Wednesday, August 26, 2009

ঢাকা থেকে ১৪: সচিত্র উপসংহার

প্রথমেই যাঁরা "ঢাকা থেকে" সিরিজটা ধৈর্য্য ধরে পড়েছেন তাঁদের শুভেচ্ছা। এই সিরিজ লিখে শেষ করে প্রবাসে ফিরে আসার পরেও কেনো আরেকটা পর্ব লিখছি প্রথমেই তার কারণ দর্শানো দরকার।

প্রথমত, কিছু ছবি দেয়ার ইচ্ছে ছিলো কিন্তু ধীর গতির অন্তর্জাল আর ফ্লিকারের কোটা প্রায় ফুরিয়ে যাবার কারণে ঢাকায় থাকাবস্থায় দিতে পারিনি। দ্বিতীয়ত, কিছু টুকরো কথা লিখতে চেয়েও পরে আর সময়াভাবে লেখা হয়নি। এবং তৃতীয়ত, অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই আমার কাঙ্ক্ষিত ঢাকাবাস উদ্যোগের চেয়ে একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিলো।

সে ঘটনা না হয় বলছি শেষে।

আমাদের নটর ডেম কলেজ

কলেজে শেষ গিয়েছিলাম উচ্চ-মাধ্যমিক সনদপত্র তুলতে। এরপর আর যাওয়া হয়নি। এতোদিন পরে, সেদিন গিয়েও কলেজকে ঠিক আগের মতোই লাগলো। মনে হলো যেমনটা রেখে গিয়েছিলাম ঠিক তেমনটাই আছে। তেমন কিছুই বদলায়নি। একই দালান, একই শিক্ষক-শিক্ষিকা, একই মাঠ-গাছ, ছাত্রদের মধ্যেও যেনো সেই পুরানো আমাদেরই ছাপ!

কলেজে গিয়েছিলাম বন্ধু তানজিনকে নিয়ে। আমরা একই গ্রুপে ছিলাম। দুই বন্ধু মিলে এক সময় কলেজে "ক্রাইম ক্লাব" তৈরি করে তুলকালাম করে রেখেছিলাম।

এতোদিন পরে শিক্ষকরা আমাদেরকে দেখলেই চিনে ফেলবেন সেই সম্ভাবনা কম। তাই আমরা চেষ্টাও করি না। আপন মনে পাঠাগার, ক্লাসরুম, ল্যাবরেটরি, মার্টিন হল, মাঠ, আর চিকিৎসালয় ঘুরে বেড়াই। কতো স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই সব কিছু ঘিরে।

ওই যে ওই বেঞ্চ; ওটার তলায় চাদর বিছিয়ে কতোদিন শুয়ে শুয়ে মাসুদ রানা পড়েছি। আর ওই মার্টিন হলের জানালাটা; ওটার পাশে বসে লাগোয়া বাসার মেয়েটার বারান্দায় আসার জন্য মনে মনে অপেক্ষা করতাম। ওই গাছটা; ওটার তলে বসে কতো দিন ধুম আড্ডা চালাতাম।

স্মৃতিরা এভাবেই ক্ষণে ক্ষণে হানা দিয়ে যায়। আমরা ক্যাফেতে দুই কাপ চা আর "মাটন পেটিস" নিয়ে বসি। চায়ের দাম দুই থেকে পাঁচ আর মাটন পেটিসের দাম বারো থেকে বিশ টাকা হয়েছে। পার্থক্য বলতে শুধু এই। স্বাদ কিংবা পরিবেশনে কোনো ফারাক খুঁজে পাই না।

তবে নটরডেমে নতুন যে জিনিসটা দেখেছি তা হলো স্বচ্ছ ব্যাগ। স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ব্যাগ। এই জিনিসটা মনে হয় কলেজ থেকেই ছাত্রদেরকে দেয়া হয়। কারণটা কী সেটা অবশ্য ঠিক বোধগম্য হয়নি।

আরেকটা মন খারাপ করা জিনিস। আমাদের সময়ে আমরা আড্ডা দিতাম মাইকেল আর রফিক মামুর টঙ ঘিরে। সেই টঙগুলো আর নেই! যেখানে রফিক মামুর পসরা ছিলো সেখানে শুধু খাঁ-খাঁ দেয়াল। আর মাইকেল মামুর টঙের উপরে গজিয়ে বসেছে পুলিশ ছাউনি।

নটরডেমের যা কিছু ছবি তুলেছি তা আছে নিচের ফ্লিকার সেটে। আরো কিছু ছবি তোলার ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু তার আগেই ঝুম বৃষ্টি নেমে সব বরবাদ করে দিলো!
নটর ডেম কলেজের যতো ছবি

বৈদেশি

এ'বারে গুলশান-বনানীতে অসংখ্য বৈদেশি দেখেছি। ব্যাপারটা যে শুধুই আমার চোখে আলাদা করে লাগছে না সেটার প্রমান মিলেছে ভিক্ষুকদের আচরণে। একটা সময়ে ঢাকার ভিক্ষুকেরা ভাবতেন "সাদা চামড়া" মানেই ডলার। ব্যাপারটা যে আসলে তা নয়, সেটা দেখতে দেখতে মনে হয় তারাও বুঝে নিয়েছেন। তাই আগে বিদেশী দেখলেই ভিক্ষুকেরা সবাই যেমন ঝাঁপিয়ে পড়তেন এবার তেমনটা দেখিনি। বাচ্চা যারা রাস্তায় টাকার জন্য ত্যক্ত করে তারা সবার সাথে এমনই; নর্থ সাউথের সামনে গেলে এমন হাত টানাটানিতে আমারও পড়তে হয়।

বন্ধুদের কাছে জানলাম এরা কেউই পর্যটক নন। ব্যবসার, প্রধানত পোষাকশিল্প সংক্রান্ত ব্যবসার কাজে আসেন। এই সেক্টরটা কিভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠছে এটা হয়তো তারই নিশানা। শুধু অতিথিই নয়; শুনলাম কোরিয়া এবং ভারতের আগত-বহিরাগতের ভিড়ে গুলশান-বনানী-উত্তরা নাকি জেরবার হয়ে আছে। পাকিস্তানী, শ্রীলংকান ব্যবসায়ীর সংখ্যাও নাকি কম নয়।

Haji Shahbaz Jama Masjid

দুর্লভ এক খন্ড জলাশয়

অন্যান্যবার দেশে আসলে ধানমন্ডিতে তেমন যাওয়া না পড়লেও এবার খুব গিয়েছি। আলাদা ভাবে বলার কিছুই নেই। অন্যান্য এলাকার মতো এখানেও বিল্ডাররা পসরা সাজিয়ে বসেছে। অসংখ্য নতুন অ্যাপার্টমেন্ট। একতলা, দুইতলা বাড়ির খুব অভাব। আর আছে রেস্তোরা। দেশি-বিদেশি-পাঁচমিশালী রেস্তোরা।

ধানমন্ডিতে যেটা ভালো লেগেছে সেটা হলো ধানমন্ডি লেক। আগের চেয়ে অনেক সুন্দর হয়েছে। লেকের চারপাশ ঘিরে যে উদ্যান আছে তারও বেশ তদারকি হয় বোঝা গেলো। সুন্দর ইট সাজানো হাঁটা রাস্তা। সেই রাস্তা ভরে থাকে সব-বয়সী স্বাস্থ্য-সচেতন ঢাকাবাসীর পদচারণে। নতুন গাছ লাগানো হয়েছে অনেক। তার ফাঁকে ফাঁকে কুঁড়েঘর ধরণের ছোট্ট ছাউনি। সেগুলো, আর গাছ-বাগানের মাঝে দিয়ে উঁকি মারে জসীমউদ্দীদের কবিতা লেখা বোর্ড। ঢাকা জুড়ে এমন অনেকের কবিতাই দেখলাম। জসীমউদ্দীদের, নজরুলের। আচ্ছা, রবীন্দ্রনাথের কবিতা চোখে পড়লো না কেনো?

Dhanmondi Lake

মিষ্টান্ন!

অমিত রাহীদ ভাই বলেছিলেন দেশে গিয়ে যা খাই তারই ছবি যেনো তুলে রাখি। সেটা ঠিক মতো করতে পারিনি বন্ধু-সমাজের উৎপাতে। ক্যামেরা বের করলেই তারা সমস্বরে রব তোলে, "ভাই! তুই তো বৈদেশি হয়া গেছস ভাই! খাওনের ছবি তুলস!"

তবে মা-খালাদের জোর করে হাতে ধরিয়ে দেয়া মিষ্টির পাত থেকে যা পেরেছি তুলে এনেছি।

নমুনা দেখাই।

Sweets of Bangladesh

শাড়ি, কিংবা মিশন ইমপসিবল!

আমার এক প্রবাসী বাঙালি বন্ধু শাড়ির ফরমায়েশ দিয়েছিলো। তার অনুরোধ শুনে মনে হয়, ভালোই। বৈদেশি মেয়ে বন্ধুদের জন্যও শাড়ি ভালো উপহার হতে পারে। একটানে পাঁচ-ছয়টা কিনে ফেলবোখন।

জীবনে কখনো একা শাড়ি কিনিনি। শাড়ি বিষয়ক কোনো ধারণাই নেই। তবুও আত্মবিশ্বাস ছিলো, এ আর এমন কী! তবে শাড়ির দোকানে গিয়ে বুঝলাম, এ আসলে কী! শত শত শাড়ি, তার নানান নাম-রঙ-কাপড় আর কাজের ধরণ। আমি তাব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। দোকানীদের কথা শুনে আরো বিভ্রান্ত হই। তারা অজানা কোনো ভাষায় কী সব বলেন, কিচ্ছু বুঝি না। পাড়, ফসল, কটকা, আরো কী কী সব!

আমার মনে হয় আসলে দোকানের সমস্যা। এই দোকানটাই ভালো না। এভাবে আরো কয়েকটা দোকান ঘুরে ফেলি। এরপরে আর কোথাও না। এক টানে বাসায় চলে আসি। শাড়ি যারা কিনতে পারেন তাদের মেধা নিয়েও মনে একটা স্তুতি আসে - তারা বস!

পরদিন আবার যাই সাহস সঞ্চয় করে। এবার আর কোনো ঝামেলা না। আঙুল তুলে ফটাফট দেখাই, "এইটা, ওইটা, এইটাও আর ওইটা..."

পনেরো মিনিটে ঝামেলা শেষ!

Fruit Vendors

আমাদের বুড়ো নিউ মার্কেট

ক্লাস নাইন-টেন আর কলেজে পড়াবস্থায় নিউ মার্কেটে অনেক আসতাম। চিত্রশিল্পীদের রঙ-ক্যানভাস-ইত্যাদি যেখানে বিক্রি হয়, ঠিক তার সামনের ফাঁকা জায়গাটাতে বসে আমরা আড্ডা পেটাতাম। পাশের গলিতেই চায়ের দোকান। সেখান থেকে কেউ না কেউ একটু পর-পর এসে "চা লাগবে কিনা" সেই খোঁজ নিয়ে যেতো। ওই জায়গা ঘিরেই আলুকাবুলি, আলুরদম, ছোলাবুট, চানাবুট, আর মুড়ি-চানাচুরওয়ালারা ঝাঁকা সাজিয়ে বসতেন। আড্ডা মারতে মারতে আমরা হাত তুলেই তাদের কাছ থেকে যা লাগার আনিয়ে নিতাম।

আগের সেই জেল্লা নেই। কোথাও কেউ বসে আর আড্ডা দেয় না। নিয়মও নেই শুনলাম। দোকান-পাটগুলো দেখে খুব ক্লান্ত আর বুড়ো বলে মনে হলো। আগে মানুষের ভিড়ে গম-গম করতো, সেই ভিড়টা নেই। নতুন বই কিনতে হলেও নিউ মার্কেট থেকে কিনতাম। সেই সব বইয়ের দোকানে গিয়েও হতাশ হই। কিচ্ছু নেই। তাক ভর্তি গৎ বাঁধা জনপ্রিয় লেখকদের বিক্রি না হওয়া পুরানো বই। নিউ মার্কেটে গিয়েছিলাম প্রধানত ফুচকা খেতে। ফুচকার সেই স্বাদও আর নেই। কেমন যেনো ম্যাড়মেড়ে সব! মনটা খারাপ হয়েছে।

আমাদের বুড়ো হয়ে যাওয়া নিউ মার্কেটের ছবির সেটটাও জুড়ে দেই, নাকি?
বুড়ো নিউ মার্কেটের যতো ছবি

সিলেটের ছবি

সিলেট ভ্রমনের পোস্টে ছবি দেইনি দেখে অনেকে অভিযোগ করেছিলেন। তাঁদের জন্য সিলেটের ছবির সেটটাও জুড়ে দিলাম।
সিলেট ভ্রমনের যতো ছবি

বিদায়ী আড্ডা

আমার বিদায় বেলায় আড্ডার আয়োজন করেছিলো শাহেনশাহ সিমন আর অতন্দ্র প্রহরী।

যেদিন রাতে রওয়ানা দেবো সেদিন সন্ধ্যায় বনানী স্টার কাবাবে। নজরুল ভাই-নুপুর-নিধি, গৌতম'দা, রায়হান আবীর, শেখ জলিল ভাই, শাহেনশাহ সিমন, এনকিদু, অতন্দ্র প্রহরী, শব্দশিল্পী, আনিস মাহমুদ ভাই, অয়ন, তারেক, আহমেদুর রশীদ টুটুল ভাই, সবজান্তা, স্বপ্নাহত, পরিবর্তনশীল, ও পান্থ রহমান রেজা; সবাইকে একসাথে, এক আড্ডা, এক খাবার টেবিলে পাবার সৌভাগ্যের চেয়ে বড় বিদায়ী উপহার আর কিছু হতে পারে না, সম্ভব নয়।

ধন্যবাদ!

আড্ডার কথা জানানো হয়েছিলো আরিফ জেবতিক ভাই, টুটুল চৌধুরী ভাই, জামাল ভাস্কর'দা-মৌসুম, অমি রহমান পিয়াল ভাইকেও। তবে তাঁদের অন্য জরুরী পরিকল্পনা থাকায় তাঁরা আর শেষে আসতে পারেননি। রণদীপম'দা, মুস্তাফিজ ভাই ও বিপ্লব'দার ব্যক্তিগত পরিকল্পনা ছিলো, আসতে পারননি তাঁরাও। মাহবুব লীলেন ভাই তখন ছিলেন সিলেটে। আর রাবাবের আমেরিকার ফ্লাইট ছিলো আমার ফ্লাইটের পর-পরই। তাই বোচকা-বুচকি সাইজ করার ঝামেলায় সেও আসতে পারলো না।

এবারের ভ্রমনে পিয়াল ভাই, ভাস্কর'দা-মৌসুম, আর রাবাবের সাথে দেখা না হবার আফসোসটা থেকে যাবে।

মন্তব্যে আড্ডার ছবি দিয়েছে শাহেনশাহ সিমন, সৌজন্যে নজু ভাই ও ভাবি নুপুর।

ধীর গতির বিদায়

বিদায় নেবার কথা ছিলো আড্ডার দিন রাতেই। অন্তত্য আমি তো তাই ভেবেছিলাম!

ইত্তিহাদ এয়ারওয়েজের রিপোর্টিং ছিলো ভোর তিনটায়। গিয়ে চেকিং-টেকিং করে উড়োজাহাজে উঠে বসেছি। কিন্তু বিমান আর ওড়ে না। জানা যায় প্রযুক্তিগত সমস্যা আছে। আমরা অপেক্ষা করতে থাকি। দু'ঘন্টা পর আমাদের নামিয়ে দেয়া হলো। এক ঘন্টা পরে আবার উড়োজাহাজে। এবারে কিন্তু আর সমস্যা হয় না। বিমান আস্তে আস্তে রানওয়ের দিকে যেতে থাকে। আস্তে আস্তে গতি বাড়তে থাকে। আমরা দাঁতে দাঁত চেপে থাকি। আমাদেরকে উত্তেজনার চরমে পৌঁছে দিয়ে উড়ান আবার থেমে যায়। ধীর গতিতে যেখানে ছিলো সেখানেই ফিরে আসে। আবার অপেক্ষা। প্রিয় ব্লগার ছোটভাই অতন্দ্র প্রহরী আসার সময় মাহমুদুল হক এর "কালো বরফ" উপহার দিয়েছিলো। অপেক্ষার সময় সেই বইটাই সঙ্গী হয়ে থাকে।

সারাদিন টো-টো করে ঘুরেছি। সারারাত ঘুম হয়নি। স্টার কাবাবে খাবার পরে আর কিছু খাওয়াও হয়নি। ক্লান্তি আর ক্ষুধায় সবার অবস্থাই মারাত্মক। আমাদের অবস্থা বুঝেই বুঝি এবার বিমান বসিয়ে রেখেই আমাদেরকে নাস্তা দেয়া হয়। আমরা বুভুক্ষের মতো খাই। সময় চলে যায়।

সাত ঘন্টা পরে আমাদের আবার বিমান থেকে নামিয়ে দিয়ে সব মিলিয়ে আট কি ন'ঘন্টা পরে নিশ্চিত ভাবে জানানো হয় যে "আজ আর সমস্যার সমাধান হবে না!"

আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। কোথায়? হোটেলে। কোন হোটেল? কানাডা-আমেরিকা যাত্রীদের সোনারগাঁও হোটেলে। ইউরোপ যাত্রীদের হোটেল রেডিসন। আর আরব যাত্রীদের নিকটস্থ কোনো নাম না জানা হোটেলে। এই বৈষম্যের কারণটা আমার বেশ মনে ধরেছে। তাদের দাবি যারা বেশি দূরে যাবেন তাদের আরামটা নিশ্চই বেশি দরকার। তা বটে!

থাকি কাছেই, বনানীতে। তাই দাবি জানাই হোটেলে না আমি বাসায়ই যাবো। আমার মতো আরো কয়েকজনকে মেলে। ইত্তিহাদ আমাদের ফোন নাম্বার লিখে রেখে জানান, "দুই-তিন ঘন্টার নোটিশে বিমানবন্দরে আসতে হতে পারে? পারবেন?" পারবো, তবে তার মানে হলো বাসার কাছাকাছিই থাকতে হবে। দূরে কোথাও যাওয়া যাবে না।

বাবা ফোনে বিস্ময় নিয়ে বলেন, "তুই যাসনি?"
"না বাবা! এয়ারপোর্টে গাড়ি পাঠাও।"

বাসায় এসে ভরপেট ভাত খাই। মা মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। বাবা আর অফিসে ফিরে যান না। আমি আরেকবার আমার বিছানায় মাথা নোয়াই। সকালে মা পাতে তাঁর হাতে বানানো পরটা তুলে দেন, গোসতো। বাবা পরম মমতা নিয়ে আমার খাওয়া দেখেন। তাঁদের এই ছেলের এসব অনর্থক কাজ তাঁরা আর অনেকদিন দেখতে পারবেন না। বিকেলেই ফ্লাইট!

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ২৬ আগস্ট ২০০৯

Tuesday, August 11, 2009

ঢাকা থেকে ১৩: আনলাকি থার্টিনে "শেষ"

দিন শেষ।

আর ঠিক পাঁচ ঘন্টা পরে আমার বিমান উড়ে যাবে। বাসা থেকে বিদায় নিতে হবে তার দুই ঘন্টা আগেই।

এখন শেষ বেলায় বসে হিসেব কষি - দিনগুলো আমার কেমন গেলো?
হিসেব মেলাতে পারি না।

ইদানিং বাংলাদেশে এসেই আমি চট করে মানিয়ে নিতে পারি না। একটু সময় লাগে - দেশের ভাও বুঝতে; মানুষের ভাও বুঝতে। দেশে বাবা-মা-আত্মীয় আর ছোটবেলার ক'জন বন্ধু ছাড়া কাছের কেউ নেই। ব্লগ, বিশেষ করে সচলায়তন সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে। এখন দেশে আসলে অনেকের সাথেই দেখা হয়, কথা হয়। একদম না দেখা কাউকে চেনা বন্ধুর মতো পিঠে চাপড় দেয়া যায়। হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সিগারেটে টান দেয়া যায়। আমার হিসেব তাই ভালো লাগা, কিংবা মন্দ লাগার কথা বলে না। বরং বলে, "সময় বড় কম হয়ে গেলো!"

ঠিক যখন সবার সাথে মিলে যাচ্ছি, ঠিক যখন দেশের ভাও বুঝে নিয়েছি, ঠিক তখনই ঘড়ির কাঁটা বললো, "যা বেটা তুই ফেরত যা!"

আমি তাই ফেরত যাবো। সবাই জিজ্ঞেস করে একেবারে বাংলাদেশে ফিরে আসবো কিনা? এর উত্তর আমি জানি না। মাঝে মাঝে মনে হয়, "কেনো আসবো?" আবার কখনো মনে হয় "আসবো না মানে? অবশ্যই আসবো।" হয়তো এই দো'টানার মধ্যেই ঘুরে ফিরে এক জীবন শেষ হয়ে যাবে।

আজ বিদায়ী আড্ডা ছিলো। অনেকের সাথে যাবার বেলায় জমজমাট আড্ডাতে দেখা হলো। আবার খুব ইচ্ছে থাকা সত্বেও অনেকের সাথে আর দেখা হলো না; সামনা-সামনি কথা হলো না। তাঁদের কাছে আমি আন্তরিক ভাবে ক্ষমাপ্রার্থি।

গতবার বিদায় নেবার সময় যা লিখেছিলাম তাই। এই বিদায় বেলা আমার জীবনে পৌনঃপুনিক দশমিক হয়ে বার বার ফিরে আসে।

তাই আর কিছু না বলি। বরং যাই!

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ১১ আগস্ট ২০০৯

Monday, August 10, 2009

ঢাকা থেকে ১২: আমি এখন হিপহপ করি... ঢাকা টু সিলেট

৩১ জুলাই থেকে ২ আগস্ট ২০০৯


অপু ভাইকে (নজমুল আলবাব) নিয়ে কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি সামান্য বিভ্রান্ত হয়ে যাই। সব মানুষের মধ্যেই কিছু ব্যাপার থাকে যেগুলো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অপু ভাইয়ের মধ্যে সেই রকমের ব্যাপারগুলোই বেশি। আমি তাই আমতা আমতা করে বলি, "খুবই ভালো মানুষ! মাটির মানুষ। আমাদের জন্য খুবই টান! বুঝলেন?"

এটুকু বলে আমি ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে থাকি। আশা করি এটুকুতেই সবাই বুঝে নেবে আমি আসলে কী বোঝাতে চাইছি; এবং আশ্চর্যজনক ভাবে তাই হয়! এ কথা শুনেই সবাই যা বোঝার বুঝে নেন। অপু ভাইয়ের অর্ধাঙ্গিনী তুলি আপুকে (সেলিনা তুলি) নিয়ে কেউ জিজ্ঞেস করলেও আমার জবাব ও প্রশ্নকর্তার অভিব্যক্তি একই হয়।

পরিকল্পনা ছিলো এবার দেশে এসেই সিলেট যাবো। অপু ভাই, তুলি আপুদের সাথে ক'দিন থাকবো। বাবাইয়ের সাথে খেলবো। এক টেবিলে বসে দু'টো ভাত খাবো। গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দেবো। সেই আশা সম্বল করে ৩১ তারিখ শুক্রবার রাত্তির এগারোটায় বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে আমরা ক'জন উপবন এক্সপ্রেসে যাত্রা শুরু করি।

আমরা বলছি কারণ আমার সাথে ছিলো অয়ন, শাহেনশাহ সিমন, আর এনকিদু। যাওয়ার কথা ছিলো আসলে প্রথম তিনজনের। তাই প্রথমশ্রেনী বার্থের তিনটা ফুল আর একটা হাফ-টিকেট কিনে নিয়েছিলাম। হাফ-টিকেট কেনার উদ্দেশ্য ছিলো পুরো কেবিনের দখল নেয়া (উপবনের প্রথমশ্রেনীর এক কেবিনে চারটা বার্থ থাকে)। কিন্তু যাবার দিন পরিকল্পনা শুনে এক কথায় আমাদের সাথে ঝুলে পড়লো এনকিদু। শেষ মুহূর্তে আর টিকেট বদলানো সম্ভব নয় বলে আমরা একটা হাফ-টিকেট নিয়েই ফুল-চারজন ট্রেনে চেপে বসলাম। সেই নিয়ে পরে এক ঝক্কি! সিমন লিখেছে এই নিয়ে (এখানে পড়ুন)।


শনিবার সিলেটে পৌঁছেই আমি, সিমন আর অয়ন কোনো এক বিচিত্র অসুখে অসুস্থ হয়ে পড়লাম। অসুখের একমাত্র লক্ষণ হলো "ক্লান্তি"! প্রচন্ড ক্লান্তিতে আমাদের চোখ বুঁজে আসতে চায়। আবার ঘুমাতে গেলে ঘুম আসে না। ভ্রমনজনিত ক্লান্তি এ নয়, কারণ আমাদের তিনজনেরই লাগামছাড়া ভ্রমনের অভ্যাস আছে! এ'টুকু বাদ দিলে বলতে হবে, আমাদের সময় দুর্দান্ত কেটেছে।

সিলেটের মতো এতো ছিমছাম ছোট শহর আমি খুব কম দেখেছি। অনেক ফাঁকা জায়গা, রাস্তায় আবর্জনা খানা-খন্দ-কাদা-ধূলো কম, গাছপালাও অন্য জেলা শহরের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের কোথাও আমি এতো হিজাব আর বুরকা পরা মেয়ে দেখিনি। আমাকে একজন বলেছিলো সিলেটের মেয়েরা মোটা হয় না। সেই কথারও সত্যতা লক্ষ্য করি চারিদিকে তাকিয়ে।

অপু ভাইয়ের বাসা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বেশ ভালোই সময় কাটানো হয়। চা-সিগারেট-বিস্কুট-আমড়া সাঁটানো হয়। শাহজালালের ক্যাম্পাসও আমার ভালো লেগেছে। স্থাপত্যের বাড়াবাড়ি নেই, যেটুকু দরকার সেটুকুই আছে। শাহজালাল ক্যাম্পাসের ভেতরেই বেশ কিছু টিলা আছে। তেমনি একটা টিলার উপরে শাহজালাল শহিদমিনার। কড়া রোদ মাথায় নিয়ে আমরা সেখানে বসে আড্ডা দেই। আমাদের গা ঘেঁষে ছুটে যায় গিরগিটি। একগাছ থেকে আরেক গাছে লাফ দেয় কাঠবেড়ালি আর গেছো ব্যাঙ।

এই টিলার মতো আরো কয়েকটা পার হলেই অপু ভাইয়ের বাগানবাড়ি সদৃশ বাড়ি। সেই বাড়ির বারান্দায় ঝোলানো দোলনায় বসে সামনের টিলাগুলো দেখা যায়। সেই ছুঁয়ে উড়ে আসে মিষ্টি বাতাস। ঘরে ভুলে ঢুকে পড়ে ফড়িং। বাসার চাতাল থেকে সময় জানায় পোষা কবুতর। আর সেই সময় মেনে পশ্চিমে হেলে পড়ে সূর্য। দূর থেকে ভেসে আসে শেয়ালের ডাক। আকাশ ভরে ওঠে ঝিকিমিকি তারায়। নিচে তাদের সঙ্গ দেয় মিটিমিটি জোনাকি।

আমরা বুঝতে পারি এই বাড়িতে একজন কবি বাস করেন!


তুলি আপু সকালেই তাঁর অফিসে (মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়) চলে গিয়েছিলেন। আমাদের সঙ্গ দিতে বাসায় রয়ে গিয়েছিলেন অপু ভাই। রাতে তাঁদের নাট্যসংগঠন "কথাকলি"-র নাটক ছিলো, "লালদেওয়ান"। আমরা আমাদের যাবার সময় এভাবেই ফেলেছিলাম যাতে অপু ভাইদের নাটকটাও একসাথে দেখে আসতে পারি।

মধ্যান্থভোজের পরে আমরা পাঁচজন (আমি, অয়ন, সিমন, এনকিদু, অপু ভাই) বাবাইকে নিয়ে একসাথেই বের হই। প্রথমে এনকিদুকে নামিয়ে দেই বাসস্টপে। ও যাবে ছাতকে; মামাবাড়ি। বাকিরা অপু ভাইকে সিলেট মিলনায়তন রেখে (যদিও সাইনবোর্ড দেখলাম এখনো বলছে "সাইফুর রহমান মিলনায়তন") যাই তুলি আপুর অফিসে।

তুলি আপুর অফিস আর অফিসের সবাইকে আমার দারুন লেগেছে। তুলি আপু আর বাবাইকে যে অফিসের সবাই আমাদের মতোই ভালোবাসেন তা বেশ বোঝা গেছে। আর সবচেয়ে ভালো লেগেছে এই দেখে যে, সবাই "সচলায়তন"-কে এক নামেই চিনে ফেলছিলেন। তুলি আপু শুধু পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন, "আমার সচলায়তনের বন্ধু।" এবং তাদের জন্য এটুকুই পরিচয়ই যথেষ্ঠ ছিলো!

এরপর আবার সিলেট মিলনায়তন। এবার সেখানে লীলেন ভাইয়েরও (মাহবুব লীলেন) দেখা মেলে। তিনিও "কথাকলি"-র সাথে জড়িত। "লালদেওয়ান" নাটকে কোরিওগ্রাফির দায়িত্বে ছিলেন। নাটকটা, সত্যি কথা বলতে কী, খুব বেশি ভালো লাগেনি। কাহিনী গাতানুগতিক, এবং অত্যন্ত দুর্বল। তবে দক্ষ পরিচালনা, সঙ্গীত, অভিনয়, ইত্যাদির জন্য তেমন খারাপও লাগেনি। বিশেষ করে "সুনাই" চরিত্রে অপু ভাইয়ের অভিনয় দেখে চরম আমোদ পেয়েছি দেঁতো হাসি! "সুনাই" এর প্রানবন্ত উপস্থিতি ছিলো সারা মঞ্চ জুড়ে।

সিমনের সেই রাতেই দশটার উপবন এক্সপ্রেস ধরে যাবার কথা ছিলো। নাটকের টানে তার ট্রেন মিস হয়ে গেলো। পরে সে ফিরলো লীলেন ভাইয়ের সাথে, বাসে।


পরদিন এনকিদু ছাতক থেকে ফিরে এলো। ওকে সাথে নিয়ে আমরা চারজন (আমি, অয়ন, এনকিদু, অপু ভাই) শাহজালালের মাজারে চললাম ছবি তুলতে। এই নিয়ে একটা পোস্ট দিয়েছে এনকিদু (এখানে পড়ুন)।

শাহপরানের মাজারেও যাবার ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু সময়ের অভাবে আর হলো না। এনকিদু বুঝলাম হুট-হাট সিদ্ধান্ত নেয়। ওর আমাদের সাথেই ঢাকা ফিরে আসার কথা ছিলো। সে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, আজ না। সে আজ ছাতকে থেকে ঢাকা ফিরবে আগামীকাল। তাই ওকে রেখেই আমরা তিনজন (আমি, অয়ন, অপু ভাই) চললাম রেলস্টেশন।

আমাদের ট্রেন ছিলো দুপুর ২:৪৫-এ, পারাবাত এক্সপ্রেস। আমরা স্টেশনে পৌঁছলাম, আর আমাদের সামনে ট্রেন ছেড়ে দিলো। গাড়ি থামিয়ে, ব্যাগ নামিয়ে, দৌড় দিয়ে আর ট্রেন ধরার মতো অবস্থা রইলো না! আমরা ঢাকায় ফিরলাম সেই সিমনের মতোই, বাসে চেপে।

আমাদের চারজনেরই ট্রেন টিকেট গচ্চা!


অসাধারণ কিছু সময় কেটেছে অপু ভাই, তুলি আপু, অয়ন, সিমন, এনকিদু, আর বাবাইয়ের সাথে। দেশ থেকে এবার যেটুকু সম্বল সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি তার অন্যতম হয়ে থাকবে এই সিলেট ভ্রমনের স্মৃতি।

৩ আগস্ট ২০০৯

সিলেট থেকে এসেও পুরো সুস্থ হতে পারলাম না।

আল মাহমুদের একটা বই কিনেছিলাম, "আল মাহমুদের গালগল্প"; আজ সেটাই শুয়ে শুয়ে পড়লাম। আল মাহমুদ যেই শিবিরের পতাকাতলে সময় কাটান, তারা প্রায়শই দাবি করে থাকে যে তিনি বাংলাদেশের একমাত্র কবি যিনি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। আল মাহমুদকে আসলেই মুক্তিযোদ্ধা কবি বলা যায় কিনা সেই নিয়ে একটা চমৎকার পোস্ট দিয়েছিলেন সচল আরিফ জেবতিক (এখানে পডুন)।

ওই পোস্ট পড়ার পর থেকেই আল মাহমুদের বই দেখলেই আমি উলটে পালটে লেখক পরিচিতিটা দেখি। "গালগল্প" বইয়ের লেখক পরিচিতি বেশ বড়ই; কভারের দুই পাশ জুড়ে লেখা। সেখানে অবধারিত ভাবেই মুক্তিযুদ্ধের কথা এসেছে। বলা হচ্ছে, "১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে আল মাহমুদ সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।" সরাসরি অংশগ্রহনের কথা বলা হয়েছে। তবে "স্বাধিনতা সংগ্রাম" ও "মুক্তিযুদ্ধ" আলাদা করে কেনো বলা হয়েছে সেটা বুঝতে পারিনি। তবে মজা হলো এর পরের লাইনে লেখা, "৭১-এ বিজয়ীর বেশে কবি দেশে ফিরে এসে ‘গনকন্ঠ’ নামক একটি দৈনিক পত্রিকার প্রকাশ করেন…"। তার মানে কবি আল মাহমুদ দেশে না থেকেই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। সেটা নিশ্চই সশস্ত্র নয়?

বইয়ের গল্পগুলো আমার তেমন ভালো লাগেনি। কবি হিসেবে উনি তুখোড় সন্দেহ নেই, তবে গদ্য রচনায় সাবলিল নন। দুর্বল গতানুগতিক বর্ণনা। উপমার ব্যবহারগুলো ক্লিশে মনে হয়েছে। গল্পের কাহিনী একটাও মনে দাগ কাটার মতো নয়। বরং বেশ কিছু জায়গাতে মনে হয়েছে "সাইমুম" পড়ছি।

প্রথম গল্পটার কথা বলি, নাম "সহি জঙ্গনামা"। গল্পটা কী বলে? বলে সমাজতন্ত্রের সাম্যবাদ প্রয়োগে লাল সৈনিকরা ব্যর্থ, পরাজিত। তারা তাদের আদর্শ হারিয়ে ফেলেছে। এখন উপায়? লেখক বলেন, "সমাজতন্ত্রের আদর্শ মতের বিচিত্র শাখা-প্রশাখা তৈরি করা যায়, লড়াই জারি রাখা যায়,…" সেই শাখা-উপশাখাটা কি? ইসলামতন্ত্র!

লেখক সতর্ক ছিলেন ইসলামতন্ত্রের কথা যেনো সরাসরি চলে না আসে। তবে সরাসরি না বলেও লেখক বলেছেন অনেক কিছুই। লেখক আবার গল্পে মুক্তমনাদের দেখিয়েছেন "রক্তলোভী শেয়াল" হিসেবে; বলছেন, "পশুত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হওয়ার অধিকার তোমার চিরন্তন…।"

ফেলুদার মতোই বলি, "বোঝো!"

৪ আগস্ট ২০০৯

আমার এক বন্ধুকে তার শালিরা "জিজ্জু" ডাকে শুনে বিষম খেয়েছি।

বিষম খাবার কথা অবশ্য ছিলো না, কারণ বাংলা ভাষায় খুব সাবলিল ভাবেই হিন্দি ঢুকে পড়ছে। টিনেজাররা অনেকদিন থেকেই কথার মাঝে কৌশলের সাথেই হিন্দি ঢুকিয়ে দেয়। শুধু হিন্দি শব্দ নয় কিন্তু, মাঝে মাঝে পুরো বাক্য! অনেক বাচ্চাদের দেখেছি কিছু শব্দ শুধু হিন্দিতেই বোঝে, বাংলাতে বোঝে না।

আজ তবু বিষম খেয়েছি এই কারণে যে সম্বোধনের মতো ব্যক্তিগত জিনিসও যে হিন্দিতে রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে সেটা আগে মাথায় আসেনি।

জানি বাংলা সম্বোধনে অনেক আগেই ইংরেজি (মাম্মি, ড্যাডি, আঙ্কেল, ইত্যাদি), ফারসি (আম্মু, আব্বু, ইত্যাদি) ঢুকে পড়েছে। তবে সেই ভাষার সম্বোধনগুলো বাংলায় ঢুকেছিলো মোঘল আর ইংরেজ শাসনামলে। শাসকদের ভাষা কিছু না কিছু প্রজাদের ভাষায় ঢুকে যাবেই। জ্ঞানে, অজ্ঞানে, ক্ষেত্র বিশেষে জোর খাটিয়ে। স্বতস্ফুর্ত ভাবে এক ভাষায় অন্য ভাষার শব্দ ঢুকে পড়াটা খারাপ কিছুও নয়। এতে একটা ভাষার শব্দসম্ভার বাড়ে বই কমে না।

তবু আমি বিস্ময় কাটাতে পারছিনা, কারণ হঠাৎ মনে হচ্ছে কাগজে-কলমে না হলেও আমরা হয়তো হিন্দিভাষীদের শাসনেই আছি। আমাদের বিনোদন (দোকান ভর্তি হিন্দি সিডি-ডিভিডি, বইয়ের দোকান ভর্তি আনন্দ পাবলিশার্স, সানন্দা কিংবা স্টারডাস্ট, রাস্তায় রাস্তায় ভারতীয় চিত্রতারকাদের ছবি সহ বিজ্ঞাপন), বানিজ্য (দোকান ভর্তি ভারতীয় সামগ্রী, বায়িং হাউসগুলো ভারতের লোকে ভর্তি), রাজনীতি (ভারতীয় রাষ্ট্রদূত যা খুশি তাই বলতে পারেন আমাদের প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই) সবই যেনো ভারতের মুঠোয়। ক'দিন পরে বাংলাদেশের ছেলে-বুড়ো সবাই হিন্দিতে পারঙ্গম হয়ে উঠলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না।

শাসকের ভাষা বলে কথা!

৫ আগস্ট ২০০৯

দেশে আসার পর একাধিকবার শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গেলেও আজিজে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

আজিজে যে আমি আগে খুব যেতাম তাও না; যাওয়ার সেই তাগিদটাও ছিলো না। এবারে তাগিদ ছিলো কিন্তু সুযোগ ছিলো না। আজিজ মার্কেটে "শুদ্ধস্বর" আছে; যেখানে অনেক সচলই আড্ডা দেন। তাই তাগিদ আসাটাই স্বাভাবিক। যাওয়া হয়নি তার সাদামাটা কারণ হলো "দূরত্ব"। আমার বাসা থেকে শাহবাগের দিকে রওনা দেয়া মানে সেদিনের অন্য পরিকল্পনায় জল ঢালা। তাই যাচ্ছি যাবো করেও আর যাওয়া হয়নি।

আজ আজিজে আমার জন্য অপেক্ষা করার কথা ছিলো অয়নের। আমি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পেরিয়ে বিজয় সরণিতে আসতে না আসতেই অয়নের ফোন, "আজ আসতে পারবো না ভাইয়া। শরীর খারাপ।" বুঝলাম সিলেট থেকে এসেও অয়ন সম্পূর্ন সুস্থ হয়ে ওঠেনি। ফার্মগেট আর বাংলামটরের মহাজ্যাম পেরিয়ে কোনো মতে আজিজে এসে তিনতলায় উঠে শুদ্ধস্বরের খোঁজ করি। শুদ্ধস্বরে আমি গতবছর জানুয়ারিতে একবার এসেছিলাম। তবে সেদিন ছিলো ঘোর লোডশেডিং। শুদ্ধস্বরের ভেতরে আর ঢোকা হয়নি। আজ সেই স্মৃতি অবলম্বন করে তিনতলার ভুলভুলাইয়াতে ঘুরে বুঝলাম, ইউনিট নাম্বার না জেনে আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এভাবেই ঘুরপাক খেতে হবে।

ফোন লাগাই লীলেন ভাইকে, "লীলেন ভাই শুদ্ধস্বর আজিজের তিনতলায় না?"
"হ্যাঁ।"
"কত নাম্বার যেনো?"
"একানব্বই।"
আমি নিশ্চিত হতে আবার জিজ্ঞেস করি, "একানব্বই?"
এবার জবাব আসে ঠিক সামনে থেকে, "হ্যাঁ, একানব্বই!"

আমি চমকে সামনে তাকিয়ে দেখি টুটুল ভাই (আহমেদুর রশীদ) হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি পাকড়াও করে শুদ্ধস্বরে নিয়ে যান। এই প্রথম ভেতরে এলাম। আমি তাই আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বইয়ের তাক দেখি। টেবিলে সাজানো বই দেখি। টুটুল ভাই এবার নিয়ে যান দুই তলায়, বাঁশ-কাঠে সাজানো ছিমছাম কোনো রেস্তোরায়। তাঁর বদান্যতায় পেটপুরে লুচি-সবজী খাই। ফিরনি খাই। সব শেষে আয়েশ করে চায়ের কাপেও চুমুক লাগাই। জানলাম অন্যদিন সচলের অনেকেই বিকেলে আড্ডা মারতে আসেন। আজকের দিনটাতেই কোনো অজানা কারণে কেউ আর আসেননি। আমার অবশ্য তাতে বঞ্চিত মনে হয় না। বরং পেট ভর্তি লুচি-সবজী নিয়ে নিজেকে বেশ ভরপুরই মনে হয়!

৬ আগস্ট ২০০৯

১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে ঢাকা জুড়ে অসংখ্য পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন দেখতে পাচ্ছি। আজ গাড়িতে যেতে যেতে যতোগুলো পোস্টার-ব্যানার-ফেস্টুন দেখেছি তার সবগুলোই আদ্যোপান্ত পড়ার চেষ্টা করলাম। অনেকগুলোতেই দেখলাম বানান ভুল, খুব বাজে রকমের বানান ভুল!

ব্যাপারটা খুবই দুঃখজনক।

৭ আগস্ট ২০০৯

আজ গিয়েছিলাম ধানমন্ডিতে।

প্রথমবার ধানমন্ডি যাবার আগেই খালাতো ভাই অর্ণব বলে দিয়েছিলো, "ভাইয়া ধানমন্ডি গেলে দেয়ালগুলো খেয়াল করো।" করেছিলাম; এবং চমকিত হয়েছিলাম।

কাহিনী হচ্ছে ঢাকায় নয়া গ্যাঙ-কালচার চালু হয়েছে। একদল টিনেজ ছেলে-মেয়ে মিলে গ্যাঙ তৈরি করে ফেলছে। ওরা কী করে? হিপহপ করে (স্কিব খানের ভাষায়, "আমি এখন হিপহপ করি ঢাকা শহরে!"), ডিজেগিরি করে, মারামারি করে, দেয়ালে চিকা মারে, শুনলাম জোর থাকলে অস্ত্রবাজীও করে। ধানমন্ডির দেয়াল জুড়ে সেই সব গ্যাঙের চিকা মারা - AK-47, ID-15, TRAK-STA, ইত্যাদি! আজও তাই লক্ষ্য করলাম।

ব্লগের এই অংশে ঢাকায় বুদবুদ-প্রজন্ম নিয়ে একটু লেখার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু দুই প্যারা লিখে বুঝলাম লিখলে অনেক লিখতে হবে। সচল ইশতিয়াক রউফ মনে হয় কোনো এক পোস্টে লিখেছিলো ওদের নিয়ে। সেই পোস্টটাও খুঁজে পেলাম না।

তাই থাক। চিন্তাটা মাথায় জমতে থাকুক। পরে ইচ্ছে হলে অন্য কোনো এক সময় নামিয়ে দেবো।

এ ক'দিন অনেক ছবিও তুলেছি। সময় বুঝে সেগুলোও আপলোড করতে হবে।

সময় তো ঘনিয়ে এলো!

© অমিত আহমেদ

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ১০ আগস্ট ২০০৯