Tuesday, February 09, 2010

যে বইগুলোর অপেক্ষায় ৬: কান্না বিষয়ক শব্দাবলী

কান্না বিষয়ক শব্দাবলী
রুদ্র বাদল

প্রকাশক: নজমুল আলবাব, শস্যপর্ব
পরিবেশক: পাঠসূত্র প্রকাশনী
প্রচ্ছদশিল্পী: ইসমাইল গনি হিমন 
কাব্যগ্রন্থ, ৩২ পৃষ্ঠা
মূল্য ৫০ টাকা

খুব ছোটবেলার ঘটনা। মা'র সাথে নানাবাড়ি গিয়েছি। গভীর রাত্তিরে দরজায় ধাক্কা। হঠাৎ ঘুম ভেঙে সন্ত্রস্ত সবাই। দরজা খুলে দিতেই ঝাঁকড়া চুল-দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে ঢাকা একটি মানুষ হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়েন। জানতে পারি তিনি আমার ছোটমামা। পড়েন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে। সেখান থেকে কাউকে না জানিয়ে, শরীরে প্রচন্ড জ্বর নিয়েই, বাসায় চলে এসেছেন। জ্ঞান হবার পর ছোটমামাকে নিয়ে সেটাই আমার প্রথম স্মৃতি।

জ্বী। কবি রুদ্র বাদল, যাঁকে আমি বাচ্চু মামা বলে ডাকি, তিনি আমার আপন মামা। চার মামার মধ্যে সবচেয়ে ছোট। তাঁকে নিয়ে লিখতে বসলে যে স্মৃতিচারণের পাল্লা ভারী হয়ে পড়বে, তাতে আর বিস্ময় কী!

সাভারে, আমার নানাবাড়ির সদর দরজা দিয়ে ঢুকে, বাগান পেরুলেই লম্বা টানা বারান্দা। সেই বারান্দার ডান কোনে একটি ছোট্ট কামরা নিয়ে থাকতেন বাচ্চু মামা। শৈশবে, সঙ্গত কারণেই, সেই কামরাটি নিয়ে আমার আগ্রহের সীমা ছিলো না। কামরা ভর্তি অসংখ্য বই! রঙতুলি, প্যালেট, ক্যানভাস। সদ্য আঁকা ছবি। হাতে গড়া ভাস্কর্য। ভেতরে সবার প্রবেশাধিকার না থাকলেও আমার জন্য কোনো বিধিনিষেধ ছিলো না। আমি সটান ঢুকে পড়তাম। মামা হাতে তুলে দিতেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহর "আঙুর", আর্কাদি গাইদারের "ছোরা", বিভূতিভূষণের "চাঁদের পাহাড়"। দেশি-বিদেশী কত্ত বই আর পত্রিকার খোঁজ যে পেয়েছি মামার কাছে!

আর শুধু বই তো নয়। সে সময় এনতার শখ আমদানি করে মা'কে ব্যতিব্যস্ত করে রাখতাম। ছবি আঁকা, ছড়া লেখা, গোয়েন্দা দল, ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার, ল্যাবরেটরি, বয়স্কাউট, জুডো, মেডিটেশন, ডাকটিকেট, কয়েন, ম্যাচবাক্স, স্টিকার, পোস্টকার্ড, ফুটবল, ক্রিকেট, কী নয়! তার উপর ঘর ভর্তি ছিলো একগাদা পশুপাখি। আর এ সব কিছুর পেছনেই ভাগনার কোনো না কোনো সুপ্ত প্রতিভার খোঁজ পেয়ে যেতেন মামা। আর সেই সুপ্ত প্রতিভা যেনো লুপ্ত হয়ে না যায় সেজন্য সাথে করে নিয়ে যেতেন জাতীয় জাদুঘর, বিজ্ঞান জাদুঘর, শিশুপার্ক, বইমেলা।

আমার লেখালেখির পেছনে মামার অবদান ভোলার নয়। একটা সময় ছিলো যখন আমার ছোটভাই আর মামাকে ছাড়া আর কাউকেই আমার লেখালেখির খাতাটা দেখাতাম না। এখন বুঝি কী নিঃস্বার্থ ভাবেই না মামা আমাকে উৎসাহ দিয়ে গেছেন। আমার সব নিয়ে প্রণোদনা দিয়েছেন কিন্তু নিজের কথা বলেননি কখনোই। অনেকদিন পর্যন্ত আমি জানতামই না যে মামা কবিতা লিখেন... জানতাম না রুদ্র বাদল শুধু আমার মামা নন, একজন কবিও।

যে কবির কবিতায় অনুক্ষণের ভাবনা আর সেই সময়ের বোধটুকু জলচিত্রের মতো আঁকা হয়ে যায়। রঙের বাহুল্যে বিমূর্ততার ডাল-পালা ছড়ানো কোনো মহাবৃক্ষ নয়; বরং যেনো মূহূর্তের বোধে ভর করে বেড়ে ওঠা কোনো তরুলতা। অকপট ভাবনা। তাই কবি রুদ্র বাদলের কবিতায় ধাক্কা নেই। বরং অবলম্বনের নিশ্চয়তা আছে। ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা আছে। তাঁর কবিতা তাই অনর্গল পড়ে যাওয়া যায়।

পড়তে গিয়ে আমরা নিত্য তাঁকে আবিষ্কার করি। কবিতার অলিগলি ঘুরে আমরা শুনতে পাই ঘোর লাগা সেই সন্ধ্যার হাহাকার। কোনো একজনকে নিয়ে ভাবনার উত্তালতা। পাওয়ার উল্লাস। না পাওয়ার আক্ষেপ। কোনো মহামানব নয়, তাঁর কাব্যে আমরা সাধারণ একজন মানুষেরই প্রতিবিম্ব দেখি। যিনি মানবিক কোনো কিছু থেকেই বঞ্চিত নন। নন লজ্জিতও। তাই আমরা তাঁকে কাঁদতে দেখি। তাঁর প্রেম দেখি। অসহায়ত্বের চাপা রাগ, বিদ্রোহ দেখি। দেখি স্বপ্নাবিষ্টতা, ইলেকট্রনিক স্মৃতিকাতরতা। হয়তো ঈর্ষাও!

তাঁর কবিতাগুলো তাই আমাদেরই ব্যক্তিগত কথন হয়ে ওঠে। মুহূর্তের ব্যাখ্যান হয়ে ওঠে আমাদেরই ভাবাবিষ্টতার পঞ্জিকা। আর একজন কবির গল্প হয়ে ওঠে একজন প্রতিনিধির গল্প।

ইচ্ছে ছিলো বইটি প্রকাশের সময় দেশে থাকবো। হলো না। তবু তো অপেক্ষায় থাকি। আমার প্রিয় ছোটমামা, কবি রুদ্র বাদলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ! কান্না বিষয়ক শব্দাবলী।

© অমিত আহমেদ

4 টি মন্তব্য:

মাশীদ said...

খুব ভাল লাগল বইটা এবং তার পিছনের মানুষটার কথা জেনে।
আমিও অপেক্ষায় থাকলাম।

বনলতা সেন said...

তোর এই লেখাটা খুব ভালো হয়েছে।মামার জন্য পুরো আবেগ দিয়ে লিখেছিস বোঝা যাচ্ছে।

Aumit Ahmed said...

ধন্যবাদ মাশীদাপু। বইটি সম্ভবত আগামীকাল মেলায় আসবে।

বনলতা, লেখা তো আবেগ নিয়েই লিখি :)

বনলতা সেন said...

তাহলে এটাতে অষ্টম মাত্রার আবেগ আছে। ;-)

কিংবা দিনে দিনে আপনার লেখকীয় হাত-যশ/জোশ বৃদ্ধি পাচ্ছে :-P

Post a Comment