নটরডেমে যারা পড়েছেন, বিশেষ করে যারা নিয়মিত ক্লাস ফাঁকি দিয়েছেন, তাদের অনেকেরই হয়তো গুরুর সাথে সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয়েছে। আমার সাথে একাধিকবার হয়েছে।
একদম প্রথমদিনের কথা বলি, আমি এ. সি. দাস স্যারের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে রফিক মামুর টংয়ে বসে আছি। বাতেনী আলাপ হচ্ছে। দেখি গুরু একটা বোয়াম থেকে চকলেট বের করে নিচ্ছেন। পরনে রঙচটা ট্র্যাকস্যুট, টিশার্ট। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। মুখে "হারিয়ে গেছি" টাইপ হাসি। আমি অত্যধিক উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। সে বয়সে কিছু মানুষের জন্য তীব্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসা বহন করে ফিরতাম। তিনি শ্রদ্ধার সেই মানুষগুলোর তালিকায় ছিলেন একদম শুরুর দিকে।
আমি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, "গুরু, আমার নাম সাব্বির!" এতো কিছু বাদ দিয়ে নিজের নাম জানান দেবার আগ্রহ কেনো প্রবল হয়ে উঠলো তা জানি না, তাও সেই নাম যে নামে শিক্ষকরা ছাড়া আমাকে খুব বেশি কেউ ডাকেন না। উনি হাসি হাসি মুখে বললেন, "আচ্ছা!" আমি থড়বড় করে বললাম, "গুরু কি এ'দিকেই থাকেন?" উনি আঙুল তুলে সামনের রাস্তা দেখিয়ে জবাব দিলেন, "হ্যাঁ, ওইতো, সামনেই থাকি। কমলাপুর।" তখন দু'একটা মিশ্র অ্যালবাম বাদে তাঁর গান পাওয়া যেতো না। সেই নিয়ে অভিযোগ জানালাম। উনি খুব অকপট ভাবেই কেনো গানের অ্যালবাম করতে পারেন না সেটা বলে দিলেন। অচেনা মানুষের সাথে কথা হচ্ছে, সেই নিয়ে কোনো দ্বিধা তাঁর মধ্যে দেখিনি। যা বলার তা সরাসরি এবং আত্মবিশ্বাস নিয়েই বলেছেন। এমন সারল্য আমি অন্য কোনো তারকার মাঝে দেখিনি।
তাঁর কাছের মানুষদের কাছ থেকে পরে শুনেছি, এই সারল্যই তাঁকে ব্যক্তিগত জীববে হিসেবি হতে দেয়নি। যে কোনো কাজে, পেশায়, এমনকি শখেও মানুষকে ধূর্ত হতে হয়। নিজের যা প্রাপ্য তা আদায় করে নিতে হয়। কেউ কাউকে নিজ থেকে যা চাই তা বুঝিয়ে দেয় না। এই বিষয়টি গুরু বুঝতেন না। কিংবা বুঝলেও মানতেন না। যে সারল্য তিনি নিজে ধারণ করতেন, তা দেখতে চাইতেন অন্যদের মাঝেও।
নটরডেমে পুরো দিন ফাঁকি দিতাম কম। সাধারণত একটা দু’টো ক্লাস নানান কৌশল করে ফাঁকি দিয়ে বাইরে বেরিয়ে মনে হতো বিশ্ব জয় করে ফেলেছি। সেই জয় জানান দিতে ইতিউতি ঘুরে বেড়াতাম। উনি সকালে হাঁটতে বেরুতেন। হনহন করে হাঁটতেন। আমি পরিচিতর হাসি দিতাম। উনি সেই হাসি ফিরিয়ে দিতেন, কিন্তু হাঁটার গতি কমাতেন না। ভর দুপুরে টং দোকানে তাঁকে প্রায়শই দেখা যেতো। কথা হতো। আমার নাম মনে থাকতো না কখনোই, প্রতিবারই জিজ্ঞেস করতেন, "তোর নাম যেনো কী?" যেদিন অটোগ্রাফের জন্য খাতা বাড়িয়ে ধরলাম, সেদিনও।


কলোনী কিংবা কমলাপুর মাঠে যখন খেলা জমতো, তখন পথ চলতে চলতে অবধারিত ভাবেই তিনি দাঁড়িয়ে পড়তেন। স্কুল বাচ্চাদের খেলা হোক, যুবাদের, কিংবা কলেজ ছাত্রদের, কোনো বাছবিচার নেই। সতর্ক চোখে ফুটবলের প্রতিটি পাস, ক্রিকেটের প্রতিটি বলে নজরে রাখতেন। খেলার প্রতি ভালোবাসা তাঁর চোখ থেকে ঠিকরে ঠিকরে বেরুতো। এক সময় সহ্য করতে না পেরে নিজেই মাঠে নেমে পড়তেন। বয়স্ক একজন মানুষ কিশোরদের ভিড়ে বাঁইবাঁই করে ছুটছেন বল পায়ে নেবার জন্য। অনন্য এক দৃশ্য! গুরুকে যে সবাই "চিরতরুণ" বলেন, সেটা শুধু বলার জন্য বলা নয়।
আমার শ্রদ্ধার মানুষদের তালিকা দিনদিন ক্ষীণকায় হয়েছে। অনেক মানুষ যাদের শ্রদ্ধা করতাম, ভালোবাসতাম, তাদের লোভ ও দ্বিমুখিতা ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। নাম কাটা পড়েছে। কিন্তু গুরু, যিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন পাক হানাদের বিরুদ্ধে, শুদ্ধবাদের মুখে ছাই দিয়ে গিটারের তারে বেঁধেছেন এমন সব গান যেগুলো বদলে দিয়েছে বাংলার সঙ্গীতাঙ্গনকে, যিনি যাপন করে গেছেন নির্লোভ, কষ্টকর এক জীবন, প্রচন্ড বেদনাতেও যিনি মুখের হাসি মুছতে পারতেন না, সেই চিরতরুণ, প্রিয় আজম খানকে তালিকা থেকে বাদ দেবার সাধ্য শুধু আমার নয়, কারুরই নেই। তাই তিনি, পপসম্রাট আজম খান, শুধু ব্যান্ডশিল্পীদের গুরু নন, তিনি আমারও গুরু। আমাদের সবার গুরু। তাই গুরু, তোমাকে সালাম! আমার সৌভাগ্য যে তোমার সাথে দেখা, দু’টো কথা বলার সুযোগ আমার হয়েছে। যতদিন আমার এই দেহে প্রান থাকবে, চিন্তাশক্তি থাকবে, এই মস্তিষ্কের এক প্রান্তে তোমার জন্য ভালোবাসটুকু বেঁচে থাকবে।
© অমিত আহমেদ
প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ৫ জুন ২০১১
গুরুর ছবি, সৌজন্যে ডেইলি-সান
একদম প্রথমদিনের কথা বলি, আমি এ. সি. দাস স্যারের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে রফিক মামুর টংয়ে বসে আছি। বাতেনী আলাপ হচ্ছে। দেখি গুরু একটা বোয়াম থেকে চকলেট বের করে নিচ্ছেন। পরনে রঙচটা ট্র্যাকস্যুট, টিশার্ট। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। মুখে "হারিয়ে গেছি" টাইপ হাসি। আমি অত্যধিক উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। সে বয়সে কিছু মানুষের জন্য তীব্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসা বহন করে ফিরতাম। তিনি শ্রদ্ধার সেই মানুষগুলোর তালিকায় ছিলেন একদম শুরুর দিকে।
আমি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, "গুরু, আমার নাম সাব্বির!" এতো কিছু বাদ দিয়ে নিজের নাম জানান দেবার আগ্রহ কেনো প্রবল হয়ে উঠলো তা জানি না, তাও সেই নাম যে নামে শিক্ষকরা ছাড়া আমাকে খুব বেশি কেউ ডাকেন না। উনি হাসি হাসি মুখে বললেন, "আচ্ছা!" আমি থড়বড় করে বললাম, "গুরু কি এ'দিকেই থাকেন?" উনি আঙুল তুলে সামনের রাস্তা দেখিয়ে জবাব দিলেন, "হ্যাঁ, ওইতো, সামনেই থাকি। কমলাপুর।" তখন দু'একটা মিশ্র অ্যালবাম বাদে তাঁর গান পাওয়া যেতো না। সেই নিয়ে অভিযোগ জানালাম। উনি খুব অকপট ভাবেই কেনো গানের অ্যালবাম করতে পারেন না সেটা বলে দিলেন। অচেনা মানুষের সাথে কথা হচ্ছে, সেই নিয়ে কোনো দ্বিধা তাঁর মধ্যে দেখিনি। যা বলার তা সরাসরি এবং আত্মবিশ্বাস নিয়েই বলেছেন। এমন সারল্য আমি অন্য কোনো তারকার মাঝে দেখিনি।
তাঁর কাছের মানুষদের কাছ থেকে পরে শুনেছি, এই সারল্যই তাঁকে ব্যক্তিগত জীববে হিসেবি হতে দেয়নি। যে কোনো কাজে, পেশায়, এমনকি শখেও মানুষকে ধূর্ত হতে হয়। নিজের যা প্রাপ্য তা আদায় করে নিতে হয়। কেউ কাউকে নিজ থেকে যা চাই তা বুঝিয়ে দেয় না। এই বিষয়টি গুরু বুঝতেন না। কিংবা বুঝলেও মানতেন না। যে সারল্য তিনি নিজে ধারণ করতেন, তা দেখতে চাইতেন অন্যদের মাঝেও।
নটরডেমে পুরো দিন ফাঁকি দিতাম কম। সাধারণত একটা দু’টো ক্লাস নানান কৌশল করে ফাঁকি দিয়ে বাইরে বেরিয়ে মনে হতো বিশ্ব জয় করে ফেলেছি। সেই জয় জানান দিতে ইতিউতি ঘুরে বেড়াতাম। উনি সকালে হাঁটতে বেরুতেন। হনহন করে হাঁটতেন। আমি পরিচিতর হাসি দিতাম। উনি সেই হাসি ফিরিয়ে দিতেন, কিন্তু হাঁটার গতি কমাতেন না। ভর দুপুরে টং দোকানে তাঁকে প্রায়শই দেখা যেতো। কথা হতো। আমার নাম মনে থাকতো না কখনোই, প্রতিবারই জিজ্ঞেস করতেন, "তোর নাম যেনো কী?" যেদিন অটোগ্রাফের জন্য খাতা বাড়িয়ে ধরলাম, সেদিনও।


কলোনী কিংবা কমলাপুর মাঠে যখন খেলা জমতো, তখন পথ চলতে চলতে অবধারিত ভাবেই তিনি দাঁড়িয়ে পড়তেন। স্কুল বাচ্চাদের খেলা হোক, যুবাদের, কিংবা কলেজ ছাত্রদের, কোনো বাছবিচার নেই। সতর্ক চোখে ফুটবলের প্রতিটি পাস, ক্রিকেটের প্রতিটি বলে নজরে রাখতেন। খেলার প্রতি ভালোবাসা তাঁর চোখ থেকে ঠিকরে ঠিকরে বেরুতো। এক সময় সহ্য করতে না পেরে নিজেই মাঠে নেমে পড়তেন। বয়স্ক একজন মানুষ কিশোরদের ভিড়ে বাঁইবাঁই করে ছুটছেন বল পায়ে নেবার জন্য। অনন্য এক দৃশ্য! গুরুকে যে সবাই "চিরতরুণ" বলেন, সেটা শুধু বলার জন্য বলা নয়।
আমার শ্রদ্ধার মানুষদের তালিকা দিনদিন ক্ষীণকায় হয়েছে। অনেক মানুষ যাদের শ্রদ্ধা করতাম, ভালোবাসতাম, তাদের লোভ ও দ্বিমুখিতা ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। নাম কাটা পড়েছে। কিন্তু গুরু, যিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন পাক হানাদের বিরুদ্ধে, শুদ্ধবাদের মুখে ছাই দিয়ে গিটারের তারে বেঁধেছেন এমন সব গান যেগুলো বদলে দিয়েছে বাংলার সঙ্গীতাঙ্গনকে, যিনি যাপন করে গেছেন নির্লোভ, কষ্টকর এক জীবন, প্রচন্ড বেদনাতেও যিনি মুখের হাসি মুছতে পারতেন না, সেই চিরতরুণ, প্রিয় আজম খানকে তালিকা থেকে বাদ দেবার সাধ্য শুধু আমার নয়, কারুরই নেই। তাই তিনি, পপসম্রাট আজম খান, শুধু ব্যান্ডশিল্পীদের গুরু নন, তিনি আমারও গুরু। আমাদের সবার গুরু। তাই গুরু, তোমাকে সালাম! আমার সৌভাগ্য যে তোমার সাথে দেখা, দু’টো কথা বলার সুযোগ আমার হয়েছে। যতদিন আমার এই দেহে প্রান থাকবে, চিন্তাশক্তি থাকবে, এই মস্তিষ্কের এক প্রান্তে তোমার জন্য ভালোবাসটুকু বেঁচে থাকবে।
© অমিত আহমেদ
প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন, ৫ জুন ২০১১
গুরুর ছবি, সৌজন্যে ডেইলি-সান
Osadharon lekha...sotti guru tomai selam.
ReplyDeleteThanks
http://www.kolkataways.com
ধন্যবাদ স্যাম। ভালো থাকবেন।
ReplyDelete