এক
মনিটর থেকে চোখ না সরিয়েই ধর্মা বুঝতে পারে ওর টেবিলের সামনে চীফ এসে দাঁড়িয়েছেন। হাতে বেশ মোটা ফাইল। তথ্যচিপ কিংবা প্রতিফলক নয়, আক্ষরিক অর্থেই পুরানো দিনের মতো কাগজের তৈরি ফাইল।
চীফ হাতে ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন শুধু এই ব্যাপারটাই যে কারো কৌতুহল জাগাবার জন্য যথেষ্ঠ। চীফ নিজেও সেটা জানেন। আর জানেন বলেই ধর্মার কিউবিকলের সামনে এসেও কোনো কথা বলেন না। মুখে কেমন একটা হাসি নিয়ে ফাইলটা এমন ভাবে কোমড়ের পাশে ধরে রাখেন যেনো স্ক্রিন ভেদ করেও সেটা সবার গোচর হয়।
ধর্মা অবশ্য মুখ তুলেও তাকায় না। গতকাল রাতে চৌদ্দতম ইউনিটের একটা বাড়িতে চুরি হয়েছে। বাড়িতে চুরি হওয়া মানে এমনিতেই বড় ঘটনা। মধ্যনগরে বাড়ি বলতে গেলে নেই-ই। এতো টাকা খরচ করে কেউ বাড়ি কিনতে যায় না অ্যাপার্টমেন্ট ইউনিট কিনে নেয়। বাড়ি কিনলেও ঝামেলা, রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মানে হাতি পোষা। পুরো শহরে মোটে সতেরোটা বাড়ির ইউনিট আছে, প্রতিটাতে পঞ্চাশটা করে বাড়ি। এই বাড়িগুলোতে শহরের সবচেয়ে ধনী মানুষেরা থাকেন। তাই স্বাভাবিক ভাবেই বাড়িগুলোতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা অনেক সস্তা মানের জাদুঘরের চেয়েও উন্নত। এসব বাড়িতে চুরি তাই হয়ই না বলতে গেলে। আর যদি হয় তবে পুলিশ বিভাগে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। এই মন্ত্রী, সেই সমাজসেবক, ওই ধর্মপ্রচারক অবিরত ফোন করে শাসাতে থাকেন। চোর না ধরা পর্যন্ত শান্তি নেই।
চৌদ্দতম ইউনিট পড়ে মধ্যনগরের পঞ্চম জোনে। এই জোনের সেরা গোয়েন্দা ধর্মা। স্বাভাবিক ভাবে কেসটা ওর হাতেই এসে পড়েছে। ধর্মা তাই চীফের দিকে না তাকিয়েও বুঝতে পারে ফোনে বড় কারো হুমকি খেয়ে তিনি এখন সেই রাগ ধর্মার উপরে ঝাড়তে এসেছেন। কাজের অগ্রগতি শুনবেন। গতকাল রাতে চুরি হয়েছে আর এখন বাজে দুপুর একটা। এখন পর্যন্ত সে স্পটে যায়নি। সম্ভাবনা আছে সেই নিয়ে পাল্টা কিছু হুমকি-ধামকিও দেবেন।
ধর্মা তার উপস্থিতি পাত্তাই দিলো না দেখে চীফ এবার চটাশ শব্দে কাগজের ফাইলটা ধর্মার টেবিলে রাখেন।
উৎকন্ঠা নিয়ে ডাকেন, "ধর্মা?"
"ফ্যাকড়া আছে চীফ!"
"ফ্যাকড়া মানে?"
"চোর এতো ঝামেলা করে বাসায় ঢুকে কী নিয়েছে? দুষ্প্রাপ্য চীনা মাটির মুর্তি আর ডাচেস এর কিছু গহনা। এই টুকরা-টাকরা চুরি করার জন্য দোকান কিংবা মিউজিয়াম রেখে একটা চোর কেনো এতো ঝামেলা করে মহামান্য ক্রামস আর ডাচেস জুমানের বাড়িতে ঢুকবে?", ধর্মা ভ্রু কুঁচকে রাখে, "অন্য কোনো ব্যাপার আছে। চোর আরো কিছু নিয়েছে যেটা তাঁরা আমাদেরকে জানাচ্ছেন না। কিংবা পুরো চুরির ব্যাপারটাই ভাওতা। এই জন্যই আমি এখনো স্পটে যাইনি। গত পাঁচ মাসে সংগ্রহীত তাঁদের ব্যক্তিগত ফাইল দেখছি। সেখানে একটা মজার ব্যাপার। গত তিন মাস তারা ওরাইয়ন সিস্টেমে ছিলেন। বাসা ছিলো খালি। সেই সময়ে চোর না এসে তারা ফেরত আসার পরে কেনো আসবে?"
চীফ দৃশ্যতই বিরক্ত হন, "তোমাকে এই ফালতু চুরির কেস কে দিয়েছে?"
"ফালতু?" এবার অবাক হবার পালা ধর্মার, "বাড়িতে চুরি হয়েছে চীফ! বাড়িতে! যে বাড়িতে মহামান্য ক্রামস থাকেন সেই বাড়িতে!"
চীফ মাছি তাড়াবার মতো করে হাত নাড়েন, বলেন, "ফালতু কেস! ওটা মুস্তফাকে গছিয়ে দাও। তোমার জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ কেস আছে।"
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কেস! ধর্মা বোকার মতো তাকিয়ে থাকে।
"তুমি কি সংবাদ দেখো না, নাকি?", চীফ বলেন, "একটু আগে একটা এপার্টমেন্ট ইউনিটে মহামান্য কুনাশকে মৃত অবস্থায় আবিষ্কার করা হয়েছে।"
ধর্মা হঠাৎ বুঝতে পারে না "মৃত অবস্থায় পাওয়া" মানে কী! হত্যা? মধ্যনগরে হত্যা! মহামান্য কুনাশ মানে? কোন কুনাশ?
"চীফ,মহামান্য কুনাশ মানে? কোন কুনাশ? ধর্মপ্রচারক কুনাশ?"
"ইয়েস, ধর্মপ্রচারক মহামান্য কুনাশ। তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।"
হঠাৎ করেই ধর্মার কাছে টেবিলে পড়ে থাকা কাগজের ফাইলের রহস্য উন্মোচিত হয়ে যায়!
(আশা করি চলবে)
সম্পর্কযুক্ত পোস্ট:
সাইফাই গল্প নিয়ে
সাইফাই গল্প: লেখকের চোখ (সচলায়তন লিংক)
© অমিত আহমেদ
Monday, October 19, 2009
সাইফাই গল্প: গোলযোগ
Monday, October 12, 2009
সাইফাই গল্প নিয়ে
সাইফাই লিখবো ভেবে গতবছর আঁটঘাট বেঁধে নেমেছিলাম। একটা সাইফাইক্লোপিডিয়াও তৈরি করেছিলাম। সিরিজ সায়েন্স ফিকশনে একটা "লেখক বাস্তবতা" তৈরি করার ব্যাপার থাকে। একটা সমান্তরাল জগৎ, একটা আলাদা সময়রেখা। সেই ধরে নতুন প্রযুক্তি, নতুন জগৎ, নতুন ইতিহাস। আর সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বদলে যাওয়া মানুষ, তার চারিত্রিক গঠন আর মানবিক গুনাবলি। এটা একটা বিশাল ঝামেলার ব্যাপার। অনেক লেখকই অবশ্য বাস্তবতা তৈরিতে তেমন ঝামেলায় যান না। তাঁদের একটা গল্পের বাস্তবতার সাথে আরেকটার মিল থাকে না।
এতে লেখক পাঠক দু'এরই সুবিধা আছে। লেখকের সুবিধা হলো একটা বাস্তবতার বাঁধনে পড়ে থাকতে হয় না। কল্পনার লাগাম ইচ্ছে মতো ছেড়ে দেয়া যায়। বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ কিংবা মুহম্মদ জাফর ইকবাল এই ধরণের কল্পকাহিনী বেশি লেখেন। এতে পাঠকের সুবিধা হলো একটা গল্প পড়তে গেলে আগের গল্পগুলো পড়া না থাকলেও চলে। আবার গল্প পড়তে পড়তে "দ্রষ্টব্য" ধরে পরিভাষার মানেও খুঁজে নিতে হয় না।
ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি একটা বাস্তবতার কাঠামো তৈরি করে সেই কাঠামো ধরে একাধিক গল্প লেখায় কোনো লাভ নেই। তবে মজা আছে। এই কারণেই স্টারট্রেক, ব্যাটলস্টার গ্যালাকটিকা, ব্যবিলন, হিচহাইকার্স গাইড, কিংবা ফাউন্ডেশনের সেই রকম ভক্ত আমি। কাঠামোর কী বিস্তৃতি! লেখকের কল্পনা যে কেমন দুর্দান্ত হতে পারে তার প্রমান এই টিভি সিরিজ কিংবা গল্প-উপন্যাসগুলো। এ কারণেই হয়তো, অনেক আগে থেকেই আমার নিজের একটা সাইফাই লেখক বাস্তবতা তৈরি করার ইচ্ছা। পুরো ব্যাপারটাই তাই আমার ছেলেমানুষি বলা যেতে পারে। নিজের শখপূরণের চেষ্টা। আপাদত পরিকল্পনা এই সিরিজের ১২টা গল্প লেখার। এরপরে ক্ষ্যামা দেবো। প্রথম গল্পটা ছিলো রোবটলেখক লেখক জিরকন, অভিমানী লেখক সামন্ত স্যান্যাল আর তাঁর সহকারী দলছুট রোবট পাপানকে নিয়ে (লেখকের চোখ)। এই গল্পগুলো অবলম্বন করে আমার কাঠামো আস্তে আস্তে বড় হবে। প্রথম গল্পে বলেছি রোবট বিদ্রহের কথা। তাদের স্বাধীনতা, অন্য গ্রহে-উপগ্রহে তাদের উপনিবেশের কথা। বলেছি নতুন প্রযুক্তি আর ছায়াপথ জুড়ে মানুষের ছড়িয়ে পড়ার কথা। সামনের গল্পতে হয়তো আরো কিছু আসবে।
© অমিত আহমেদ
এতে লেখক পাঠক দু'এরই সুবিধা আছে। লেখকের সুবিধা হলো একটা বাস্তবতার বাঁধনে পড়ে থাকতে হয় না। কল্পনার লাগাম ইচ্ছে মতো ছেড়ে দেয়া যায়। বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ কিংবা মুহম্মদ জাফর ইকবাল এই ধরণের কল্পকাহিনী বেশি লেখেন। এতে পাঠকের সুবিধা হলো একটা গল্প পড়তে গেলে আগের গল্পগুলো পড়া না থাকলেও চলে। আবার গল্প পড়তে পড়তে "দ্রষ্টব্য" ধরে পরিভাষার মানেও খুঁজে নিতে হয় না।
ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি একটা বাস্তবতার কাঠামো তৈরি করে সেই কাঠামো ধরে একাধিক গল্প লেখায় কোনো লাভ নেই। তবে মজা আছে। এই কারণেই স্টারট্রেক, ব্যাটলস্টার গ্যালাকটিকা, ব্যবিলন, হিচহাইকার্স গাইড, কিংবা ফাউন্ডেশনের সেই রকম ভক্ত আমি। কাঠামোর কী বিস্তৃতি! লেখকের কল্পনা যে কেমন দুর্দান্ত হতে পারে তার প্রমান এই টিভি সিরিজ কিংবা গল্প-উপন্যাসগুলো। এ কারণেই হয়তো, অনেক আগে থেকেই আমার নিজের একটা সাইফাই লেখক বাস্তবতা তৈরি করার ইচ্ছা। পুরো ব্যাপারটাই তাই আমার ছেলেমানুষি বলা যেতে পারে। নিজের শখপূরণের চেষ্টা। আপাদত পরিকল্পনা এই সিরিজের ১২টা গল্প লেখার। এরপরে ক্ষ্যামা দেবো। প্রথম গল্পটা ছিলো রোবটলেখক লেখক জিরকন, অভিমানী লেখক সামন্ত স্যান্যাল আর তাঁর সহকারী দলছুট রোবট পাপানকে নিয়ে (লেখকের চোখ)। এই গল্পগুলো অবলম্বন করে আমার কাঠামো আস্তে আস্তে বড় হবে। প্রথম গল্পে বলেছি রোবট বিদ্রহের কথা। তাদের স্বাধীনতা, অন্য গ্রহে-উপগ্রহে তাদের উপনিবেশের কথা। বলেছি নতুন প্রযুক্তি আর ছায়াপথ জুড়ে মানুষের ছড়িয়ে পড়ার কথা। সামনের গল্পতে হয়তো আরো কিছু আসবে।
© অমিত আহমেদ
Subscribe to:
Posts (Atom)