Wednesday, February 03, 2010

যে বইগুলোর অপেক্ষায় 8: জাহাজী যাযাবর

জাহাজী যাযাবর
আনিস হক

প্রকাশন: প্রগতি প্রকাশনী
প্রচ্ছদশিল্পী: ধ্রুব এষ
ভ্রমণ ও জীবন কাহিনী, ৮০ পৃষ্ঠা
মূল্য ১০০ টাকার কম

দুই বছর আগের কথা। সচলায়তনে হালকা চালে একটি লেখা পড়তে গিয়ে আমার হতভম্ব অবস্থা! ব্লগের কোনো লেখা আমি সাধারণত একবারের বেশি পড়ি না। সেই লেখাটি আমি পর পর দুইবার পড়লাম। মন্তব্যে লিখলাম, "এই সিরিজটি সম্ভবত একটি এপিক হতে যাচ্ছে!" অনেক ধারাবাহিক লেখাই যে প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হয় তা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে না। কিন্তু কয়েক পর্ব পড়ে আমার প্রথমপর্বের সন্দেহ নিঃসন্দেহে পরিণত হলো। আমি সদম্ভে ঘোষণা দিলাম, "এখানে এসে (আমি) নিশ্চিত যে প্রথম পর্বে যা লিখেছিলাম তা-ই সত্য। এই সিরিজটি নিঃসন্দেহে একটি এপিক হতে যাচ্ছে!"

মানব সম্প্রদায়ে অভিযানের ব্যুৎপত্তি চাহিদা থেকেই। শখ করে আদিম মানুষ কখনোই যাযাবর হয়নি। খাদ্য-পানীয়ের সন্ধানে, আবহাওয়া-প্রকৃতির দাপটে, রোগ-মহামারির আক্রমনে, অত্যাচারী শাসকের অত্যাচারে নিরুপায় হয়েই আদিম মানুষ ঘর ছেড়েছে। পা বাড়িয়েছে অজানায়। সেই থেকে মৌলিক চাহিদার চৌহদ্দি পেরিয়ে আমাদের রক্তে মিশে গেছে অভিযানের নেশা।

তাই ডাক্তারির পাট শেষ করে খুব পড়ুয়া কোনো যুবক বেড়িয়ে পড়ে মোটরসাইকেল চড়ে। খুব সাধাসিধে গোবেচারা কোনো মানুষ একদিনের জন্য হলেও ফেলে দেন তাঁর দৈনন্দিনতার পাট। ঘরকুনো কোনো মানুষ লিখে ফেলেন আশি দিনে বিশ্বভ্রমনের উপাখ্যান। আর তেহরানে তিতিবিরক্ত হয়ে, ইস্তান্বুলের কারখানায় ইস্তফা দিয়ে, গ্রীসের ভ্যোলা বন্দরে বাক্কিস জাহাজে খালাসির খাতায় নাম লেখায় বাঙালি তরুন আনিস হক।

সেই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কি আবশ্যকতা ছিলো? ছিলো হয়তো। তবে সব ছাড়িয়ে ছিলো অভিযানের নেশা। সেই নেশার গন্ধ আমরা পাই আনিস হকের লেখার পরতে পরতে। সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। ভাঙা-চুরো ছোট্ট জাহাজ বাক্কিসের কালো তেলে হাত মাখিয়ে, নোনা বাতাস আর সূর্যরেণু বুকে নিয়ে, পাড়ি দিয়েছেন এ্যকরোপোলিস থেকে সাইপ্রাস। স্যালোকিনি। সিসিলি। আরব রাজ্য পেরিয়ে লোহিত সাগর। অতলান্তিক হয়ে কালো এলপিদা।

এসব অভিযানের সবটুকুই যেনো চোখের সামনে বায়োস্কোপের মতো ভেসে ওঠে লেখক আনিস হকের লেখায়। তিনি ছোট ছোট বাক্যে লেখেন, কোনো দ্ব্যর্থতা ছাড়াই। গল্প বলেন এক পোড় খাওয়া নির্লিপ্ততায়। তাঁর বর্ণনা হয় অকপট, আঁটসাঁট। বেগবান কাহিনীর বিন্যাস। আমরা তাই খুব সহজে গল্পে ঢুকে যাই। আমাদের বাস্তবজ্ঞান লোপ পায়। মনে হয় বন্দর থেকে উড়ে আসা বালুকনা জমছে রোমকূপে। প্রচন্ড গরমে, মেশিনরুমে, হাতে-গায়ে তেল-কালি লাগে আমাদেরও। প্রচন্ড খাটুনিতে, ঘামে ভিজে, শরীর চিটচিট করে। লেখকের সাথে আমরাও নৌকা উল্টে পড়ি হাঙররাজ্যে। প্রচন্ড ঝড়ে বাক্কিসের ডেকে সাগরের নোনোজল আমাদের ভিজিয়ে দিয়ে যায়। আর নাইজেরিয়ার কালোমেয়ে শুনিয়ে দিয়ে যায় সে-ই কবে গত হয়ে যাওয়া ভারতবর্ষের গৌরবগাঁথা। পরদেশের সোঁদা মাটির গন্ধে আমাদেরও চোখে পানি আসে সোনার বাংলার কথা ভেবে। আরে, সবশেষে এ তো এক বাঙালিরই গল্প! যে বাঙালি জীবনযুদ্ধে হার মানে না। প্রচন্ড প্রতিজ্ঞা নিয়ে পৃথিবীর বন্দরে বন্দরে রেখে আসে বাংলাদেশের পদচিহ্ন!

এভাবে অজানার উদ্দেশ্যে তো পাড়ি দেয়া হয়নি আমার। সেই স্বপ্ন পুষে রেখেছি মনে। তাই তাঁর লেখা পড়তে পড়তে অজান্তে মন্তব্যে শপথ করেই ফেলি, "(তীরুদা) জাহাজে আমি কাজ করবোই করবো এটা আপনাকে জানিয়ে রাখলাম।" তাঁর বই আমাকে স্বপ্নপূরণের আশা দেখায়। আমি মন্তব্য রাখি, "(ধারাবাহিক) লেখা শেষ হলে স্থিরচিত্র আর মানচিত্র দিয়ে একটি বই করলে কী যে চমৎকার একটি ব্যাপার হবে!"

সেই বই অবশেষে বের হচ্ছে। পরিমার্জিত, পরিবর্ধিত হয়েই। এতো স্বপ্নপূরণ! প্রিয় লেখক ও অভিযাত্রী আনিস হকের বইটি তাই আমার একটি স্বপ্নপূরণের বই!

© অমিত আহমেদ

2 টি মন্তব্য:

Mahbub said...

এ বইটা কিনবো

Aumit Ahmed said...

তীরু'দার অন্যশরীর বইটাও দারুন। চারুলিপি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো।

Post a Comment