে কৃষ্ণকলি ইসলাম। আব্দুর নূর তুষারের উপস্থাপনা মন্দ ছিলো না। দর্শক উপস্থিতি হয়তো বেশি ছিলো না; কিন্তু যাঁরা ছিলেন তাঁরা যে মুক্তিযোদ্ধার প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা নিয়েই ছিলেন তা স্পষ্ট বোঝা গেছে তাঁদের দৃষ্টিতে।

দুই

গতকাল সঙ্গীতানুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে দেখলাম কারওয়ান বাজারের হাঁটাপথ জুড়ে অসংখ্য মানুষ। ঝাঁকা ফেলে শুয়ে; বিক্রি হবার অপেক্ষায়। হঠাৎ হয়তো থামবে কোনো ট্রাক। তুলে নেবে চার কিংবা পাঁচজনকে। আর তাদের শ্রমে রুটি উঠবে পনেরো কিংবা তারও বেশি মুখে। কারওয়ান বাজার নিয়ে কারুবাসনা একটা পোস্ট দিয়েছিলেন। সেই পোস্টটা মনে পড়ে।

তিন

আজকের দিনটা প্রায় সারাদিন ছিলাম বাবার সাথে। সকালে উঠে কাজ করতে বসেছিলাম। সাথে করে কিছু কাজ নিয়ে এসেছি; সেগুলো ঢাকায় বসেই করে ফেলতে হবে। কাজের মাঝে দুম করে স্ক্রিন কালো হয়ে গেলো। নাড়াচাড়া করে বুঝলাম অন্য কোনো সমস্যা নেই, বিদ্যুৎ চলে গেছে! কাজ যা করেছিলাম সব গচ্চা গেলো সেভ করে না রাখার কারণে। এখন থেকে ল্যাপটপের ব্যাটারি আর খোলা যাবে না।

এই হুজ্জতের পরে আর কাজ করতে ইচ্ছে করলো না। বাবার সাথে অফিসে গেলাম। কোনো নির্দিষ্ট কারণ নেই, কেবলই বাবাকে সঙ্গ দেয়া। ফ্যামিলি ফার্স্ট!

চার

বেশ কিছু ছবি তুলেছি। কিছু পোস্টের সাথে তুলে দেবার ইচ্ছে ছিলো; কিন্তু ডেটা কেবল সাথে আনতে ভুলে যাওয়ায় আর সম্ভব হলো না। আগামীকাল নতুন কেবল কিনে কিছু ছবি অবশ্যই তুলে দেবো।

© অমিত আহমেদ
প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ১৩ জুলাই ২০০৯

Sunday, July 12, 2009

ঢাকা থেকে ২: হ্যালো ঢাকা

এক

প্রচন্ড গরম। যাকেই এ কথা বলি সেই খ্যা-খ্যা করে হাসে। বলে, "মামা, আর কদ্দিন আগে আইলে গরম কী ও কতো প্রকার বুঝতা!" আমার বোঝার তেমন আগ্রহ হয় না। এমনিতেই বাইরে গেলে জামা ঘামে ভিজে শরীরে লেপ্টে থাকে; শরীর চিটচিটে হয়ে আসে।

গতবছর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা এসেছিলাম। এই দেড় বছরে ঢাকার চকচকে ভাবটা কেমন যেনো মলিন হয়ে গেছে বলে মনে হয়। রাস্তা-ঘাট ভাঙা। দেয়াল ভর্তি আজে বাজে বিজ্ঞাপন। হাঁটা রাস্তাজুড়ে আবর্জনা। যাওয়া আসার পথে নতুন দেখি নতুন বস্তি গজিয়ে উঠেছে। রাস্তার ধারে গৃহহীন মানুষ, ট্রাফিক স্যিগন্যালের মোড়ে মোড়ে অসংখ্য ভিক্ষুক। মনটা খারাপ হয়ে যায়। এটাই আসলে ঢাকার আসল চিত্র। জোর করে ভাসমান মানুষ-ভিক্ষুক তাড়িয়ে, ঝলমলে আলোতে-বিজ্ঞাপনে এতোদিন যেনো চাপা দেয়া ছিলো সব। এখন সব-সবাই আবার বেরিয়ে এসেছে।

ঢাকায় চোখে পড়ে ধর্মের বাহ্যিক প্রদর্শন। গতবারেও এটা খেয়াল করেছিলাম। বাড়ছে টুপি-দাঁড়ি আর বোরকা পরা মানুষের সংখ্যা। বাড়ছে অ্যাপার্টমেন্টের সংখ্যাও। বনানীতে আমাদের বাসার আশে-পাশের অনেক একতলা দালান দেখি আর নেই। সব বিল্ডারদের হাতে চলে গেছে; ওরা সুউচ্চ দালান বানাচ্ছে পুরনো দালান গুঁড়িয়ে। বেড়েছে রেস্তোরার সংখ্যা। যেদিকে তাকাই শুধু রেস্তোরা। কোনোটা দেশি, কোনোটা বিদেশী, কোনোটা আবার ফাস্টফুড বেচে। দামের মধ্যেও এতো ফারাক। কোথাও একবেলা খেতে লাগে পঞ্চাশ টাকা, কোথাও পাঁচশো। এসবের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দেয় বেনিয়াদের কেএফসি, পিৎসা হাট, এ-এন-ডব্লিউ। সেখানেও অগুনতি মানুষের ভিড়।

আরিফ-টুটুল-নজরুল-মেসবাহ-রাসেল ভাইরা ওখানে ছিলেন। চা-সিগারেট-কফির সাথে নিছক আড্ডা। শপিং মলে ঢোকার পথে আমি কেমন দিশেহারা হয়ে যাই। এতো মানুষ! আমার বসুন্ধরাকে মৌচাকের মতো মনে হয়। সেই চাক ঘিরে অগুনতি মানুষরূপী মৌমাছির ভিড়। এতো মানুষের উচ্ছ্বাস, আনন্দ, কেনাকাটা দেখে আমার মনে হয় না এই দেশে এতো অভাব আছে। মনে হয় না এক ধাপ নেমে এলেই আমাকে ঘিরে ধরবে অভাবী মানুষের সাহায্যপ্রার্থী হাত। লিফট ধরে ফুডকোর্টে গিয়ে আবারো চমকে যাই। প্লেটে প্লেটে চিকেন ফ্রাই, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, নুডল, শওরমা, বার্গার... কে বলবে দেশে খাদ্যাভাব?

দুই

গতকাল তাঁত বস্ত্রমেলা থেকেও ঘুরে এলাম। মানিক মিয়া এভিনিউ এর বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউট প্রাঙ্গনে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উদ্যোগে চলছে এই মেলা। ঘুরে ঘুরে দেখি। তাঁতের শাড়ি, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, বিছানার চাদর, হস্তশিল্প, সবই আছে। অনেক বিদেশিনিকে দেখলাম। তাদের চোখে মুখে গুপ্তধন আবিষ্কারের আলো! তবে ব্যবস্থাপনা খুব ভালো মনে হলো না। ক্রমাগত স্পিকারে বালামের সিডি বাজছে। প্রবেশ পথের ঠিক পাশে আবার কোথা থেকে যেনো একটা কুৎসিত দর্শন ভাঙা তাঁত এনে ফেলে রাখা হয়েছে। দেখলেই অস্বস্থি লাগে। বাতাস চলাচলের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। এই গরমে একটু পর পর তেষ্টা পায়। সেটা নিবারণেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। তাঁত বস্ত্রের সাথে কিছু স্টলে দেখলাম চিপস, মধু, হাড়ি-পাতিল, ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে। হোক। এতেও যদি বোর্ড কিছু টাকা পায়।

ঘুরে বুঝলাম যতোই "ফিক্সড প্রাইস" লেখা থাকুক না কেনো দরদাম না করলে ঠকতে হবে। ইচ্ছে মতো দাম লেখা। খানিক ঘুরে গরমের ঠেলা সামলাতে বাইরে এসে পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাই। পাটের চাহিদা বাড়ছে সারা পৃথিবী জুড়ে। আর সেই পাটকল একের পর এক বন্ধ করে দিলাম আমরা। এখন দেশে পাটশিল্পের যে অবস্থা আর পাট চাষের যে তরিকা তাতে খুব আশাবাদী হতে পারি না। ভারতের একচেটিয়া বানিজ্য দেখেই আমাদের দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে যেতে হবে। দ্য গোল্ডেন ফাইবার অব বাংলাদেশ!

তিন

এবার দেশে এসেছি একটা তালিকা নিয়ে। অল্প সময়ের জন্য দেশে আসি। দেখা যায় আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধবদের সময় দিতেই সময় শেষ হয়ে যায়। আট/নয় বছর ধরে যে কাজগুলো না করতে পেরে প্রবাসে বসে আফসোস করি সেগুলো আর করা হয় না। কতো দিন শাঁখারীবাজারের দিকে যাই না; অনেকদিনের ইচ্ছে ওখানে গিয়ে কিছু ছবি তুলবো! নটরডেমে পড়াবস্থায় ব্যবহারিকের দিনগুলোতে একটা রেস্তোরায় দুপুরে ডাল-ভাত-গরু/মাছ কিংবা বিরিয়ানী খেতাম। সেই রেস্তোরায় খাই না নয় বছর। কতো বছর নিউমার্কেটে যাই না। জানি এবারও তালিকার সব করা হবে না। তবু যদ্দুর যা করা যায়। প্রবাসীদের তো এমনই জীবন।

ইদানিং দেশে এসে নতুন অনেকের সাথে পরিচিত হয়েই আর আলাপের বিষয় খুঁজে পাই না। অনেকেরই আলোচনার বস্তু, ভাবনা ম্লেছ মনে হয়; অজ্ঞানতা মনে হয়। হয়তো আমিই বদলে গেছি। ছেলেবেলার বন্ধুদের সাথে এই সমস্যা খুব একটা হয় না। তাই ওদের সাথেই সময় কাটে বেশি। সুযোগ পেলেই নানান রেস্তোরায় আড্ডা মারি। স্টার কাবাবে যাই। রুমালী রুটির সাথে গ্লাসসি খাই। বলি, "দোস্ত কিছু করা দরকার। কি করা যায় বলতো?" এলিফ্যান্ট রোড়ে যাই জুতো দেখতে। সেই ফাঁকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি খাই। চানাচুর খাই। পেয়াজু, আলুর চপ খাই। যা পাই তাই খাই। যা পাই তাই কিনি। প্রবাসীরা সাধারণত যা করে থাকেন।

মিলিয়ে-ঝুলিয়ে সব, মন্দ লাগে না। বরং ভালো লাগা একটা কিছু বুকের মাঝে জট পাকিয়ে থাকে। শত হলেও তো বাংলাদেশ! আমার বাংলাদেশ!!

© অমিত আহমেদ

আগামীকাল "অ্যা মিউজিক্যাল ইভনিং ফর অ্যা ফ্রিডম ফাইটার" নিয়ে দু'কলম লেখা থাকবে।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ১২ জুলাই ২০০৯

Saturday, July 11, 2009

ঢাকা থেকে ১: দ্বীনিয়াত যাত্রাপথে

আমার রুট ছিলো টরন্টো-আবু ধাবি-ঢাকা। টরন্টো থেকে যারা ইত্তিহাদে করে বাংলাদেশ পাকিস্তান কিংবা ভারত যাবেন তাদের সবাইকেই আগে এই প্লেনে আবু ধাবি যেতে হয়; সেখান থেকে ভিন্ন প্লেনে যে যার পথে। সেই টরন্টো টু আবু ধাবির পথে আমার সঙ্গী হলেন জনৈক পাকিস্তানী।

বোইং এর দুই পাশের জানালা ধরে দু'টো করে আসন, আর প্লেনের শিরদাঁড়া বরাবর তিনটি। মাঝের আসনের একদম বামে বসেছি আমি। মাঝের আসনে একটু পরে এসে বসলেন জনৈক পাকিস্তানী। বেশ মিশুক মনে হলো। সিটে বসতে না বসতেই আমার সাথে আলাপ জমানোর চেষ্টা করলেন। নিজের নাম, কোথায় কাজ করেন, কতদিন পরে পাকিস্তানে যাচ্ছেন, বউ-বাচ্চা কে কে আছেন তার সবই আমার জানা হয়ে গেলো। প্লেনে ওঠার আগ পর্যন্ত ল্যাবে কাজ করেছি। দু’টো মিটিং ছিলো। ল্যাব-বাসা যাওয়া আসা করে প্রচন্ড ক্লান্ত ছিলাম। হুদা আলাপের কোনো ইচ্ছে ছিলো না। উনি সেটা বুঝতে পেরেই মনে হয় চুপ হয়ে গেলেন; আমাকে আর তেমন ঘাঁটালেন না। পাকি ভদ্রলোক খুব নামাযী দেখলাম। প্লেনের সিটে বসেই একদফা নামায পড়ে নিলেন।

একটু পরেই একদম ডান পাশে পাকি ভদ্রলোকের পাশের সিটে এসে বসলেন শ্যামবর্ণ-শ্মশ্রুমন্ডিত-জোব্বা পরিহিত জনৈক ভদ্রলোক। উনি কে ছিলেন তখনো জানি না, তবে বুঝলাম মস্ত কেউ হবেন। কারণ তাকে দেখেই পাকি ভদ্রলোক খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। ব্রাদার-ব্রাদার বলে একাকার করলেন। আমি ওদের দু'জনকে আলাপে রেখে একটা মিনি ঘুম দিয়ে নিলাম।

ঘুম থেকে উঠে দেখি দু'জনে ধর্ম নিয়ে জোর আলাপ চলছে। বিষয় শিয়া-সুন্নি। তাদের আলাপে জানতে পারলাম জোব্বা পরা ভদ্রলোক সুন্নির সৈনিক আর পাকি ভদ্রলোক শিয়ার। মন দিয়ে আলাপ শুনলাম। বেশির ভাগ বিষয়েই দ্বিমত। কেউ কোনো হাদিসের রেফারেন্স দিলেই দেখি অন্যজন আঙুল তুলে বলে দেন সেটা ভুয়া হাদিস। তবে একটি বিষয়ে দু'জনকেই মোটামুটি একমত হতে দেখলাম সেটা হলো সালমান রুশদীর মৃত্যুদন্ড দেয়া দরকার। আমি এই ফাঁকে একটা প্রশ্ন করে বসলাম। এই যে মুসলিম উম্মাহ একটু কিছু হলেই মৃত্যুদন্ড দিতে চায় এটার ব্যাপার্টা কী?

বোঝা গেলো এই প্রশ্ন তাদের কারুরই পছন্দ হয় নাই। এমনিতেও মনে হয় তারা আমার উপর খুব একটা সন্তষ্ট ছিলেন না ডিনারে রেড ওয়ান সেবন করায়। যাই হোক, তারা আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন রাজনীতির ষড়যন্ত্র ইত্যাদির কথা বলে। সাথে অনেক সম্পুরক কথাও বললেন। ইসলাম নাকি সমস্যার সমাধান করে মূল থেকে। অপরাধ হলে সেই অপরাধ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হবে। চুরি করলে যে হাত কেটে ফেলার বিধান আছে তা আছে দৃষ্টান্ত তৈরি করার জন্য। আমার কাছে যুক্তি তেমন যুতসই না লাগায় জিজ্ঞেস করলাম, হাত কেটে ফেললে কি অপরাধের মূল উৎপাটন হয়? এর চেয়ে চুরির কারণটা জেনে সেটা সারাই করলেই কি ভালো না? তারা তখন যাকাত নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। ইসলামে অন্য পন্থাও আছে। তারা বললেন। আমি শুনলাম। তর্কে যোগ দিতে হচ্ছে হলো না আর। শুনতে শুনতে একদফা ঘুমিয়েও নিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি তাদের আলাপ-তর্ক চলছেই।

পরে আবু ধাবিতে স্মোকিং রুমে আমাকে পাকড়াও করলেন এক বাঙালি। উনার মাধ্যমে জানতে পারলাম আমি কী চরম সৌভাগ্যবান। আমার পাশের জোব্বা পরিহিত ভদ্রলোক নাকি ছিলেন পিস টিভির স্টার বক্তা ড: আবু বিলাল। বাঙালি ভদ্রলোক খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার সাথে তো অনেক আলাপ হলো শুনলাম। বিজনেস কার্ড-টার্ড দেয় নাই আপনাকে? দেখি?" তার কথায় বুঝলাম আশে পাশের সব বাঙালি-পাকি-ভারতীয়দের কান ছিলো এই আড্ডায়। তবে বাঙালি ভদ্রলোককে হতাশ করতেই হয়; "আমার সাথে নয়। উনি আসলে আলাপ করছিলেন পাকি ভদ্রলোকের সাথে।"

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ১১ জুলাই ২০০৯

Wednesday, July 01, 2009

অতিরঞ্জিত উইন্ডজর ভ্রমনাংশ

কফির কেচ্ছা
প্রথমদিন আমি খুব স্নেহ নিয়ে বললাম, "বলতো ভাইয়া, এখন কে আমার জন্য কফি বানাবে?"
কিংকং ও বিপ্র একসাথে হাত তুলে বেশ উত্তেজনা নিয়ে, "এই যে ভাইয়া। আমি... আমি!!"
দ্বিতীয়দিন, "বলতো ভাইয়া, এখন কে কফি বানাবে?"
বিপ্র খুব অনিচ্ছা নিয়ে, "আচ্ছা আমিই বানাই!"
তৃতীয়দিন আবার, "বলতো ভাইয়া, এখন কে আমার জন্য কফি বানাবে?"
কিংকং ও বিপ্র একসাথে, "আপনিই বানান। আর আমাদের জন্যও দুই কাপ আইনেন।"

ঘুম ঘুম কেনো আজ আমার?
দ্বিতীয়দিনেও কিংকং এর ঘুম ভাঙানো যাচ্ছে না। সবাই গিয়ে চেষ্টা করে এসেছে। আমাদের ব্যর্থতা দেখে শিমুল খুব কষ্ট করে অনেক সময় নিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। আড়মোড়া ভেঙে বলে, "এসব কাজ হলো আসল বড় ভাইয়ের বুঝলা? এক্ষণি ওকে নিয়ে আসতেছি। দেখে শেখো এইসব।" পাশের কামরা থেকে হঠাৎ শিমুলের জলদ কন্ঠ শুনে আমরা সবাই চমকে যাই, "কিংকং! আরে এই কিংকং। আরে দুপুর হয়ে গেছে তো। সবাই তৈয়ার হয়ে বসে আছে। ওঠো ওঠো..." একটু পরে শিমুল এসে মন খারাপ গলায় বলে, "কিংকং মনে হয় মাইন্ড করে বসলো বুঝলা। ঘুমের মাঝে হঠাৎ আমি গিয়ে চিৎকার দিয়েছি। সে গেছে চমকে..."

হালিম আর হালুম
প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই সকালে নাস্তা দিচ্ছেন। আমি শিমুল আর বিপ্র বসেছি। কিংকংকে তখনো ঘুম থেকে ওঠানো যায়নি। আমরা নাস্তা করছি। এর ফাঁকে দেখি প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই কি খুটখাট করছেন। শিমুল জিগায়, "পিপি'দা কী করেন?"
"এই হালিম করেছিলাম তো তোমাদের জন্য, সেটা গরম করছি।"
শিমুল উত্তেজিত হয়ে, "আরে না না। রাখেন তো। এখন লাগবে না। কেনো এতো ঝামেলা করেন? এমনিতেই তো অনেক নাস্তা করেছি।"
বিপ্র, "ঠিকই ভাইয়া। আমরা বরং পরে হালিম খাই। রাত্রে ফিরে।"
আমি, "ওস্তাদ, আপনি গরম করেন তো। গরম করেন। ওদের দরকার নাই। আমি খাবো।"
আমার কথায় শিমুল ও বিপ্র খুব আপত্তি জানায়।

পাঁচ মিনিট পরে দেখা যায় বিপ্র খুব আগ্রহ নিয়ে হালিমের জন্য পেয়াজ ভাঁজছে। আর শিমুল একাই তিন বাটি হালিম সাঁটাচ্ছে।

শিখবা নাকি ক্যামেরাবাজী?
প্রথম দিন একসাথে সবাই বসে আছি। প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই দুম করে বের করেন তাঁর ক্যামেরা। নীল তিমির মতো আকার। অ্যানাকোন্ডার মতো লেন্স। নানান রকমের তার-সূতা। তাঁকে দেখে কিংকংও আর দেরি করে না। বের করে ওর হাঙর সদৃশ ক্যামেরা। হাতির শুঁড়ের মতো লেন্স। শিমুল-বিপ্রও বসে থাকে না। ওয়েস্টার্ন সিনেমার মতো নায়কদের মতো এখন ওখান থেকে হুট-হাট দামী ডিজিটাল ক্যামেরা বের হয়ে যায়। অপটিকাল লেন্স ওঠানামার হিশহিশে আওয়াজ শোনা যায়। এবার সবাই আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি শুকনা গলায় বলি, "আমি বুঝলেন আগে একটু হাত পাকিয়ে তারপরে কেনায় বিশ্বাস করি। মানে অনেক দাম তো... আর ধরেন..."

বিপ্র, ভাইয়া...
ফেরির ছাদে বসে আড্ডা মারছি সবাই। শিমুল পাড়ার মাস্তান বড় ভাইয়ের মতো লোহার বেঞ্চে পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে আছে। বিপ্র কথা বলে কম। চুপচাপ বসে শোনে শুধু। তো হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে শিমুল খুব পাটে জিজ্ঞেস করে, "কী বিপ্র ভাইয়া? সব ভালো তো?"

ভিনাস ফ্লাইট্র্যাপ
দ্বীপে গিয়েই আমি আর কিংকং সাইকেল ভাড়া করে নিলাম। এরপরে সারা দ্বীপে, জঙ্গলে চরকিবাজী। এর মাঝে একটা জংলা ফুল দেখে আমি সাইকেল থামাই। উত্তেজনা নিয়ে বলি, "কিংকং, এটা ভিনাস ফ্ল্যাইট্রাপ না? দেখছো?"
কিংকং খুব উত্তেজনা নিয়ে ওর ক্যামেরা বের করে, "কই ভাইয়া? কই?"
আমি আঙুল তুলে একটা জংলা গাছ ভর্তি ফুল দেখাই। ফুল ধরতে গেলে কিংকং সতর্ক গলায় বলে, "দেইখেন আঙুল খায়া ফেলবে আবার!" আমি ভয়ার্ত ভাবে হাত সরিয়ে নেই। অসংখ্য ছবি তোলা হয়।
কিংকং মুগ্ধ গলায় বলে, "চিনলেন ক্যামনে?"
আমি খুব পাট নিয়ে বলি, "শুধু সাইকেল চালাইলে হবে? চোখ-কানও খোলা রাখতে হয় বুঝলা!"

পরে প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই মারফত জানা যাই উহা ভিনাস ফ্ল্যাইট্র্যাপের ধারে কাছের কোনো বংশ না।

সিকিউরিটি
প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই আমাদের আগেই ইমেইল করে তাঁর রাউটারের সিকিউরিটি কী দিয়ে দিয়েছিলেন যাতে তাঁর বাসায় গিয়েই আমরা পুরোদমে ব্লগিং করতে পারি। কিন্তু বাসায় পৌঁছে দেখা গেলো সেটা কেউই সেভ করে নাই। আমি সবাইকে খুব ঝাড়ি দেই, "এসব কী? এটা কোনো কথা? প্রকৃতিপ্রেমিক ভাই ইমেইল তো একটা কারণে করেছিলেন নাকি?" সবাই মন খারাপ করে। কিংকং-এর লিখে দেয়া একটা কাগজের টুকরো দেখে বিমর্ষ মুখে ল্যাপটপে কী টোকে। ওদের শেষ হলে আমি আমার ল্যাপটপ চালু করে মিহি গলায় ডাকি, "হেই শিমুল। কাগজটা একটু এদিকে পাস করো তো!"

মেনেছি গো, হার মেনেছি
দ্বিতীয় দিনে ধুম আড্ডা হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে শিমুলের ঘুম পেয়েছে। আবার আড্ডাও ছাড়তে পারছে না। তাই সে খুব মমতা দেখিয়ে বলে, "বিপ্র ভাইয়া, ঘুম পেয়েছে? না?" বিপ্র সেই কথায় কানই দেয় না। শিমুল আবার বলে, “কিংকং, যাও ভাই। ঘুমিয়ে পড়ো। কালকে সকালে উঠে শহর ঘুরতে বেরুবো না?” কিংকং মনে হয় খেয়ালও করে না। শিমুল আমাকে বলে, “বুঝলা অমিত, সারাদিন দ্বীপে ঘুরে সবাই খুব ক্লান্ত। ঘুম দিলে কালকের জন্য একদম ফ্রেশ হয়ে যাবো সবাই।” আমি শিমুলের কথায় কান না দিয়ে কিংকং এর বলা কোনো কৌতুকে খ্যাখ্যা করে হাসি। একটু পরে দেখা যায় ব্যর্থ চেষ্টা ভঙ্গ দিয়ে শিমুল আড্ডার মাঝেই উলটো হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

আমি বাংলায় কথা
বাসে উঠে আমি আর কিংকং বাসের সবাইকে নিয়ে গবেষণা শুরু করি। ব্লগ ব্যক্তিগত জীবন চিন্তা চেতনা নিয়েও কথা হয়। কেউ যেনো বুঝতে না পারে এজন্য আমরা খুব সতর্ক ভাবে বাছাই বাংলা শব্দেই কেবল আলাপ সারি। তিন ঘন্টা পরে লন্ডনে বাস থামলে পেছনের সিটের ভদ্রলোক, যাকে আমরা "টাকলা" বলে সম্বোধন করে এসেছি, শুদ্ধ বাংলায় বলেন, "ভাই আপনাদের আলোচনা শুনে খুব আনন্দ পেয়েছি।"

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ১ জুলাই ২০০৯